ব্রহ্মচর্য্য
  • ২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তোমার শিক্ষকদের মুখে ব্রহ্মচর্য্যের কোনও উপদেশ তোমরা শুনিতে পাও না বলিয়া মনে করিও না যে, তাঁহারা ব্রহ্মচর্য্যের প্রতি শ্রদ্ধাবান্‌ নন। তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই মনে মনে আগ্রহ অনুভব করেন, যেন তাঁহাদের ছাত্রেরা ব্রহ্মচর্য্য-পরায়ণ হয়, বীর্য্যক্ষয়কর সকল অসৎ আচরণ হইতে নিজেদের দূরে রাখে, নিষ্পাপ দেহে তাদের যেন নির্ম্মল মন বিরাজ করে। কারণ, ইহা, হইলে ছাত্রদের স্মৃতি ও মেধা বাড়িবে, ফলে ছাত্ররা পড়াশুনায় ভাল হইবে। 

Advertisement

কোন্‌ শিক্ষক না চাহেন যে, তাঁহার ছাত্রগণ বিদ্যার্জ্জন করিয়া কৃতিত্বশালী হউক? কিন্তু মুখ ফুটিয়া তাঁহারা ব্রহ্মচর্য্য সম্পর্কে কোনও কথা কহেন না, কারণ, দেশে পরিস্থিতি অনুকূল নহে। হয়তো যাঁহার পুত্রকে সংযত ও সদাচারী করিবার জন্য তিনি মুখব্যাদান করিয়াছেন, তিনিই আসিয়া তাঁহার বাক্‌ রুদ্ধ করিয়া দিবেন। 
অভিভাবকদের মনে ব্রহ্মচর্য্যের প্রয়োজনীয়তা বোধ জাগে নাই, শিক্ষকেরা দূর হইতে দুঃসাহস করিবেন কেন? কিন্তু এজন্য কি অভিভাবক, কি শিক্ষক, কাহাকেও তোমরা দোষ দিও না। দোষ প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের, যাঁহারা সমাজের মধ্যে ছোট-বড়-মাঝারি গুরু হইয়া সমাজের অধিকাংশ মানবকে ধর্ম্মাধর্ম্ম ও কতর্ব্যাকর্ত্তব্যের জ্ঞান বিতরণের ভান করিতেছি। অভিভাবক ও শিক্ষক-সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্ব্বজনীন-ভাবে ব্রহ্মচর্য্য-পালনের উপকারিতা ও উপযোগিতা বুঝাইয়া দেওয়া আমাদেরই প্রথম কর্ত্তব্য ছিল। শিক্ষকেরা নিজেরা অন্ধতা বশতঃ, অজ্ঞতা বশতঃ, চিন্তার দৈন্য বশতঃ, যে বিষয় বুঝিবার কোনও চেষ্টাই করিতেছেন না, সেই বিষয় সকলকে বুঝাইবার দায়িত্ব যে আমাদের স্কন্ধে ন্যস্ত হইয়া রহিয়াছে। মেধাবী পুত্র পড়ায় খারাপ হইয়া গেলে পিতা-মাতারা পাড়ার অন্য ছেলেকে দোষ দেন, নিজের বাঁশের ঝাড়ে যে ঘুণ ধরিয়াছে, তাহা একবার অনুমান করিয়াও দেখিতে চাহেন না। 
ইহাঁদের সতর্কতার অভাব তোমাদের অনেকের পদস্খলনের জন্য দায়ী। কিন্তু কে কিসের জন্য বেশী দায়ী আর কম দায়ী, সেই বিচারের মধ্যে প্রবেশ না করিয়া তোমরা প্রতিজনে নিজ নিজ আত্ম-সম্মানবোধের অভাবকেই দায়ী কর। যাহার আত্ম-সম্মান-জ্ঞান আছে, সে কখনও পাপ-কার্য্যে আসক্ত হয় না। ভুল সে কখনও হয়তো করিতে পারে, কিন্তু তাহার আত্ম-মর্য্যাদা-বোধ তাহাকে দিয়া দ্রুত আত্মসংশোধন করাইয়া লয়। 
তোমাদের লক্ষ্য হউক নিখিল মানব-জাতির দুঃখ বিদূরণ। তোমাদিগকে কখন স্বদেশ-সাধনার বিপ্লব-মন্ত্রে দীক্ষা নেই, তখনও আমার লক্ষ্য আসমুদ্র-হিমাচল-সীমিত ক্ষুদ্র ভারতবর্ষ-টুকুই নহে, পরন্তু সমগ্র জগৎ। একদিন এই পৃথিবীর মত আরও কত কোটি কোটি পৃথিবী বৈজ্ঞানিকদের জ্ঞানের পরিধিতে আসিবে, তাহাদের সকল অধিবাসীদের লইয়া যে বিরাট বিশাল বিপুলায়তন মনুষ্য-জাতি, তাহাদেরই সকলের দুঃখ-মুক্তি-কামনাকে পুরোভা঩গে রাখিয়া তোমাদের বলিতেছি,— ‘‘তোমার ব্রহ্মচারী হও, বীর্য্যশালী হও, বলীয়ান্‌ হও।’’
যুক্তি দেখাইতেছ যে, বিবাহিত ব্যক্তি যেমন পরিমিত স্ত্রীসঙ্গে দুর্বল হয় না, ঠিক তেমন অবিবাহিত ব্যক্তি ও পরিমিত শুক্রক্ষয়ে দুর্ব্বল হয় না। যুক্তির দিক্‌ ঩দিয়া তোমার উক্তি নিশ্চয়ই ঠিক্‌। ঩কিন্তু বিবাহিত ব্যক্তি যাহাতে পরিমিত ভাবে চলে, তাহার সহায়তা অধিকাংশ সময়ে তাহার স্ত্রীই করিয়া থাকেন। পুরুষের অপরিমিত অসংযম স্ত্রীর পক্ষে ক্ষতিকর, ক্লেশকর বা অনেক সময়ে অরুচিকর বলিয়া বিবাহিত পুরুষ তাহার স্ত্রীর ব্যবহারেই সংযত থাকিতে বাধ্য হয়। 
স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের ‘প্রবুদ্ধ যৌবন’ থেকে