Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘হিন্দু ভারত’ গড়ার লক্ষ্যেই ভোটার তালিকা বদল!

নির্বাচন কমিশনকে ঢাল করে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নয়া জুমলা ভোটার তালিকার আমূল বদল। সিএএ, এনআরসি নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানার পর এবার  ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করার আড়ালে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ(এসআইআর)।

‘হিন্দু ভারত’ গড়ার লক্ষ্যেই ভোটার তালিকা বদল!
  • ১৩ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ

Advertisement

নির্বাচন কমিশনকে ঢাল করে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নয়া জুমলা ভোটার তালিকার আমূল বদল। সিএএ, এনআরসি নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানার পর এবার  ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করার আড়ালে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ(এসআইআর)। বিরোধীদের অভিযোগ, এই দিয়েই শুরু হয়েছে এনআরসি’র কালা পদক্ষেপ। বিহার দিয়ে শুরু হলেও আসল লক্ষ্য বাংলা। আরএসএসের শতবর্ষে হিন্দু ভারত গড়াই যার প্রধান এজেন্ডা। প্রথমেই বলে রাখা ভালো আমিও একজন হিন্দু। সাচ্চা হিন্দু বাবা-মায়ের সন্তান। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি সকালে পুজো না করে কেউ চা পর্যন্ত মুখে তুলতেন না। সেই সুবাদেই স্কুলশিক্ষা রামকৃষ্ণ মিশনে। কিন্তু ধর্মের কাঁসরঘণ্টা বাজিয়ে ক্ষমতা দখলের আগ্রাসনের ঘোরতর বিরোধী। পবিত্র রামনামকে যদি কেউ সস্তা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে যায় তাহলে তো বটেই। মন্দির ভক্তির জায়গা, সবাইকে মেলানোর পুণ্যভূমি। তাকে ব্যবহার করে একসঙ্গে চলার শপথ থেকে কেউ বিচ্যুত হলে সেই ধর্মকে মানার প্রশ্নই ওঠে না। সময়ের দৌড়ে তা বেশিদূর এগতেও পারে না। কারণ তা রাজনৈতিক জুমলারই আর এক নগ্ন প্রকাশ! এমন ভোটসর্বস্ব হিন্দুত্ব বোধহয় চৈতন্য থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ কেউ চাইতেন না। আজও বাংলার সিংহভাগ জনগণ চান না। তাই মেকি হিন্দুদের শত হুঙ্কারেও বাংলার মাটি একটুও গেরুয়া হয় না। চাপে পড়ে বহুত্ববাদের নাম জপলে হবে না, কাজে করে দেখানোটাই আসল চ্যালেঞ্জ।
বিহারে ভোট নভেম্বরে। বাংলায় ছাব্বিশের মার্চ-এপ্রিলে। সামনে উৎসবের মরশুম। এই বিশেষ সময়টায় মাত্র এক মাসের মধ্যে এত বড় একটা সংশোধন প্রক্রিয়া তাড়াহুড়ো করে হাতে নেওয়ার মানে কী? চোদ্দো বছর দেশে জনগণনা হয়নি। জাতপাতের সমীক্ষা, বিভিন্ন প্রদেশে জনবিন্যাসের চারিত্রিক বদল নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা কথা হয়েছে, কিন্তু ওইটুকই। কেউ খতিয়ে দেখেনি আসল চিত্রটা। এখন ভোটের আগে এই সক্রিয়তার পিছনে বেআইনি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য, নাকি একটি সম্প্রদায়কে ভয় দেখিয়ে তাঁবে নিয়ে আসা? বিহারে বিধানসভা ভোটের মুখে এবং বাংলায় গদি দখলের লড়াই ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছনোর আট মাস আগে সংখ্যালঘুদের জুজু দেখানো কি আরএসএসের গোপন এজেন্ডা নয়। যা কার্যকর করতে মরিয়া অমিত শাহের নয়নের মণি বেচারা সিইসি জ্ঞানেশকুমার। অনেক হম্বিতম্বি করলেও সোজা আঙুলে ঘি ওঠার নয় বুঝেই ভোটার তালিকার আমূল বদলের দিকে হাত বাড়িয়েছে সঙ্ঘ। কারণ বিহারে এনডিএতে অনৈক্য প্রকট। কেরিয়ারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে সংযুক্ত জনতা দলের সুপ্রিমো মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার গিরগিটির চেয়েও দ্রুত রং বদলানো বৃদ্ধ নীতীশ কুমারকেও খুব একটা আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে না। রামবিলাস পুত্র চিরাগ অধিকাংশ আসনে একতরফা প্রার্থী দাঁড় করানোর হুমকি দিয়েছেন। অন্যান্য শরিকরাও দর হাঁকছেন। এতদিন ক্ষমতা ভাগাভাগির পরও একার ক্ষমতায় বিহারে সরকারকে নেতৃত্ব দেওয়ার মুখ খুঁজে পায়নি বিজেপি। বাংলায় নয় কোনওদিন ক্ষমতায় বসার সুযোগই হয়নি। কিন্তু বিহারেও জাতীয় দল বিজেপি আজও এমন নীতীশ নির্ভর এলেবেলে হয়ে রয়েছে কেন, তার জবাব নেতৃত্বের কাছে নেই। সেই কারণেই অনুপ্রবেশকারী ইস্যু চাগিয়ে বাজিমাতের চেষ্টা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী যেমন পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়ছে, তেমনই ত্রিপুরাতেও ধরা পড়ছে। দিল্লিতেও আছে, গুজরাতেও আছে? এই অবৈধ অনুপ্রবেশে দায় কার? অমিত শাহের হাতে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রুখতে পারছে না কেন? বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঘটছে অমিত শাহের মন্ত্রকের ব্যর্থতায়। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, কে নাগরিক আর কে নয়, তা স্থির করার এক্তিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। নির্বাচন কমিশন কারও নাগরিকত্ব কাড়তে পারে না। এই ইনটেনসিভ রিভিশনের মধ্যে দিয়ে কমিশন তার সীমা অতিক্রম করছে না তো? কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে ভোটদান সম্পন্ন করা, নাগরিকত্ব দেওয়া কিংবা কাড়া নয়! বিহারের ভোটার তালিকার এই রিভিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে সরকারি হস্তক্ষেপেরই জ্বলন্ত উদাহরণ। যাঁরা বাংলায় পুলিসকে দলদাস বানানোর অভিযোগে গলা ফাটান তাঁরাই কমিশনকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রশ্নে আজ নীরব। বাংলা বললেই বাংলাদেশি বলে দেগে দেওয়ার নেপথ্যে কোন রাজনৈতিক অভিসন্ধি? 
আমাদের দেশে মাত্র ৪২ শতাংশ মানুষের জন্মের শংসাপত্র আছে। যাদের নিজেরই বার্থ সার্টিফিকেটই নেই তাঁরা বাবা-মায়েরটা জোগাড় করবে কী করে? এত লাইন দিয়ে হেনস্তার মুখোমুখি হয়ে আধার কার্ড সংগ্রহ করে লাভটা কী হল? যদি তা প্রাথমিক পরিচয়পত্রের মর্যাদাই না পায়। অথচ এই মুহূর্তে ১৩৯ কোটিরও বেশি মানুষের আধার আছে। যা স্বীকৃত ভোটার কার্ডের গ্রাহক সংখ্যার চেয়েও প্রায় ৪৫ কোটি বেশি। শেষ লোকসভা ভোটে ভোট দিয়েছেন ৬৪ কোটি নাগরিক। ৩২ কোটি ভোটাধিকার প্রয়োগই করেননি। অর্থাৎ ১০০ কোটির হাতে ভোটার কার্ড আছে। এখন ভোটার কার্ডও যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয় তাহলে কাদের সমর্থনে নরেন্দ্র মোদি ১৪০ কোটির দেশে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী? 
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার হচ্ছে। শুধু তাই নয়, যে নথিগুলিকে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র হিসেবে চাওয়া হচ্ছে, তা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আম জনতাকে। কারণ তালিকায় আধার নেই, ভোটার কার্ডও রাখা হয়নি। তার মধ্যে রয়েছে—পেনশন পেমেন্ট অর্ডার, জন্ম শংসাপত্র, পাসপোর্ট, ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট, জমি-বাড়ির রেকর্ড, বন অধিকার সার্টিফিকেট ইত্যাদি। ১৯৯৩ সালে ভোটার কার্ড দেওয়া শুরু হয়। আধার আসে ২০১০ সালে মনমোহন জমানায়। ১৭ বছর পর। ১৯৯৫ সাল থেকে ধীরে ধীরে প্যান কার্ড চালু হয়। সব বাদ দিয়ে ওই ১১ টি সার্টিফিকেট চালু করার আসল উদ্দেশ্য গরিব, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্ন করা নয়তো? জনসংখ্যার কত শতাংশ কোনও সরকারি পেনশন পান যে পিপিওকে তালিকায় রাখা হল? এখন সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন ধমকে) কী হবে জানি না! সবিনয়ে প্রশ্ন করি, তাহলে আধার নিয়ে এত আহ্লাদের কী ছিল বর্তমান মোদি সরকারের। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কেউ বলেন কুড়ি হাজার কোটি, কেউ বলেন পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। আবার শুধু কার্ড থাকলেই হবে না। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত আধার ও প্যান, আধার ও ভোটার কার্ডের সংযুক্তি নিয়ে মানুষের হিমশিম দশা। নাহলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে বলে হুমকি। ভর্তুকি মিলবে না। আয়কর রিটার্ন দাখিলও হবে না। এখন যখন বিহারে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র হিসেবে ১১টি নথির তালিকা দিয়েছে কমিশন, তাতে আধার, ভোটার কার্ডের উল্লেখ নেই। এ কেমন রঙ্গ! অনেক ভোটারের কাছেই নতুন এই ১১ নথির কোনওটিই নেই। সেইসব ভোটারদের আবার অধিকাংশই প্রান্তিক, দরিদ্র। তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। সেকারণেই এর বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে একাধিক দল। 
১৯৫০ সালের ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আইনের অধীনে তালিকায় দু’টি ধরনের সংশোধনের কথা বলা রয়েছে। এক, সার্বিক সমীক্ষা। দুই, সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা। কিন্তু কমিশন যে স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কথা বলেছে তার কোনও উল্লেখ আইনে নেই। সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, জাল পরিচয়পত্র কাজে লাগিয়ে দিব্যি ‘ভারতীয়’ হয়ে উঠছেন অনুপ্রবেশকারীরা! গোলমাল রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ৬ নং ফর্মে। কী আছে সেখানে? কমিশনের ৬ নং ফর্মে রয়েছে বিপুল শক্তি। যাতে বলা হয়েছে, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি ভারতীয়দের তাঁদের বাসস্থানের এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম উঠবে। ভারতীয় প্রমাণ করতে একটি ব্যক্তিগত ঘোষণাপত্র এবং জন্ম তারিখের প্রমাণ দিলেই চলবে। জন্ম তারিখের প্রমাণ হিসেবে হাসপাতাল থেকে দেওয়া জন্মের শংসাপত্র ছাড়াও প্যান কার্ড, আধার কার্ড গ্রাহ্য হবে। অর্থাৎ, ঘুরপথে আধারের শক্তিই ভারতীয় নাগরিকত্বের ‘প্রমাণপত্র’ হয়ে উঠেছে গত দু’দশক। এখন হঠাৎ আধার বাদ কেন? কমিশনেরই ফর্ম ৬-এর নথি হিসেবে আধারের অনুমোদন রয়েছে। আচমকা কমিশনের এই দু’মুখো নীতির কারণ সম্পূর্ণ রহস্যাবৃত!
প্রশাসনিক ব্যাখ্যা যাই হোক, সবাই বুঝতে পারছেন প্রকৃত উদ্দেশ্য। বিহারে জিততে এবার সন্ত্রাস শুরু হচ্ছে ভোটার তালিকা থেকেই। সফল হলে সেই পাইলট প্রজেক্ট চলবে বাংলা, তামিলনাড়ু, কেরল, অসম সর্বত্র। একবার নাগরিকত্ব হারালে তুমি হারিয়ে যাবে ডিটেনশন ক্যাম্পের অন্ধকারে। এভাবেই নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে গরিব প্রান্তিক মানুষকে সবক শেখানোর পালা। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারলে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রটাই বদলে যাবে অচিরে। আরএসএসের শতবর্ষে হিন্দুত্বের বৃত্ত সম্পূর্ণ করার মরিয়া প্রয়াস!

সম্পর্কিত সংবাদ