অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: হারিয়ে যেতে বসেছে সার্কাস। গ্রামে গঞ্জে তাঁবু ফেললেও চেয়ার ফাঁকাই থাকে৷ শিল্পীদের সংসার টানতে হিমশিম খেতে হয়৷ রঙ মেখে জীবন বাজি রেখে শুধুই খেলা দেখানো নয়, সার্কাসের তাঁবুতেও প্রচুর দুঃখ আছে সবার। সনু, সিকরানদের জীবনের লড়াইতেই আজও টিকে রয়েছে সার্কাস৷ নেপাল থেকে কাটোয়ায় এসে জীবন বাজি রেখে বাইকের কেরামতি শুধু পেটের তাগিদেই৷ কাটোয়া শহরে সার্কাসের তাঁবু পড়েছে গরমে৷ বাঘ, ভাল্লুক না থাকলেও সেখানে রয়েছে নানা খেলা৷
নেপাল থেকে লোহার খাঁচায় বাইক নিয়ে কেরামতি দেখাতে এসেছেন বাইশ বছরের যুবক সনু বোরামাগর৷ শৈশবেই হারিয়েছেন বাবাকে৷ চার ভাই দুই বোনের সংসারে দিশেহারা অবস্থা৷ মা লছমি বোরামাগর কষ্ট করেই ছেলে মেয়েদের বড় করে তুলেছেন৷ সনু স্বপ্ন দেখেছিলেন, বড় হয়ে আর পাঁচজনের মতই পড়াশোনা শিখে চাকরি করবেন৷ কিন্তু বাবা তিলক বোরামাগরের মৃত্যু সবকিছু বদলে দেয়। পেট চালাতে সার্কাসে নাম লেখান৷ লোহার খাঁচায় বাইক নিয়েই কেরামতি দেখান। প্রতিদিনই লড়াই করেন মৃত্যুর সঙ্গে। একটু ভুলচুক হলেই নির্ঘাত মৃত্যু। মাত্র বাইশ বছরেই জীবন শেষ! তবুও সাহসী সনু বলছিলেন, ‘বাবাকে ছোটোবেলাতেই হারিয়েছি। সার্কাসে বাইকের খেলা দেখিয়েই আমাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে হয়৷ প্রতিদিন খেলা শেষে মাকে ফোনে বলতে হয়, আমি ভালো আছি। বেঁচে আছি৷ মুহুর্তের ভুলে আমার জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে৷ তবুও দর্শকের মনোরঞ্জন দিয়ে আমার বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে নিতে হয়৷’
নন্দলাল ও সিমরানদেবীর গল্পতে ঝুঁকি না থাকলেও লড়াই একই৷ ঝাড়খণ্ডে নন্দলাল জন্ম থেকেই চেহারায় বামন৷ সার্কাসে যাঁর পোশাকি নাম জোকার৷ নন্দলালবাবুরাও দুঃস্থ পরিবারে বেড়ে ওঠা৷ বাবা ও মাকে হারিয়ে সার্কাসের তাঁবুতে ঘুরতে হয় তাঁকে৷ স্ত্রী সিমরানদেবীও বেঁটেখাটো মহিলা। সার্কাসের তাঁবুই তাঁদের সংসার৷ নন্দলালবাবু বলেন, ‘দর্শকরা আমাকে দেখে হাসে৷ জোকার বলে মজা করেন৷ এতে আমার খারাপ লাগে না। কারণ তাঁদের মনোরঞ্জন না দিতে পারলে আমার দুটো পয়সা আসবে না৷ বেঁচে থাকতে হবে তো৷ সংসারের জোয়াল টানতে চ্যালা কাঠের মার খেয়েও লোক হাসাতে হয় জোকারদের৷’
ছোটো থেকেই সার্কাসের প্রতি আবেগ সবার ছিল৷ বাঘ সিংহের খেলা দেখতে সবাই ছুটতেন সার্কাসের তাঁবুর দিকে৷ যুগ বদলেছে৷ বাঘ, সিংহ, হাতি সহ পশুর খেলা দেখানো নিষিদ্ধ করেছে সরকার৷ শুধু জিমন্যাস্টিক, জাগলিং, স্টান্টবাজির কায়দা দেখিয়েই সার্কাস এখনও মন জয় করছে সবার৷ কিন্তু বর্তমানে ওয়েব সিরিজের দৌলতে সার্কাসমুখী হয় না কেউই। সবার ধারণা সার্কাস মানেই বাঘ, সিংহ৷ সেটা যখন নেই, তখন ফালতু যাব কেন পয়সা খরচ করতে৷ কেউ কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও বানানোর জন্যও তাঁবুমুখী হচ্ছেন৷ তাতে খরচ উঠছে না৷ তাঁবুর অন্দরে আলুসেদ্ধ ভাত খেয়েই পড়ে থাকতে হচ্ছে মনিপুর, আসাম থেকে আসা শিল্পীদের। কাটোয়ায় আসা সার্কাসের ম্যানেজার সঞ্জীব ঘোষ বলেন, তাঁবুতে সবার দুঃখ আছে৷ সবার বেঁচে থাকার লড়াই। তাই সার্কাস এখনও টিকে রয়েছে। তবে, চেয়ার আগের মতো আর ভর্তি হয় না৷ -নিজস্ব চিত্র