Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শব্দদানবের আড়ালে চীনা বাজির অনুপ্রবেশ

বছর তিরিশ আগে হবে। তখন ফোর-ফাইভের পড়ুয়াদের হাতে নতুন কোনও জিনিস আসা মানে, ক্লাসের সব সবপাঠীকে তারা জনে জনে সেটা দেখাবে।

শব্দদানবের আড়ালে চীনা বাজির অনুপ্রবেশ
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: বছর তিরিশ আগে হবে। তখন ফোর-ফাইভের পড়ুয়াদের হাতে নতুন কোনও জিনিস আসা মানে, ক্লাসের সব সবপাঠীকে তারা জনে জনে সেটা দেখাবে। সেই সময় অত ছোটো বাচ্চাদের হাতে নতুন কিছু হিসেবে উঠে আসত পেন বা পেনসিল। তাতেই একবার দেখেছিলাম, আমার এক বন্ধু বলছে— দেখেছিস, কীরকম পেনসিল, ‘মেড ইন চায়না।’ সচরাচর তখন লাল রঙে কালো বর্ডার দেওয়া মহাদেবের নৃত্যরত ব্র্যান্ডই ছিল সবচেয়ে চেনা ও সবার প্রিয়। তার মাঝে কালো পেনসিলে সোনালি বর্ডার দেওয়া ‘মেড ইন চায়না’ আমার মতো ক্লাসের সব পড়ুয়ার-ই নজর কেড়েছিল। আমরা খুব আকৃষ্টও হয়েছিলাম। মনের মধ্যে শুধু একটাই প্রশ্ন নাড়া দিয়েছিল, বাবা! চীন থেকে কীভাবে এল এই পেনসিল?

Advertisement

দিন গড়িয়েছে। ধীরে ধীরে স্কুল পেরিয়ে কলেজ। বিদেশি জিনিস, সে চীনই হোক বা আমেরিকা, আমাদের দেশে আমদানি কী করে হয় তা কিছুটা হলেও জেনেছিলাম। নানা ধরনের বিদেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি আর ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের সঙ্গে ততদিনে পরিচিতি হয়েছে। তবে সেগুলি যেন সবই বিলাসিতার অঙ্গ। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ছোটোখাটো সরঞ্জামের ক্ষেত্রে চীন ছিল সবসময়েই এগিয়ে। কলেজ লাইফে ট্রেনে যাতায়াতের সময় দেখলাম, হকার হাঁকছে — দশ টাকায় দশটা সুচ। বড়ো-খুব বড়ো-ছোটো মিলিয়ে ন’টা। আর একটি সুচ আবার লম্বা এবং গোল। সেটি দিয়ে কী সেলাই করা যাবে, তা জানি না, তবে ওই যে আকর্ষণ। ওই ধরনের সুচ সাধারণত রোজকার বাজারে নজরে পড়েনি। কাজেই ট্রেনের বহু যাত্রীকেই হামলে পড়ে সেগুলি কিনতে দেখলাম। আর সেই ‘দশ টাকায় দশটা সুচ’ও ছিল ‘মেড ইন চায়না’। দিন আরও গড়িয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে চাকরি। আর একইভাবে সামান্য পেনসিল-পেন থেকে সুচ পেরিয়ে চীন ঢুকে পড়েছে আমাদের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে। চিরুনি, ক্লিপ, কাঁচি, এমনকি বাচ্চাদের ছোটো ছোটো খেলনা। ধর্মতলায় পসরা সাজিয়ে বসে আছেন খেলনা বিক্রেতা। মাত্র দশ টাকার সেই বাহারি খেলনা-মানব দম খেয়েই লাফিয়ে ডিগবাজি খেয়ে আবার পায়ে ভর দিয়ে বসে যায়। চীনা জিনিসের মূল বিষয়টাই হল বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলকেই আকর্ষণ করার ক্ষমতা। আর দামটাও তো খুবই কম। মাত্র দশ টাকা। 
চীনের সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্ক এখন খুব একটা ভালো নয়। তাই অনেক ক্ষেত্রেই আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে। তবে আমার দেখা এই তিরিশ বছরে যেভাবে ‘চাইনিজ জিনিস’ একে একে শহর-গ্রামের প্রায় সব বাজারই কব্জা করেছে, তাতে সেই থেকে মুক্তি পাওয়া বড়ই দুষ্কর। সরকার যা-ই নিয়ম করুক না কেন, সাধারণের চাহিদাকে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। আর চোরাচালান তো রয়েছেই। সেভাবেই আমাদের বাজারে এখনও একইভাবে স্বমহিমায় বিরাজমান চীনা বাজি। 
বাঙালির দীপাবলি, কালীপুজো আর অবাঙালির ধনতেরস, দেওয়ালি। আলোর এই উৎসবের এখন সবচেয়ে বড়ো অঙ্গ হল বাজি। আলোর রোশনাইয়ের সঙ্গে শব্দদানবের তাণ্ডব না হলে যেন কালীপুজো বা দেওয়ালির আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়। শব্দদানবের তাণ্ডব বলার অর্থ এটাই যে, প্রতি বছর নানা ধরনের বিধি-নিষেধের বহর থাকলেও শব্দবাজিকে বাগে আনা যায়নি। আতশবাজির প্রচার বাড়াতে, পরিবেশ-বান্ধব তথা সবুজ বাজির চল অনেকদিনই হয়েছে। এখন তো সবুজ বাজি ছাড়া বাকি সবই নিষিদ্ধ বলা চলে। কিন্তু কলকাতা সহ দেশের প্রতিটি শহর থেকে শুরু করে গ্রাম—কান ফাটানো বিকট আওয়াজে মা কালীর আরাধনা বা দেওয়ালির রোশনাইকে আরও উজ্জ্বল করার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর। কোনও আইন-টাইন আমাদের কাছে ধোপে টেকে না। আর একটা প্রশ্ন তো থেকেই যায়। বাজি কীভাবে পরিবেশ-বান্ধব হতে পারে? বারুদ না থাকলে তো বাজি হয় না। কাজেই বারুদ পোড়ালে কী-করে পরিবেশের ভালো হতে পারে, সেটা কপালে ভাঁজ ফেলার মতোই। তাও আমরা গ্রিন বাজিকে বাহবা দিচ্ছি। তা হোক। বাজি কারবারিদেরও তো এটাই রুটিরুজি। তাই হয়তো, এহেন এক গালভরা নামে শব্দদানবকে রোখার চেষ্টামাত্র। কিন্তু উদ্যোগ যাই হোক, ফলাফল একই থাকে। এবছর যেমন নিয়মের তোয়াক্কা না করে দেদার ফাটল শেল বা স্কাই শট। দিন বদলেছে, তাই চকোলেট বোমা কৌলীন্য হারিয়েছে। তার জায়গা করেছে এই ধরনের বাহারি নামের সব বাজি। একটি তো দেখতে একেবারে খেলনা সিলিন্ডার। বাজারে বিক্রি হচ্ছে তুবড়ি বলে। অথচ সলতেতে আগুন দিতেই কিছুক্ষণের মধ্যে সেটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতোই বিকট শব্দে ফাটছে। শুধু এটাই নয়, এর মতো রয়েছে আরও নানা বাজির সম্ভার। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে স্কাই শট। আগে আমরা শেল বলতাম। আকাশে উঠে আলোর ফুলঝুরি। এখন সেটিই নাম আর বহর বদলে হয়েছে স্কাই শট। দেখতে অবিকল লম্বা গোলাকার বাক্সের মতো। মনে হবে একসঙ্গে ব্যাডমিন্টনের অনেকগুলি কর্ক রাখা রয়েছে। তবে নীচের সলতেতে আগুন দিতেই আকাশে উঠে সেটি ফাটছে বুক কাঁপিয়ে। কলকাতার নানা প্রান্তেও এই স্কাইশটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন শয়ে শয়ে মানুষ। কিন্তু কী করা যাবে। কালীপুজোর আগের দিন থেকে টানা দু’দিন এভাবেই বিকট আওয়াজের মধ্যে সন্ধ্যা থেকে রাত্রি কেটেছে কলকাতা সহ গোটা রাজ্যের। এই যে বাহারি শব্দবাজির প্রতি আমাদের আকর্ষণ, তার কেন্দ্রেও কিন্তু সেই চীন। যদিও চীনা বাজির উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তাতে কী? চোরাপথ তো খোলা। সেইপথেই দেশে ঢুকেছে বিপুল পরিমাণ চীনা বাজি। 
কালীপুজোর ঠিক পরদিনই নবি মুম্বইয়ের নবসেবা বন্দরে ৪ কোটি ৮২ লক্ষ টাকার চীনা বাজি বাজেয়াপ্ত করে ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই)। ৪০ ফুটের বড় কন্টেনারে রাখা ছিল ৪৬ হাজার ৬৪০ পিস নানা ধরনের বাজি। চীনে তৈরির পর জলপথের চোরারুটে সেই বাজি ভারতে আনা হয়। গ্রেফতার গুজরাতের এক ব্যবসায়ী। এর ঠিক কয়েকদিন আগে ওই বন্দরেই ৬ কোটি ৩২ লক্ষ টাকার চীনা বাজি উদ্ধার করে ডিআরআই। সেবার চীন থেকে ভারতে এসে পৌঁছেছিল ২০ মেট্রিক টন বাজি। মুম্বইয়ের মতো তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন বন্দর থেকে দেওয়ালির ঠিক আগের দিনে ৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকার চীনা বাজি উদ্ধার করা হয়। চীনা বাজির এহেন চোরা কারবার শুরু হয়ে গিয়েছিল দেওয়ালির অনেকমাস আগেই। চলতি বছরের জুলাইয়ে নবসেবা বন্দরের পাশাপাশি, মুন্দ্রা পোর্ট এবং কান্ডলা সেজে হানা দিয়ে সাতটি কন্টেনার বাজেয়াপ্ত করা হয়। সব মিলিয়ে তাতে ছিল ৩৫ কোটি টাকা চীনা বাজি। এ তো গেল শুধুমাত্র বন্দর এলাকায় নজরদারির জেরে চোরাচালানের হদিশ। তবে গোটা দেশে নজর এড়িয়ে বহু চীনা বাজিই শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের বাজারে ঢুকেছে। আর সেইসব চীনা বাজির মধ্যে গগনভেদী স্কাই শট থেকে সিলিন্ডার বোমাও রয়েছে। এছাড়া বাচ্চাদের প্রিয় রিভলবার পিস্তলের শিকড়ও ছড়িয়ে রয়েছে চীনেই। কারণ বাজেয়াপ্ত বাজির মধ্যে ওই পিস্তলের ব্যারেলের অজস্র স্ট্রিপও ছিল। আসলে মানুষের নজর যেটায় টানবে, সেটাকেই টার্গেট করে চীনা প্রস্তুতকারকরা। সে ছোটোখাটো খেলনা হোক বা বড়োসড়ো বাজি। বাজারে কোনটা ছাড়লে প্রথম দেখাতেই বাচ্চা থেকে বুড়ো আকৃষ্ট হবেন, সেটা চীন জানে। সেই জন্যই চোরাচালানের আড়ালে দেদার চলছে সেই ব্যবসা। আর এর পিছনে সুনিপুণভাবে কাজ করে চলেছে অসাধু চক্র। চীনা জিনিসের গায়ে তাদের র্যা পার লাগানো থাকে। সেই কাগজের র্যা পার খুলে স্কাইশটের গায়ে দেশীয় ছাপ মারা কাগজ মুড়ে দিলেই মুশকিল আসান। এরকমভাবে যেকোনও বাজির বাক্সই বদলে হয়ে যাচ্ছে ভারতীয় বাজি। বিপুল দামে আমরা সেই বাজি কিনছি। চোরাচালানের জেরে আসল মুনাফা লুটে নিয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। মার খাচ্ছেন আমাদের দেশের গরিব বাজি কারিগররা। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে যে শ্রমিকরা আমাদের জন্য ফুলঝুরি, রংমশাল, কালীপটকা বা চড়কি বানাচ্ছেন, তাঁদের কোনও কদরই থাকছে না। এক শ্রেণির অসাধু চক্রের ফাঁদে মানুষ বাহারি ‘চীনা’ বাজিতেই ঝুঁকছেন। আর আইন থাকতেও পুলিশ নির্বিকার দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে। অবশ্য এবছর নজির গড়েছে হায়দরাবাদ। চীনা বাজিকে টাটা জানিয়ে তারা সে রাজ্যের বাজি বিক্রেতা এবার পুরোপুরি সবুজ বাজি বিক্রি করেছেন। বেগম বাজারের ব্যবসায়ী কিষাণ কুমার জানান, তাঁদের সংগঠন থেকে আগেই ঠিক করা হয়েছিল, কোনওভাবে আমদানিকৃত বাজি তাঁরা বাজারে ঢুকতে দেবেন না। আর প্রাক্তন সরকারি কর্মচারী শ্রীনিবাস বলেন, সরকার নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও আমরা চীনা বাজিতে মজব এটা কি ঠিক? কখনওই না। সে জন্যই এলাকার ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সকলে মিলে এই সিদ্ধান্ত। শুধুমাত্র দেশীয় শিল্পকে প্রাধান্য দিতেই নয়। পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভ শেফটি অর্গানাইজেশন (পিইএসও) জানাচ্ছে, চীনা বাজির মধ্যে থাকে পটাশিয়াম ক্লোরেট। যা এক ধরনের বিস্ফোরক। খুব জোরে আঘাত লাগলেই তো বিস্ফোরণ ঘটায়। আর এহেন উপকরণের জেরে বায়ুদূষণের মাত্রাও অনেক গুণ বেশি।   
কালীপুজো আর দীপাবলি মিটতেই এবার ছটপুজোর পালা। আমাদের বাংলায় খুব বেশি চল না থাকলেও উত্তর ভারতের বিহার-উত্তরপ্রদেশ এইসময় উৎসবের আনন্দে গা ভাসিয়ে দেয়। আরও একবার শুরু হয় শব্দদানবের তাণ্ডব। আইন সত্ত্বেও বন্ধ হয় না ভয়ঙ্কর আওয়াজ। হয়তো আমাদের দেশের কারিগররা নিয়ম মেনেই বাজি বানাচ্ছেন। কিন্তু চোরাপথে আগত সেইসব চীনা বাজিই শব্দের সীমারেখার ধার ধারে না। মানুষ বাজির দোকানে গিয়ে তা কিনে আনছেন। তাঁরা জানেনও না যে, এর আওয়াজ কতটা জোরে হবে। সলতেতে আগুন দিয়ে আলোর রোশনাই দেখার জন্য তাঁরা স্কাই শট আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছেন। আর রোশনাইয়ের সঙ্গেই তা প্রবলভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে শব্দ আর বায়ুদূষণ। প্রশাসন তৎপর। তবে এর থেকে মুক্তি কোনওদিনই মিলবে না! ছটপুজোতেও হয়তো একইভাবে হবে দীপাবলির পুনরাবৃত্তি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ