নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো মানেই এক নতুন আলোক-বিশ্ব দেখতে পাওয়ার সুযোগ। জগদ্ধাত্রী পুজো আর আলোকশিল্প হরিহর আত্মা যদি হয়, তবে থিম তার শরীর। শতাধিক পুজোর আয়োজন হয় চন্দননগরে। ফলে, থিম নিজেও যেন চিত্তসুখের উল্লাসে পাখনা মেলে। এক একটি শহুরে পথের ধারে তাই অবয়ব ধরে ওঠে বর্ণময় সাজের এক ভিন্ন দুনিয়া। ক্ষণে ক্ষণে তাক লেগে যায়। একটি থিমের মৌতাতেই মিশে যায় আরেক থিমের সুগন্ধ। পলক ফেলার আগেই জুটে যায় চমকিত হওয়ার নয়া উপাদান। ২০২৫ সালে এসেও গঙ্গাপাড়ের সাবেক ফরাসি কলোনি চমকে দিতে কোমর বেঁধেছে। একটি শহরের ‘একা উঠিয়াছি বিশ্ব ছাড়িয়া’ অহং-এর পালে লেগেছে মৃদুমন্দ বাতাস।
চন্দননগরের রথের সড়ক, সম্বলা শিবতলা এবার সেই চমকের আসরে রেখেছে এক অভিনব থিম। নাম ‘সম্পর্কের বিনিসুতো’। একদা একান্নবর্তী বা আধুনিক নিউক্লিয়ার পরিবারের নিউক্লিয়াস হয়ে থাকেন মা বা মাতৃসমা কেউ। কীভাবে তাঁরা বাঁধেন সকলকে নানা সম্পর্কের মিহিন অদৃশ্য সুতোয়? তারই এক ঝলক দেখা যাবে থিমের মোহন মায়ায়। মণ্ডপসজ্জার কেন্দ্রে ঘূর্ণায়মান খাটে থাকবেন মা। তিনি ঘুরছেন অর্থাৎ চারদিকে নজর রাখছেন। আর তাকে কেন্দ্র করে ফুটে উঠবে পারিবারিক নানা সম্পর্কের জটাজালের দৃশ্য। একগুচ্ছ মডেল, হাতে আঁকা ছবি, লোহার আংটা, নৌকা, সুতো আর মাটির নানা কাঠামোয় সাজিয়ে তোলা হবে মণ্ডপ। একটি বিমূর্ত বাড়ির আদল ছায়ার মতো মণ্ডপকে ঘিরে বিরাজ করবে। মণ্ডপসজ্জাকে ফুটিয়ে তুলতে যেমন বাহারি আলোর সাজ থাকবে, তেমনই পথঘাটও আলোকিত করবে চন্দননগরের বৈদ্যুতিন সাজ। দেবী এখানে ধাতব অবয়বে মণ্ডপে বিরাজ করবেন। থিমের সঙ্গে সঙ্গত করতে দেবী এখানে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে দর্শন দেবেন। সাবেক ধাঁচের মূল প্রতিমা মাটি দিয়ে তৈরি হবে। তাতে থাকবে সোনালি সাজ। পুজো উদ্যোক্তা অভিজিৎ সেন (হাঁদা) বলেন, থিমের জাদুতে বরাবরই আমরা তাক লাগিয়েছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
সম্পর্কের বিনিসুতোর টান থেকে বেরিয়ে এলে দর্শকরা হাজিরা দিতে পারেন ‘জলসাঘর’-এ। এক্কেবারে জলসাঘর অবশ্য নয়। বারাসত ব্যানার্জিপাড়ার এবারের থিম জলসাঘরের আদলের মণ্ডপ। এবছর পুজোর হীরকজয়ন্তী বর্ষ। ফলে বাড়তি আবেগের ছড়াছড়ি পুজো আয়োজনকে ঘিরে। জলসাঘর বললেই দর্শকের মাথায় আসে, বেলোয়ারি ঝাড়। সুদৃশ্য বিরাট আয়তনের ঝাড়ের আলোক বিচ্ছুরণ পুজো মণ্ডপে ঢুকলেই চোখ ধাঁধাবে। দেবী এখানে মৃণ্ময়ী এবং সাবেক সাজে সজ্জিতা। কিন্তু সাজ? হ্যাঁ, এখানেই আছে চমক আর থিমের বাহার। দেবীর শোলার সাজ এবার রামচন্দ্রের অকালবোধনের আদলে তৈরি করা হয়েছে। নিপুণ কারিগরিতে শোলার বুকে ফুটে উঠছে ১০৮টি পদ্ম আর একটি পদ্ম চুরির পৌরাণিক কাহিনি। পুজো উদ্যোক্তা শুভেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, আলোকসজ্জাতেও আমাদের থিম আছে। পশুপাখিদের জীবন আর পরিবেশকে তুলে ধরার সঙ্গে ১৮টি তোরণে সাজবে মণ্ডপে আসার পথ।
এ যেন সেই ‘সাজো এবং সাজাও’-এর সুরেলা ঝঙ্কার। সাজ দেবীর, আর শহরের। তাতে সেজে উঠছে উৎসবপ্রেমী গুচ্ছ নাগরিকের পিপাসু চিত্ত। চন্দননগরের চন্দনতুল্য মহার্ঘ সুগন্ধ তার মোহজাল ছড়াতে শুরু করেছে। গঙ্গার খেয়ালি বাতাসে গুলিয়ে যাচ্ছে সাজো এবং সাজাও-এর সমীকরণ।