বচ্ছরকার দুর্গাপুজো! নতুন পোশাক, আলোয় মাতোয়ারা শহর, প্যান্ডেল থেকে ভেসে আসা গান আর বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের ভিড়। বাড়ির খুদে সদস্য অবাক চোখে এসব দেখে। তার ঘোর লেগে যায়। এ বিশ্ব এত পেলব! এত সুন্দর! আলো ও প্রাণের এই নিয়মভাঙা জগতে সেও শরিক হতে চায় তাসের দেশের রুইতন-হরতনের মতো। কড় গুনে ঠাকুর দেখার নস্টালজিয়া তার বাপ-মায়ের আছে। নবীন প্রজন্ম এখন যদিও সোশ্যাল মিডিয়াতেও স্বচ্ছন্দ। তবু পুজোর ক’টা দিন হুটোপাটি, দৌড়-ঝাঁপ, ক্যাপ-বন্দুকের দুনিয়াদারিতে সেও ভেসে যেতে থাকে আনন্দযজ্ঞে। স্কুলে পড়ছে যারা, তাদের এই ক’দিন পড়াশোনা, হোমটাস্ক, বকুনির বালাই নেই। খেলার সময়ের টানাটানি নেই। বাড়িতে বা বাইরে দুর্দান্ত খাবারের পদ! সব মিলিয়ে পুজোর মূল সুর আজও ছোটদের তারেই বাঁধা। তবে নিয়মভাঙার দিনেও আলগা কিছু নিয়ম পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। তাই বাবা-মা কিংবা অভিভাবকদের জন্য বিশেষ কিছু নিয়ম থাকে। সেসব মেনে চললে তবেই উৎসবের আবহে সন্তান ভালো থাকবে। পুজোর সময় সন্তানের যত্নের খতিয়ান রইল হাতের মুঠোয়। পরামর্শে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অম্লান সেন ও ডাঃ সৌমেন্দ্রনাথ রায়।
সদ্যোজাত-৬ মাস
সদ্যোজাত শিশু থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে নিয়ে পুজোয় বেরনো যাবে না। শুনে হতোদ্যম হয়ে পড়লেও উপায় নেই। একটা বছর এটুকু ত্যাগস্বীকার মা-বাবাকে করতে হবে। নিজেদের বেরতে হলে বাড়ির আত্মীয়স্বজনদের কাছে বা বাড়িতে থাকবেন এমন নির্ভরযোগ্য কারও কাছে ওটুকু সময় শিশুকে রেখে বেরন। ভিড় ও জনঅরণ্য শিশুর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলবে। অনেক জায়গায় পাড়ার বা কমপ্লেক্সের পুজো হয়। শিশুকে পুজোর আবহ দিতে চাইলে তার বয়স ৬-৭ মাস বা ১ বছর পেরলে সেসব জায়গায় অল্প কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে যান।
ভিড় এড়িয়ে রাখুন শিশুকে। সদ্যোজাত শিশু হলে ভিড়ে রাখা একেবারেই যাবে না। ভিড় এলাকায় ঢোকার আগে মাস্ক পরান। অন্য সময় নাহয় ব্যাগে রাখুন। ডিসপোজেবল বা সুতির মাস্ক ব্যবহার করুন। এই সময় শিশুরা যা খুশি মুখে দেয়। হাত বারবার মুখে দেয়। হাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বেবি স্যানিটাইজার দিন।
কোলের শিশুকে রাস্তার খাবার, জল, রঙিন শরবত খাওয়ানোর প্রশ্নই ওঠে না।
এই সময় শিশু মাতৃদুগ্ধের বদলে অন্য কিছু খাবে না।
এই সময় আবহাওয়া বদলায়। ঠান্ডা লাগার হাত থেকে বাঁচতে গরম পোশাক হাতের কাছে রাখুন
৬ মাস-২ বছর
ভিড়ে ঢুকলে মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। বাইরের খাবারের বেলায় একই রকম নিয়ম বলবৎ থাকবে। এই সময় শিশু অল্পবিস্তর বাইরের খাবার খায়। তবে পুজোর সময় রাস্তার খাবার, জল, আইসক্রিম, রঙিন শরবত দেওয়া চলবে না। জল ফুটিয়ে খাওয়ান।
ঠাকুরের ভোগ শিশুর মুখে ঠেকানোর প্রথা বহু বাড়িতে আছে। ভোগ আগে নিজেরা খেয়ে দেখে নেবেন মশলা বা ঝাল কতটা। সেই বুঝে অল্প একটু খাওয়াতেই পারেন। তবে সেই ভোগ যেন চেনা জায়গার হয়— কীভাবে রান্না হচ্ছে, কতটা পরিচ্ছন্ন উপায়ে ভোগ রাখা হচ্ছে, এগুলো যেন জানা থাকে।
২-৬ বছর
মাস্ক ও স্যানিটাইজারের নিয়মে কোনও বদল নেই।
পুজোর অল্পবিস্তর স্ন্যাক্স, একটু চাউমিন এসব খাওয়ার ঝোঁক এই সময় বাড়ে। নজর রাখুন সেসব যেন পরিচ্ছন্ন জায়গার হয়। পরিমাণে অল্প দিন। পেট ভরাক বাড়ির খাবার খেয়ে। কোনও খাবারে অ্যালার্জি থাকলে সেটা কোনওভাবেই দেবেন না।
এই সময় শিশুরা ক্যাপ-খেলনা বন্দুক ব্যবহার করে। বারুদের হাতে যেন না খায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে মা-বাবাকে।
এই সময় আবহাওয়া বদলায়। প্রয়োজনে গরম পোশাক হাতের কাছে রাখুন।
৭-১৩ বছর
এই সময় সন্তান ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। বাইরের খাবার চাখতে শেখে। পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে শেখে। একটু ছকভাঙা, নিয়মহীন দিন কাটালে অসুবিধা নেই। তবে খাবার সময় যেন বজায় থাকে। দুটো খাবারের মাঝের গ্যাপ যেন বেড়ে না যায়। সকালে ব্রেকফাস্ট একটু নিয়ম মেনে দিন। সারাদিন নানা অনিয়ম হবে। তাই ব্রেকফাস্ট বাড়ির খাবার হওয়াই ভালো। পুজোর সময় ব্রেকফাস্টে লুচি রোজ নয়।
বাইরের খাবার এই সময় খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। বাইরে খেলেও যেন ভালো পরিচছন্ন রেস্তরাঁ বা আউটলেট থেকে খাওয়াদাওয়া করে। মনের মতো খাবার বেশিরভাগটাই বাড়িতে বানিয়ে দিন। রাস্তার জল, রঙিন শরবত দেবেন না।
পুজোর ক’দিনের অনিয়ম সামাল দিতে সকালে ঘরেই মিনিট ২০ ফ্রি হ্যান্ড সেরে নিক। শরীর এতে সচল থাকবে, ক্যালোরি ঝরবে।