কলহার মুখোপাধ্যায়:
কলহার মুখোপাধ্যায়:
এবার দুর্গাপুজো একটু আগে পড়েছিল বলে ছাতিম ফোটেনি। ফুল ফুটছে এখন, কালীপুজোর সময়। চেতলা বাজারের দিকে যেতে গেলে ছাতিমের চড়া গন্ধ যেখানে বোগেনভিলিয়ার ঝোপে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, তার ঠিক পাশেই আছে একটি বহু প্রাচীন বটগাছ। সেখান থেকে উঁকি দিলে বিশাল কালীঠাকুরটি দেখা যায়। দু’হাত বাঁধা মোটা লোহার শিকলে। নাম ‘ডাকাত কালী’। রূপ উগ্রচণ্ডা।
রঘু ডাকাত যাবেন ডাকাতি করতে। গৃহস্থকে আগেভাগে জানিয়েই তাঁর বাড়িতে যেতেন। সেবার যাঁর বাড়ি যাবেন, সে গৃহস্থ আবার কালীর উপাসক। ডাকাতি রুখতে তিনি হত্যে দিয়ে পড়লেন কালীর পায়ে। কয়েক রাত এভাবে কাটার পর ঠাকুরের দয়া হল। একরাতে স্বপ্নে এসে ভক্তকে বললেন, ‘ভয় নেই’। তারপর পরমভক্ত রঘু ডাকাতকে নিষেধ করলেন যেতে। কিন্তু রঘু দুর্দান্ত। অকুতোভয়। নিষেধাজ্ঞা মানা সম্ভব নয়, সটান জানালেন কালীকে। দেবী অসন্তুষ্ট। ডাকাতি রুখবেন। রঘু তারপর করলেন কী, কালী যাতে মন্দির থেকে কোনওভাবেই বেরতে না পারেন, তার জন্য শিকল দিয়ে হাত বেঁধে দিলেন। তবে এত করেও রঘুর সেই অভিযান সফল হয়নি। ডাকাতি ব্যর্থ হল। কালী শেষপর্যন্ত রক্ষা করলেন গৃহস্থ ভক্তকে। রঘু ডাকাতের সেই কালী নাকি তারকেশ্বর যাওয়ার পথে কোথাও একটা ছিল। সেটির আদলেই বছর পঞ্চাশ আগে চেতলায় গড়া হয়েছিল একটি মূর্তি। স্থাপন করা হয়েছিল মন্দির। ১৬ ফুট উঁচু প্রতিমা গড়ে দিয়েছিলেন মৃৎশিল্পী পান্নাপাল পাল। রঘুর কালীর অনুকরণে হাত বেঁধে দিয়েছিলেন লোহার শিকলে। মন্দিরে গেলে গল্পটি শুনিয়ে দেবেন মহম্মদ কাজি। তিনি এই মন্দির কমিটির সম্পাদক। তাঁরাই বর্তমানে ডাকাত কালীর পুজো করেন। তাঁরাই মূর্তি তৈরির ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। চেতলা কালীপুজোর দায়িত্ব এখন সামলান মহম্মদ কাদির, অশোক দাস, সাবির হোসেন, স্বপন মল্লিক, এস কে রাজুরা।
এছাড়াও বেশ কয়েকটি কাহিনি প্রচলিত ডাকাত কালীকে ঘিরে। লোকশ্রুতি, এখানকার মা কালী খুবই চঞ্চল। রাতে চলাফেরা করেন। তাই লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হয়। কয়েকজন প্রবীণের দাবি, কালী মূর্তিকে শিবের বুক থেকে নামতে পর্যন্ত দেখেছেন। নেমে মন্দিরে হেঁটে-চলে বেড়ান মা। আরও একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। সেটি রঘু ডাকাতের নয়। অন্য দুই ডাকাত— নীলু ও ভুলুর গল্প। তারকেশ্বর অঞ্চলের এই দুই ডাকাতের গল্প মিশে রয়েছে কলকাতার এই কালী মন্দিরে। শোনা যায়, একবার তারকেশ্বর যাওয়ার পথে মা সারদাকে নীলু ও ভুলু ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের ডেরায় বেঁধে রেখেছিল। পরে দেখতে পায় মা সারদার জায়গায় বসে আছেন স্বয়ং কালী। এরপর তাঁরা মা সারদাকে ছেড়ে দেন। প্রতিষ্ঠা করেন কালী মন্দির। সেই কালীর অনুরূপেই নাকি তৈরি চেতলার ডাকাত কালী। তবে বারবারই ঘুরেফিরে আসে রঘু ডাকাতের নাম। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মায়ের মূর্তি শিকল দিয়ে বেঁধে যেতেন রঘু। কারণ তাঁর ভয় ছিল, মা তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন। সেই ভয়েই মূর্তি বেঁধে যেতেন শিকলে। তবে সে বহু প্রাচীন গল্পকথা। চেতলার কালী অত প্রবীণ নন। মহম্মদ কাজি বলেছেন, ‘চেতলায় বহু রকমের কালীর পুজো হয়। আলাদা কিছু করতেই এলাকার কয়েকজন ডাকাত কালী প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেছিলেন। তবে মূর্তি তৈরি হয়েছিল রঘুর কালীর অনুকরণেই।’