মনই বন্ধন স্বীকার করে, আত্মা নিয়ত মুক্ত। এই মুক্তি সবাই চায়। কিন্তু অনিত্যের কর্ম করে সুখ পাবে, এই ভ্রান্ত বিশ্বাসে জীবন পাটে গোধূলি নেমেছে। এই চিন্তা যখন এল তখন আর চিন্তামণির চিন্তা করবার মতো সময় অবশিষ্ট নেই। যাঁর চিন্তা করলে দুঃখ সাগরে ভাসতে হয় না, যিনি সকল চিন্তার অচিন্ত্য—তাঁকে তোমরা আড়ালে রেখেই জীবনটাকে শেষ করে চলেছ। তাই বলি, ভগবান যদি দয়া করে জ্ঞানামৃত দান করতে চান, তা গ্রহণ করবার মতো ক্ষমতা তখন আর কারও থাকে না। কেন এমন হয়? মানুষ যদি এই চিন্তাটুকু করতে পারতো তাহলে প্রত্যেক মানুষেরই ব্রহ্ম প্রাপ্তি ঘটত। আর ভুল যদি না হয়, তাহলে কারও পরিবর্তন ঘটত না। আর ভুল হলো লীলা আনন্দ। তাই মানুষ ভগবানের সংসার লীলাকে সত্য ভেবে বসেছে। কিন্তু এই সংসারটি ভগবানের প্রথম লীলাক্ষেত্র। এখানে লীলা করে জীবনকে তিনি তাঁর মাহাত্ম্য বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। ‘ব্রহ্ম অনাদি’ এই কথা সকল মানুষ আদি যুগ থেকে শুনে আসছে। ব্রহ্মের যদি প্রকাশ না থাকতো বা না হতো, তাহলে কি বস্তু সৃষ্টি হতো? তিনি সকল অবস্থায় প্রকাশমান হয়ে অবস্থান করছেন। তিনি চিরকাল তিন অবস্থায় প্রকাশিত আছেন। লীলার জন্য নিজেকে আরো দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন। যাতে সকলের ব্রহ্মতে অবস্থান করতে পারে, তারজন্য তিনি লীলাতেই নেমে এলেন। তাই সকলেই সকলের সাধনায় রত। তাঁকে লক্ষ্য রেখে কর্ম করলেই মানুষ তার মাধুর্য ও ভাবাত্ম অনুভব করতে পারতো। এমনি তাঁর বিচিত্র লীলা খেলা। কেন মানুষ লক্ষ্য বিহীন কর্ম করে, এটুকু ভাবলেই তাঁর প্রতি স্মরণ করা হয়। তিনি গুণের সৃষ্টি করেছেন। ঐ গুণের কর্ম করেই পঞ্চভূতের ফাঁদে পড়েছেন। চিন্তা করে দেখ তো, ঐ ফাঁদে কে পড়েছে—তুমি না অন্য কেউ? কিন্তু এখানেই বিচারে ভুল হচ্ছে। কে কার ভুল সংশোধন করে দেবে? এ ভুল আছে বলেই ‘তুমি আমি’ রূপে নানা কর্মে তিনি আমাদের নিযুক্ত করেছেন। যেমন—তোমরা যাকে ভালবাস, তাকে ত্যাগ করতে পার না। যদি ভালবাসার বস্তু হারিয়ে যায়, তার জন্য তোমরা কেঁদে আকুল হও। কিন্তু ওই বস্তুটি নাশ হবার পর তার স্থানটি কোথায় অথবা সে কেমন আছে তা জানতে পার না। যদি তাকে আবার ফিরে পাও, তখনই তোমাদের পূর্ব শোক তোমরা ভুলে যাও। ওই রূপ তুমি তোমার নিজেকে হারিয়ে অন্য কাকেও ধরে নিজ সুখের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। তোমার নিজস্ব সত্তা কি আছে অথবা তোমার বলতে কি আছে বা কি নেই যদি একটি বার জানতে পারতে, তাহলে আর এই শোক দুঃখময় জীব শরীর কামনা করতে না। আবার মনে হয় যদি একটি বার ঐ পরম জ্ঞানের অধিকারী হতে পারতে, তাহলে এ অজ্ঞান তোমাদের মধ্যে জাগতো না। তাই ভেবে চিনতে কাজ করলে সুফল লাভ হবে। না জেনে কর্ম করাই দুঃখের কারণ। বেশীর ভাগ মানুষ সংসারকে না জেনেই সংসারী হতে চায়। মা না হয়ে বা মাতৃত্ব শিক্ষা না করেই মা হতে চায়। যে সব কিছু জেনেই কর্ম করে তাকেই জ্ঞানী বলে।
আচার্য জ্ঞানেশ্বর দেব প্রণীত ‘জ্ঞানেশ্বরোপনিষদ্’ (২য় খণ্ড) থেকে



