অমিত চৌধুরী , তারকেশ্বর:
অমিত চৌধুরী , তারকেশ্বর:
দুর্গাপুজোর শেষ দিন চণ্ডীতলায় হয় দেবী চণ্ডীর পুজো। সে পুজো উত্তরবাহিনী দেবীর ‘জাত উৎসব’ (ঘট প্রতিষ্ঠা) বলে পরিচিত। বিপুল জনপ্রিয়। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই উৎসব হয়ে চলেছে। উৎসব ঘিরে বিপুল ভক্ত সমাগম হয় চণ্ডীতলার শিয়াখালায়।
জাঙ্গিপাড়ার রাজবলহাটের রাজবল্লভী দেবীর সঙ্গে মূর্তি এবং পুজো পদ্ধতির সাদৃশ্য থাকায় উত্তরবাহিনী পরিচিত রাজবল্লভী দেবীর বোন বলেও। এবং দেবী বিশালাক্ষী নামেও খ্যাত। শায়িত ভোলানাথের উপর দণ্ডায়মান তিনি। অগ্নিবর্ণা, দ্বিভূজা, ত্রিনয়না। গলায় মুণ্ডমালা, ডান হাতে খড়্গ, বাম হস্তের তালুতে রুধির রাঙা পাত্র। দক্ষিণ চরণ ভোলানাথের বুকে। অন্য পা বটুক ভৈরবের মস্তকে। শিবের বুকের ওপর অসুরের কাটা মুণ্ড পড়ে থাকে।
দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজেন্দ্রনাথ ভট্টনারায়ণ। কয়েক শতাব্দী আগে মুর্শিদাবাদ নবাবের দেওয়ান পুরন্দর খাঁ শিয়াখালার এই গ্রামে বসবাসের মনস্থির করেন। সুদূর কনৌজ থেকে ৮০ ঘর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে বসবাসের জন্য আনেন। তাঁরা শাণ্ডিল্য গোত্রীয় ভট্টনারায়ণ বংশ। এই বংশের কৃষ্ণানন্দের পৌত্র রাজেন্দ্রনাথ ছিলেন পড়াশোনায় অমনোযোগী। একদিন তাঁর পিতা ক্ষুব্ধ হয়ে গৃহিনীকে ভাতের পরিবর্তে ছেলেকে ছাই দেওয়ার আদেশ দেন। থালায় ছাই দেখে দুঃখে গৃহত্যাগ করেন রাজেন্দ্রনাথ। গ্রামের ধারে নির্জন শ্মশানের কাছে কৌশিকী নদীতে প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প করেন। ঘন জঙ্গল থেকে সে সময় ভেসে আসে দৈববাণী ‘তুই মরবি কেন? নদীতে ডুব দে। স্নান সমাপণে আমায় নদীগর্ভ থেকে তুলে আন। প্রতিষ্ঠা কর। তোর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।’
নদীতে ঝাঁপ দেন রাজেন্দ্রনাথ। জল থেকে তুলে আনেন প্রতিমা। নদী তীরে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই হলেন উত্তরবাহিনী দেবী। সে কৌশিকী নদী এখন লুপ্তপ্রায়। তবে দেবী আছেন স্বমহিমায়। পরবর্তী সময় রাজেন্দ্রনাথ পুজা করার মধ্য দিয়ে পণ্ডিত সমাজে সার্বভৌম উপাধিতে ভূষিত হন। মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত সুশীল ভট্টাচার্য জানান, দেবীর অন্যতম প্রসাদ হল মাছ। রাজবল্লভী দেবীর মতই তা দেওয়ার রীতি। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা শিলালিপি থেকে জানা যায় ৫৪১ বছর আগে শিয়াখালা (শিবাক্ষেত্র থেকে নামটি এসেছে) ছিল তন্ত্রসাধনার বিখ্যাত ক্ষেত্র। ৩০৭ বছর আগে বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদ মহাতাব মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সম্পত্তি দান করেছিলেন। পুরনো মূর্তিটি খোয়া গিয়েছিল। তারপর ১৩৪০ সালের ১৬ই আষাঢ় বর্তমানে পূজিত প্রস্তর মূর্তিটি তৈরি হয়ে আসে কাশীধাম থেকে। উত্তরবাহিনী সেবাসমিতির সম্পাদক অরুময় বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বছরে বেশ কয়েকটি উৎসব হয়। বৈশাখে দেশমালা উৎসব। নতুন মূর্তি স্থাপনের দিন স্মরণ করে আষাঢ় মাসে বার্ষিক উৎসব। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে পুরনো ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট স্থাপন হয়। এই অনুষ্ঠানই হল জাত উৎসব। রাজেন্দ্রনাথ বংশীয় শাণ্ডিল্যগোত্রীয় ভট্টনারায়ণরা পুরনো ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট স্থাপন করেন। বহু ভক্তের সমাগম হয়। দুর্গাপুজোর দশমীর বিষাদ ভুলে সকলে আনন্দে মেতে ওঠেন এসময়। -ফাইল চিত্র