দিব্যেন্দু বিশ্বাস, নয়াদিল্লি: এগলেই চোখে তীব্র জ্বলুনি। সেইসঙ্গে দমকে দমকে কাশি। কাঁদানে গ্যাসে জ্বলছে গলাও। সামনে লাঠি হাতে উদ্যত পুলিশ-র্যাফ। মারমুখী সেই বাহিনীর সামনেই বুক পেতে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভরত এক যুবক। চিৎকার করে বলেই যাচ্ছেন, ‘কত মারবেন... মারুন!’ আর তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ঘিরে ধরে নির্বিচারে লাঠি চালাতে থাকে র্যাফ। নিট-ইউজির প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে সোমবার ছিল ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ ভবন অভিযান। মিছিলে পা মিলিয়েছেন সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো, সমাজবাদী পার্টি সাংসদ ডিম্পল যাদব, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদবরাও। আর সেই অভিযান আটকাতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ল গোটা রাজধানী। নাস্তানাবুদ দিল্লি পুলিশও। কার্যত মুড়ি-মুড়কির মতো কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হল। সংসদ ভবন অভিমুখী হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে চলল বেপরোয়া লাঠিচার্জও। গুরুতর আহত অসংখ্য আন্দোলনকারী। তারপরও দিল্লির রাজপথ ছাড়ল না ছাত্র-যুবরা। সংসদেও এই ইস্যুতে সুর চড়িয়েছেন বিরোধীরা। দফায় দফায় মুলতুবি হয়েছে লোকসভা ও রাজ্যসভার কাজ। রাত পর্যন্ত থমথমে রয়েছে রাজধানীর পরিস্থিতি। এরই মধ্যে যন্তরমন্তর থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
এদিনই শুরু হয়েছে সংসদের বাদল অধিবেশন। ফলে পার্লামেন্ট এবং তৎসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা আক্ষরিক অর্থেই এখন ভিভিআইপি জোন। এরই মধ্যে পার্লামেন্টের অদূরে ঘটেছে তুলকালাম কাণ্ড! রবিবার রাত থেকে যন্তরমন্তরে জমায়েত করতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। সক্রিয় ছিল পুলিশও। রাতের মধ্যে দিল্লিকে দুর্গ বানিয়ে ফেলা হয়। শহর ঘিরে ফেলে বিশাল পুলিশবাহিনী। সকাল ৯টা নাগাদ মিছিলের প্রস্তুতি শুরু করে ‘ককরোচ’রা। পুলিশ আটকানোর চেষ্টা করলে প্রথমে ধস্তাধস্তি, আর তারপর... মুহূর্তের মধ্যেই ঝলসে ওঠে উর্দিধারীদের লাঠি। সেই ঘটনার অভিঘাতে সকাল থেকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা দিল্লি। তীব্র যানজটে নাভিশ্বাস ওঠে শহরবাসীর। বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধেরও অভিযোগ উঠেছে। ককরোচদের বিক্ষোভ শুধুমাত্র ল্যুটিয়েন্স দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শহরে যে যে প্রান্তে বিক্ষোভকারীরা বাধা পেয়েছে, সেখানেই শুরু হয়েছে আন্দোলন। বাদ পড়েনি মেট্রো স্টেশনও। সুরক্ষার প্রশ্নে সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংলগ্ন অন্তত পাঁচটি মেট্রো স্টেশন (জনপথ, রাজীব চক, প্যাটল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট ও সেবা তীর্থ) এদিন সকালেই বন্ধ করে দেয় দিল্লি মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে বাইরে বেরতে সমস্যায় পড়ে সাধারণ মানুষ। সেই সময় মেট্রো স্টেশনগুলির বন্ধ গেটের সামনেই বিক্ষোভে শামিল হয় ‘ককরোচ’রা।
পার্লামেন্টের অদূরে যখন হুলুস্থুল চলছে, তখন সংসদ ভবনে নিজের কার্যালয়েই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বেশ কিছুক্ষণ তাঁর কনভয় রওনা হতে দেয়নি প্রশাসন। নয়াদিল্লির রফি মার্গ এলাকায় ‘ককরোচ’দের বিক্ষোভে আটকে পড়ে জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার কনভয়ও। যদিও ওমর তখন কনভয়ে ছিলেন না। এদিন যে এলাকায় বিক্ষোভ হয়, সেখানে সংসদ ভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও রয়েছে রেলভবন, শ্রমশক্তি ভবন, শাস্ত্রীভবন, কৃষিভবনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিল্ডিং। ফলে দিল্লি পুলিশ প্রথম থেকেই তটস্থ ছিল। কিন্তু কার্যত গেরিলা কায়দায় একাধিক মিছিলের দিক পরিবর্তন করে তাদের নাজেহাল করে দেয় বিক্ষোভকারীরা। তবে ভিড় জমাট বাঁধলেই লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গিয়েছে পুলিশ, র্যাফ। তাড়া খেয়ে অনেক বিক্ষোভকারী পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। এদিন বিকালেও দেখা যায় যে, সংসদ মার্গ, রফি মার্গ, পার্লামেন্ট স্ট্রিটের মতো এলাকায় রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছেঁড়া চটি-জুতো। পুলিশের অভিযোগ, ফিরোজ শাহ রোড, পার্লামেন্ট স্ট্রিটের মতো একাধিক এলাকায় পাথর ছুঁড়েছে বিক্ষোভকারীরা। পাথরের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে সিজেপি।