দেশভাগের আটদশক পূর্তি সামনে। দেশভাগ সত্যিকার ভারতপ্রেমীদের আজও মনোকষ্ট দেয়। এর ঠিক উলটো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ক্ষমতার কারবারিদের মধ্যে। তাঁরা বরং স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনের পরিকল্পনায় মশগুল দু’দশক বাকি থাকতেই। বিশেষ করে গেরুয়া শিবির তো ‘অমৃতকাল’ আসছে দাবির পাশাপাশি রঙিন স্বপ্ন দেখাচ্ছে আমাদের। কিন্তু স্বাধীনতা, থুড়ি দেশভাগের অভিশাপ কারা বয়ে বেড়াচ্ছে? মূলত বাংলা ও বাঙালি। বাংলার লাশের উপর দিয়েই ভারতের স্বাধীনতা এসেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। তার জন্য সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা ভোগ করছে পূর্ববঙ্গের হিন্দুসহ সংখ্যালঘু বাংলাভাষী জনগণ। এই সুদীর্ঘকালেও পূর্ববঙ্গের সর্বহারা উদ্বাস্তুদের ভারতে নাগরিকত্ব সমস্যা মেটেনি। এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার ব্যাপারে নেহরু থেকে মোদি, কেন্দ্রের রকমারি সরকার হরেকরকমের কথা বলেছে। কিন্তু তারা না পেয়েছে উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ, না পেয়েছে ভারতের নাগরিকত্ব। কিছু সম্পন্ন পরিবার কৌশলে গুছিয়ে নিলেও বিপন্নতা আজও সঙ্গী অসংখ্য পরিবারের। বলা বাহুল্য, তারা মূলত দুঃস্থ, দরিদ্র। ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ তাদের সমানাধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ করেনি কোনওদিন, ভারতও তাদের দেগে দিয়েছে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে। অথচ এই হতভাগ্য মানুষগুলির বাপ-ঠাকুর্দারাও স্বাধীন ভারত গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সমান লড়াই করেছিলেন। কোনও এক পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হবেন, এমনটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তাঁরা।
স্বাধীনতার জন্য দেশভাগ অনিবার্য হলে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আশ্বস্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তান বাসযোগ্য মনে না-হলে যে-কেউ যেকোনও দিন ভারতে উঠে আসবেন। ভারত সরকারই তাঁদের যথার্থ পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু পুনর্বাসন দূর, ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভও যে একদিন আকাশের চাঁদের মতোই নাগালের বাইরে রয়ে যাবে, তা কেউ কখনও ভাবেননি। বস্তুত পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং নাগরিকত্ব মিলিয়ে উদ্বাস্তু জীবনকে ভারতের রাজনীতি এক নির্বাচনী পণ্যে পরিণত করেছে। ভোট এলেই উদ্বাস্তু পরিবারগুলির সামনে প্রতিশ্রুতির ডালি হাজির হয়। আর ভোট মিটলেই তা উধাও! এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) বাংলায় কারও নাম বাদ পড়লেও কুছ পরোয়া নেই। একবার মাত্র ভোট দিতে পারবেন না। পরে সিএএ মারফতই দেওয়া হবে বহু আকাঙ্ক্ষার নাগরিকত্ব! অর্থাৎ ফের স্বমহিমায় হাজির নাগরিকত্বের ‘গাজর’। সৌজন্যে বঙ্গ বিজেপি। মূল টার্গেট মতুয়া ভোট। দিকে দিকে হয়েছে সিএএ ক্যাম্প। কিন্তু, সেটাও যে মোদি-শাহের দলের নতুন এক জুমলা, তার প্রমাণ এই সংক্রান্ত সরকারি পরিসংখ্যান। দেশে সিএএ কার্যকর হয়েছে ছ’বছর আগে। কিন্তু সেই বিতর্কিত আইনে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বাংলার ক’জনকে নাগরিকত্ব দিয়েছে? মাত্র আটজন! তাও একবছর আগে। গত একবছরে অগ্রগতি স্রেফ ‘মহাশূন্য’। বিজেপি এবং কেন্দ্রের কথায় ভরসা করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিএএ মারফত ৩২ হাজারের বেশি নরনারী আবেদন করেছেন। কিন্তু শিকে আটজনের অতিরিক্ত কারও ভাগ্যেই ছেঁড়েনি।
এই পরিস্থিতিতে বঙ্গ বিজেপির নাগরিকত্বের টোপ যে সর্বার্থেই মূল্যহীন, তার প্রমাণ মিলল দু’ভাবে। গত শনিবার নদীয়ার তাহেরপুরে আসার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নরেন্দ্র মোদির হেলিকপ্টার ওই পর্যন্ত পৌঁছোতেই পারেনি। দুধের সাধ ঘোলে মেটাবার বন্দোবস্ত করেন তিনি। জনসভায় জমায়েত হওয়া ভক্তকুলের উদ্দেশে তিনি ভাষণ দেন কলকাতা বিমানবন্দর থেকে। মোবাইলে দেওয়া তাঁর ওই ভাষণে কী পেলেন বাংলার মতুয়া তথা উদ্বাস্তু জনগণ? জয় নিতাই, জয় হরিচাঁদ ঠাকুর, জয় গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং জয় বড়মা! কিন্তু এসআইআর আতঙ্কে কাটানো মানুষগুলির জন্য নাগরিকত্ব নিয়ে কোন ভরসা ছিল তার মধ্যে? বস্তুত একটি শব্দও নয়। পরে ‘এক্স’-এও মোদিজি নাগরিকত্ব প্রদানে কোনও ইতিবাচক বার্তা দেননি। সুপ্রিম কোর্টও এই ব্যাপারে যে শর্ত রেখেছে তাও উদ্বাস্তুদের জন্য কোনও ‘সুসংবাদ’ নয়। ফলত একরাশ হতাশা ছাড়া কিছুই উৎপন্ন করতে পারেনি প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব ভারত সফর। হতাশার যতটুকু বাকি ছিল সেটুকুও পূর্ণ হল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের বাণীতে। প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বনগাঁর বিজেপি সাংসদের উপলব্ধি জানা গেল, ‘এক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ যাচ্ছে। সেটা সহ্য করে নিতে হবে!’ স্বভাবতই তৃণমূল সাংসদ তথা মতুয়া সংঘাধিপতি মমতা ঠাকুর এই ভাষায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন, ‘মতুয়াদের সঙ্গে বিজেপি প্রতারণা করল। তাদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবেই ব্যবহার করে ওরা। যোগ্য সামাজিক সম্মান যে দেয় না, তা আজ স্পষ্ট!’ এরপর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।