নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘অভিষেকের পাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকলে আমাকে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।’ বক্তা তৃণমূল সুপ্রিমোর আস্থাভাজন বলে পরিচিত সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত মামলা থেকে সরে দাঁড়িয়ে কালীঘাটের দিকে কার্যত ‘কার্পেট বম্বিং’ করেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী। তাঁর প্রশ্ন একটাই, আনুগত্য না অভিষেক—ঠিক করতে হবে তৃণমূল নেত্রীকে। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর থেকে তৃণমূলের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। বর্তমানে তা দাবানলের রূপ নিয়েছে। মমতার পাশ থেকে সরে গিয়েছেন দীর্ঘদিনের বহু সঙ্গী। এই দুর্দিনেও তৃণমূল নেত্রীর পাশে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কল্যাণ অন্যতম। এদিন কল্যাণের অগ্নিবাণ মমতাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।
লক্ষ্মীবারের সকালটা তৃণমূলের জন্য শুরু হয়েছিল ধাক্কা দিয়ে। সাত সকালেই খবর আসে রাজ্যসভার সাংসদ ও দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন প্রকাশ চিক বরাইক। রাজ্যসভার সাংসদ কোয়েল মল্লিকের ইস্তফার খবর নিয়েও জল্পনা চলছে। এর মধ্যেই বিধানসভায় সই জাল মামলা নিয়ে মুখ খোলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। চাঁচাছোলা ভাষায় নিশানা করেন অভিষেককে। প্রথম থেকে অভিষেকের রক্ষাকবচ মামলাটি লড়ছেন কল্যাণ, তাঁর ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁদের টিমের আইনজীবীরা। কিন্তু বুধবার রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ অভিষেকের তরফে কল্যাণের ছেলে শীর্ষণ্যকে মেসেজ করে জানানো হয়, সই জাল মামলায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলকে লড়তে হবে না। অয়ন ভট্টাচার্যকে আইনজীবী হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে। তিনিই আদালতে সওয়াল করেন। এমনকি অন্য একটি পিটিশন যে ফাইল করা হয়েছে, সেই কথাও কল্যাণকে জানানো হয়নি। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন সাংসদ-আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ‘আমি ৪৫ বছর ধরে প্র্যাকটিস করছি। অভিষেকের এত ঔদ্ধত্য! একজন প্রবীণ আইনজীবীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, জানে না। আমাকে অসম্মান করেছে। আমি তো ক্যামাক স্ট্রিটের কর্মী নই। ও নিজেকে বস বলে মনে করে। ওকে বুঝতে হবে, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়।’
অভিষেকের আচরণে কল্যাণ এতটাই আহত হয়েছেন যে ‘বিকল্প’ চিন্তাভাবনা করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোর্টেই বল ঠেলে দিয়েছেন তিনি। কল্যাণের কথায়, ‘অভিষেকের জন্য দলের এই সর্বনাশ হয়েছে। আমি এখনও দিদির সঙ্গে আছি। কিন্তু দিদি যদি মনে করেন অভিষেককে ছাড়া চলবে না, তাহলে আমায় চলে যেতে হবে। দিদিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অভিষেককে সরাবেন নাকি আমাদের রাখবেন। আমরাও দলের জন্য ৪০ বছর খেটেছি। কিন্তু আমায় ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার করলে চলবে না।’
গত কয়েক দিনে ঘাসফুল শিবিরের ৫৮ জন বিধায়ক ও অন্তত ২০ জন সাংসদ প্রকাশ্যে অভিষেকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আলাদা শিবির গঠন করেছেন। বিদ্রোহীদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই অবস্থায় কল্যাণ দাবি করেছেন, ‘আমি ২০২২ সাল থেকে অভিষেকের কাজকর্মের সমালোচনা করে আসছি।’ অভিষেককে নিয়ে মুখ খুলেছেন কল্যাণ-পুত্র আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস মানে তো শুধু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নয়।’