রাজদীপ গোস্বামী, ছোট আঙারিয়া: সিপিএম নেতাদের মাতব্বরি, চোখরাঙানি এখন অতীত। তবে, ‘লাল সন্ত্রাস’-এর স্মৃতিচিহ্নটুকু আজও থেকে গিয়েছে ছোট আঙারিয়ায়। আজকের প্রজন্ম গ্রামের রাস্তা দিয়ে গেলে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার অন্তত দেখে নেয়, গণহত্যার স্থানটি। কোথাও কোথাও স্বজন হারানোর চাপা আর্তনাদও শুনতে পান কেউ কেউ। রাজ্যে পালাবদলের পর গড়বেতার সেই ছোট আঙারিয়ায় বদলে গিয়েছে অনেককিছুই। এবার গ্রামের মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বাড়ি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। এই প্রথমবার তাঁরা পেলেন সরকারি বাড়ি। ইতিমধ্যেই বহু গ্রামবাসীর অ্যাকাউন্টে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে প্রথম কিস্তির টাকা ঢুকে গিয়েছে। প্রশাসনের ইচ্ছে, ছোট আঙারিয়ায় প্রকৃত উপভোক্তাদের সকলেই পাকাবাড়িতে বাস করুন। ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্যপূরণ করতে তৎপরতাও শুরু হয়েছে।
Advertisement
বুধবার কথা হচ্ছিল গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে। তাঁরা বলছিলেন, ‘আজকের ছোট আঙারিয়া সেদিনের সেই ছোট আঙারিয়া নয়। কারও রক্তচক্ষু দেখানো নেই গ্রামজুড়ে এখন অনাবিল শান্তি। গ্রামবাসীদের প্রায় সকলেই কোনও না কোনও সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। গ্রামে ঢোকার রাস্তা, পানীয় জলের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসেছে ট্যাপকল। গড়বেতা থেকে গ্রামে ঢোকার রাস্তাটি বাম আমলে লালমাটির ছিল। এখন পিচের চওড়া রাস্তা। গ্রাম থেকে উধাও হয়েছে রাজনৈতিক হানাহানির সেই চেনা ছবিও।’
গ্রামবাসীদের কথার সূত্র ধরে জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতি অসীম ওঝাও বলছিলেন, ‘একসময় ছোট আঙারিয়া গ্রামের নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। অন্য রাজনৈতিক দল করলেই চলত অত্যাচার। আজ গ্রামে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। এই গ্রামে সরকারি প্রকল্পে বাড়ি তৈরি হবে। আরও উন্নয়নমূলক কাজ হবে। দিন কয়েক আগে ছোট আঙারিয়ায় শহিদ দিবস পালিত হয়। বিরোধীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
সময়টা ২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি। ছোট আঙারিয়ায় ঘটে যায় হাড়হিম করা গণহত্যা। গ্রামের তৃণমূলকর্মী বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে বৈঠক চলাকালীন সিপিএমের হার্মাদ বাহিনী হামলা চালায় বলে অভিযোগ। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বাড়িতে। জীবন্ত পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ তৃণমূলকর্মীর। কয়েকজন কোনওক্রমে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। ঘটনার পর এলাকায় পুলিসকেও ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে সিপিএমের বিরুদ্ধে। তোলপাড় শুরু হয় গোটা দেশেই। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ছোট আঙারিয়ার। পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বক্তারের বাড়িটিও নতুন কলেবরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। মাটির দেওয়াল ভেঙে হয়েছে পাকার দালান। সেখানেই অভিশপ্ত স্মৃতি আঁকড়ে বসবাস করেন তাঁর পরিবার। গ্রামবাসীদের কথার সূত্র ধরে জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতি অসীম ওঝাও বলছিলেন, ‘একসময় ছোট আঙারিয়া গ্রামের নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। অন্য রাজনৈতিক দল করলেই চলত অত্যাচার। আজ গ্রামে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। এই গ্রামে সরকারি প্রকল্পে বাড়ি তৈরি হবে। আরও উন্নয়নমূলক কাজ হবে। দিন কয়েক আগে ছোট আঙারিয়ায় শহিদ দিবস পালিত হয়। বিরোধীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
বর্তমানে গ্রামে ঢালাও উন্নয়ন হয়েছে। জানা গিয়েছে, গ্রামের ৩৪টি পরিবার বাড়ি পাবেন। ইতিমধ্যেই চারটি পরিবার প্রথম কিস্তির টাকা পেয়েছেন। পর্যায়ক্রমে সবাই বাড়ি পাবেন। গ্রামে বেশিরভাগ মাটির বাড়ি। এত দিন সমস্যায় পড়তে হতো তাঁদের। বর্ষা কালে ঘরের ভিতর জল উঠে যেত। বাড়িতে থাকতে পারতেন না। এবার বাংলার বাড়ি প্রকল্পের সৌজন্যে স্বস্তি পেয়েছেন গ্রামবাসীরা। প্রথম কিস্তির টাকা পেয়েছেন আখতার মল্লিক। তিনি বলছিলেন, ‘সিপিএমের আমলে রাজনৈতিক হানাহানি লেগেই থাকত। সেই সময় সময়ের কথা আজও মনে পড়ে। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম সরকারি প্রকল্পে বাড়ি তৈরির টাকা আর পাব না। অবশেষে বাড়ি পেয়েছি। আমার খুব উপকার হল। মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
ছোট আঙারিয়া গ্রাম।-নিজস্ব চিত্র



