সমৃদ্ধ দত্ত: হঠাৎ প্রবল প্লেগের মহামারীতে মা আর বাবার মৃত্যু হয়েছে। মহাসঙ্কটে পড়েছিল ১৩ বছরের কিশোর নাগপুরের কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। দিশাহারা অবস্থা। অনাথ এই কিশোর কী করবে? বালগঙ্গাধর তিলকের আদর্শে অনুপ্রাণিত এক চিকিৎসক ডক্টর বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে দায়িত্ব নিলেন কেশবের পড়াশোনার। কেশব প্রথমে নাগপুর এবং পরে পুনেতে গিয়ে ম্যাট্রিকুলেশন সমাপ্ত করল। ১৯১০ সালে ডক্টর মুঞ্জে তাঁকে বললেন, কলকাতায় যেতে। মেডিকেল শিক্ষা নিতে। একটি চিঠিও লিখে দিয়েছেন। সেই চিঠি নিয়ে কলকাতায় পৌঁছে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেন হেডগেওয়ার। ১৯১৩ সালে কেশব পেলেন চিকিৎসা করার একটি লাইসেন্স। লাইসেন্সিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি। কিন্তু ভারতীয়দের এই লাইসেন্সকে সর্বতোভাবে ব্রিটিশরা ডাক্তারি করার সার্টিফিকেট হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই প্রথম বড়সড় একটি প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কেশব। সমর্থনের জন্য পৌঁছেছিলেন কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছেও। অবশেষে ডাক্তার হিসেবে ১৯১৬ সালে ফিরলেন নাগপুরে। এবং এসেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন রাজনীতিতে। বালগঙ্গাধর তিলকের হোমরুলের সমর্থক তিনি। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর একজন অনুরক্ত এবং ভক্ত হলেও একটা সময় সেই গান্ধীজির প্রতি তাঁর ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। হঠাৎ গান্ধীজি কেন অসহযোগ বন্ধ করলেন? আর দ্বিতীয় কারণ খিলাফৎ আন্দোলনে হিন্দুদের যুক্ত করার জন্য এত চাপ দেওয়া হচ্ছে কেন? সেই সূত্রপাত দূরে সরে যাওয়ার। ১৯২৪ সালে হেডগেওয়ার ভাবলেন নাগপুরে একটি সংগঠন করা দরকার। হিন্দু সমাজ যেন নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ভুলে গিয়েছে। তাদের সেকথা মনে করিয়ে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এখন। একাধিক সংগঠন স্থাপন করলেন। একটি সংগঠনের নাম হল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক মণ্ডল। সেখানে নানাবিধ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যুবকদের। হেডগেওয়ারের হাতে ততদিনে একটি বই এসেছে। ‘হিন্দুত্ব: হিন্দু কে?’। লেখকের নাম বিনায়ক দামোদর সাভারকর। হেডগেওয়ার ভাবলেন এটাই লক্ষ্য হোক। ভারতীয়ত্ব ও হিন্দুত্ব মিলে তৈরি হবে এক বলিষ্ঠ জাতি। ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিজয়া দশমীর দিন হেডগেওয়ারের নিজের বাড়ির দোতলায় একটি ঘরে কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে তৈরি হল একটি নতুন সংগঠন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ। ২০২৫ সালে সেই সংগঠনের ১০০ বছর হল!
হেডগেওয়ার যে সংগঠনগুলির সংস্পর্শে এসেছিলেন সেই অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর নামক গোপন বিল্পবী সংগঠনে অনুপ্রাণিত অন্য কয়েকজন যুবক আবার ভিন্নভাবে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা ভাবছিলেন। রাশিয়ায় একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। বলশেভিক বিপ্লব। তারই অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখোপাধ্যায়রা। তাসখন্দে ১৯২০ সালে তাঁরা প্রাথমিকভাবে একটি সংগঠন তৈরি করেন। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া। আবার ১৯২২ সালে আরও একটি কমিউনিস্ট গোষ্ঠীর জন্ম হয় বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ দত্তদের মাধ্যমে। ইন্ডিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি। এস এ ডাঙ্গে, মুজফফর আহমেদ, সিঙ্গারভেলু চেত্তিয়ার, গুলাম হোসেনরা শ্রমিক কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ করতে ঝাঁপিয়েছেন। এমতাবস্থায় ১৯২৫ সালে কানপুরে একটি কনফারেন্স আয়োজিত হল। সেখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হল ভারতের নিজস্ব কমিউনিস্ট পার্টির নাম। ডিসেম্বর মাসে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের দুই সংগঠনের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তী দশকগুলিতে এই দুই সংগঠনের প্রভাবই জনমানসে বিপুলভাবে আছড়ে পড়ে।
বহু চড়াই উতরাই, ঘাত প্রতিঘাত, উত্থান পতনের পর আজ এই দুই ধারার সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির বয়স যখন শতবর্ষে পা দিচ্ছে ২০২৫ সালে, তখন দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট আন্দোলন বহু পিছিয়ে পড়েছে। তুলনামূলকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ গোটা ভারতের মানচিত্রকেই দখল করে নিয়েছে। ছাপ ফেলেছে জনমানসে অনেক প্রকট ভাবে। ধর্ম আর সাম্প্রদায়িক আইডেন্টিটি অনেকটাই পরাজিত করে ফেলেছে সাম্য ও সমাজতন্ত্রের স্বপ্নকে।
কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে তৈরি দল শতবর্ষে প্রায় শতধাবিভক্ত। সিপিআই ভেঙে সিপিএম। কখনও আবার নাম হল সিপিআই এমএল। বামপন্থাকে ছাপিয়ে অতিবাম। নকশাল আন্দোলন। পরবর্তীকালে সিপিআই মাওবাদী। মার্কস, লেনিন, মাওদের নামাঙ্কিত দলগুলি সবই করতে পারল, কিন্তু জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবও কেউ করতে পারেনি। তৈরি করতে পারেনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তথা সরকার। সংসদীয় রাজনীতিতে মিশে গিয়ে হরেকরকমবা অন্যান্য তাবৎ দক্ষিণপন্থী দলগুলির মতোই আর একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। সিপিএম যে একদিন জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব করবে একথা আর তারা নিজেরাই ভাবে না। মানুষও এখন আর কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে তাদের বিবেচনা করে না।
পক্ষান্তরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ প্রথম থেকেই চেয়েছে ভারত একদিন হিন্দুরাষ্ট্র হবে। আজকের ভারতকে অঘোষিতভাবে সেটাই করে দিতে তারা সক্ষম হয়েছে। হিন্দুত্বকেই সামাজিক চালিকাশক্তি করে দিতে সক্ষম হয়েছে তারা। সামাজিক বিভাজনে বহুলাংশে সফল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ যখন শতবর্ষে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন তার মাথায় অসংখ্য কৃতিত্বের পালক। সে যা যা চেয়েছে সেটাই করতে সমর্থ হচ্ছে। যা যা এজেন্ডার স্বপ্ন ছিল হেডগেওয়ার, এস এস গোলওয়ালকরদের, সবই পূরণ হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ নিজেদের দুজন প্রধানমন্ত্রী করে ফেলেছে ভারতে। রাজ্যে রাজ্যে স্বয়ং সেবক মুখ্যমন্ত্রী। অথচ সিপিএম একবার মাত্র সুযোগ হাতের মধ্যে আসা সত্ত্বেও সেই সুযোগকে ইচ্ছাকৃতভাবে হারিয়েছে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দিয়ে।
কৃষক, শ্রমিক, সর্বহারা, মেহনতি মানুষকে একজোট করে একটি ক্লাস স্ট্রাগল করার স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম হয়েছিল কমিউনিস্টরা। অথচ নিজেরাই সেই পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে গেল। নিজেদের লক্ষ্যকে পাখির চোখ করে রাখতে ব্যর্থ হল তারা। আর তাই ক্রমেই সাধারণ দলে পরিণত হয়ে গেল। সঙ্ঘ কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরেনি।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ ছিল প্রধানত হিন্দিভাষী রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ তারা এই ১০০ বছর ধরে সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ হয়ে ধৈর্য ধরে আদিবাসী এলাকায়, অহিন্দিভাষী রাজ্যে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাব সম্পূর্ণ ক্যালকুলেটিভ ভঙ্গিতে বাড়িয়ে নিয়েছে। ধর্মীয় উন্মাদনা এবং হিন্দুত্ব আইডেন্টিটিকে তারা একমাত্র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তার সঙ্গে সুচারুভাবে মিশ্রিত করেছে ভারতীয়ত্ব তথা স্বদেশিকে। তাদের ফর্মুলা হয়েছে ভারতীয়ত্ব মানেই হিন্দুত্ব, হিন্দুত্ব মানেই উগ্র জাতীয়তাবাদ।
কমিউনিস্টরা বাংলা, ত্রিপুরা, বিহার, কেরলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছিল। অথচ বিগত কিছু বছর ধরে দেখা গেল, নিজেদের সেইসব দুর্গই ধরে থাকতে ব্যর্থ। বাংলা ও ত্রিপুরায় শুধু যে সরকার হাতছাড়া হয়েছে, তাই নয়। গুরুত্বও কমে গিয়েছে। সংগঠনও নগণ্য। ভোটব্যাঙ্ক তলানিতে। বিহারে কয়েকটি জনপদে আবদ্ধ বাম ভোটব্যাঙ্ক। তাও জয়ী হতে হয় লালুপ্রসাদ যাদব ও কংগ্রেসের জোটে গিয়ে।
জওহরলাল নেহরু যেহেতু নিজে সমাজতন্ত্র মনোভাবাপন্ন ছিলেন, তাই তিনি ভারত সরকার চালালেও তাঁর বামপন্থার প্রতি দৌর্বল্য ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় বামপন্থার প্রবেশ ঘটিয়েছিল। সেই প্রথা ছিল বহুকাল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ সেই প্রবণতাকেও ছুড়ে ফেলে দিতে উদ্যত। নিজেদের শিক্ষা নীতি আরোপ করেছে তারা। ইতিহাস বই অথবা ভারতীয় সমাজতত্ত্ব সিলেবাসকে আমূল বদলে দেওয়া চলছে। আজ পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আজ থেকে ২০ বছর পর যে প্রজন্ম ভারতের প্রধান ওয়ার্কফোর্স হবে, তাদের সিংহভাগই কিন্তু সঙ্ঘের শিক্ষায় শিক্ষিত একটি সমাজ হবে। এটাই সঙ্ঘের ব্লু প্রিন্ট ছিল।। সঙ্ঘ সমাজ গঠন করা।
সকলের জন্য চাকরি। সকলের জন্য শিক্ষা। শিক্ষা ও খাদ্য মানুষের জন্মগত অধিকার। ইত্যাদি স্লোগানকে কমিউনিস্টরা স্রেফ লিফলেট, ব্যানার, দেওয়াল এবং কণ্ঠেই রেখে দিয়েছে। এই শক্তিশালী স্লোগানকে বাস্তবায়িত করে কেরল, ত্রিপুরা, বাংলায় আদর্শ সরকার ও রাজ্য গঠন করতেই পারত তারা। করেনি। অথবা পারেনি। তাই তারা ব্যর্থ।
সঙ্ঘ কিন্তু ধীরে ধীরে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল গ্রাস করে নিতে সক্ষম হল। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবথেকে বেশি লড়াই করার কথা ছিল কমিউনিস্টদের। অথচ বাংলায় দেখা যাচ্ছে সঙ্ঘ তথা বিজেপির সমর্থক সবথেকে বেশি সিপিএম থেকে এসেছে। তাদের ভোটব্যাঙ্কেই বিজেপির উত্থান। কমিউনিস্টরা নিজেদের দলের মিছিলে হাঁটে, ব্রিগেডে যায়। অথচ ভোট দেয় বিজেপিকে। এটাই সঙ্ঘের সাফল্য। কমিউনিস্টদের ব্যর্থতা।
২০২৫ সালে দুই সংগঠনের শতবর্ষ। যদিও সিপিএম ১৯২৫ সালের সিপিআই জন্মকে স্বীকার করে না। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হল ১৯২০ সালের তাসখন্দে যে সিপিআই তৈরি হয়েছিল, সেটাই। তাও যদি হয়, প্রশ্ন হল, তাহলেও তো আদর্শস্থাপনের বয়স ১০৫ বছর হল। সেক্ষেত্রে সঙ্ঘের কাছে হেরে গেল কেন কমিউনিস্টরা?
কমিউনিস্টদের সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার স্বপ্নকে ফিকে করে দিয়ে আজকের ভারতে আগ্রাসী স্থান করে নিচ্ছে হিন্দু, হিন্দি, হিন্দুস্তান স্লোগান! ১০০ বছর পর কমিউনিস্টরা নিছক দর্শক!