নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: অতিবর্ষণের জের। সংকটে কয়লার জোগান। আর তারই ফলশ্রুতি হিসাবে দেশের ৪৫টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে কয়লার সঞ্চয় ও ভান্ডার তলানিতে। জুলাই মাসের শেষে ৩১টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কয়লার সংকটে ভুগছিল। আগস্ট মাসের শেষে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫। আরও একঝাঁক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলির ভান্ডারে যতটা কয়লার সঞ্চয় থাকা উচিত ছিল, তার তুলনায় ২৫ শতাংশেরও কম রয়েছে। এই ৪৫টি কেন্দ্রে তিন থেকে দশ দিনের মতো কয়লা মজুত রয়েছে। অর্থাৎ কিছু কেন্দ্রে পরিস্থিতি এমনই যে, কয়লার ভাণ্ডারে পড়ে আছে মাত্র তিন দিনের মতো সঞ্চয়! এই সংকটের জেরে উৎসব মরশুমের প্রাক্কালে হঠাৎ দেশজুড়ে বিভিন্ন গ্রিডে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রবাহিত সরবরাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সোজা কথায়, দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা। আর তা থেকে রক্ষা পেতেই বিদ্যুৎ মন্ত্রক জরুরি বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশিকা জারি করে সমস্ত তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে জানিয়েছে, বিভিন্ন সময় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়ম করে প্লান্টের একাংশ বন্ধ রাখা অথবা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়, সেটা আপাতত করা যাবে না। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং শুধুমাত্র সুরক্ষাজনিত কারণ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোনো ইউনিট বন্ধ রাখা চলবে না।
বিদ্যুৎ মন্ত্রকের এই আপৎকালীন প্রতিক্রিয়া ও সার্কুলার থেকেই স্পষ্ট যে, দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কালো ছায়া। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ে আগস্ট মাসজুড়ে অতিবর্ষণ হয়েছে। আর সেই কারণেই এই তিন রাজ্য থেকে কয়লার সরবরাহে ভাটা পড়েছে। ৪৫টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ৪০টিই দেশীয় কয়লা খনির উপর নির্ভরশীল। বাকি পাঁচটি বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কিন্তু ওই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি যে দামে কয়লা ক্রয় করে, সেটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুতের দামও ধার্য করে। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে তারা। কারণ আমদানি করা কয়লার দাম বেশি। সুতরাং সিংহভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাই দেশীয় খনি থেকে ক্রয় করা কয়লার ভিত্তিতে যারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তাদের থেকে বিদ্যুৎ কিনতে চায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে জুলাই মাসে গড়ে যে পরিমাণ কয়লা সঞ্চিত ছিল, আগস্ট মাসের শেষে এসে সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়েছে। আগস্ট মাসের শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির কাছে সব মিলিয়ে ৩১ কোটি টন কয়লা মজুত রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, বেশি বৃষ্টি হলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য হয়ে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু বিদ্যুৎ মন্ত্রকের বক্তব্য, এবছর সর্বত্র সমানভাবে বর্ষা হয়নি। সদ্যসমাপ্ত আগস্টেও দেশজুড়ে গড়ে অন্তত ১২ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। আর তাই যেখানে জলবিদ্যুৎ থেকে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা, সেখানেও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক যোগান নেই। সুতরাং একদিকে কয়লাখনি থাকা রাজ্যগুলি থেকে জোগানে ব্যাঘাত ঘটছে। আবার অন্যদিকে, পর্যাপ্ত জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে সেই ক্ষতিপূরণ করবে, তেমনটা হচ্ছে না। আর এই দুই কারণের জেরে দেশজুড়ে ঘনিয়েছে বিদ্যুৎ সংকটের কালো মেঘ।