ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তাঁর বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের দেশের কারাগারে বন্দি করে রেখেই থামতে চাইছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং আরও চারটি দেশকে ‘উপযুক্ত শিক্ষা’ দিতে তিনি যে পিছপা হবেন না, ভেনেজুয়েলার ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজল্ভ’ অভিযান শেষ করে সেই হুংকার ছেড়েছেন তিনি। দেশগুলি হল মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কিউবা ও ইরান। ভারতকেও ‘কথা না শুনলে’ শুল্ক আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। এমন ঔদ্ধত্য সাম্প্রতিককালে আর কোনও দেশনায়ক দেখাননি। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে গত এক বছরে ভারত-পাকিস্তান সহ অন্তত আটটি যুদ্ধ বা সংঘর্ষ থামানোর দাবি করে নিজেকে নিজেই ‘বিশ্বশান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরে নোবেল পুরস্কারের দাবি তিনিই জানিয়েছেন বহুবার! কিন্তু মুখোশের আড়াল থেকে তাঁর আগ্রাসী দানবীয় চেহারাটা খুঁজে নিতে অসুবিধা হয়নি বিশ্ববাসীর। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনকে ধারাবাহিকভাবে সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে, কূটনৈতিক সহযোগিতা করে চলেছে ট্রাম্পের আমেরিকা। একইভাবে প্যালেস্তাইনের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের ধ্বংসলীলা চালাতে সবরকম সাহায্য করেছে আমেরিকা। এবার তাঁর শিকারির চোখ গিয়ে পড়েছে লাতিন আমেরিকার উপর। দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। ট্রাম্পও কার্যত নানা অজুহাত খাড়া করে যাবতীয় আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের দখল নেওয়ার উদগ্র বাসনায় মেতেছেন। ভেনেজুয়েলার খনিজ তেলের ভাণ্ডারের দখল নেওয়া তাঁর লক্ষ্য হলেও সে দেশের প্রেসিডেন্টকে বন্দি করে রাখার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে মাদক ব্যবসাকে। একইভাবে শরণার্থী অনুপ্রবেশের কারণ দেখিয়ে তিনি ‘ফল ভুগতে হবে’ বলে মেক্সিকোকে বার্তা দিয়েছেন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টকেও ‘মাদক সম্রাট’ আখ্যা দিয়ে ‘শিক্ষা’ দিতে চান তিনি! কিউবায় নাকি প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তাই সে দেশের মানুষকে ‘মুক্তি’ দিতে প্রাণ কেঁদে উঠেছে ট্রাম্পের। তাই ‘ফল ভোগ করার’ বার্তা দিয়ে রেখেছেন। ইরানে নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে সে দেশের শাসকগোষ্ঠী, তা দেখে আমেরিকা ‘চুপ করে বসে থাকবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে এই আগ্রাসনের মানসিকতার কারণে ঘরে-বাইরে সমালোচনার ঝড় উঠলেও তিনি থামতে নারাজ! তাই ছি ছি-ক্কার হচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।
ইতিহাসে আমেরিকার ‘দাদাগিরির’ নজির কম নয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এই দেশের কথামতো না চললে বা বশ্যতা স্বীকার না করলে যে ভালোরকম মূল্য চোকাতে হতে পারে— তা অনেকেরই জানা। কিন্তু মাত্র ৩০ মিনিট অপারেশন চালিয়ে যেভাবে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় মোড়া বাসভবনে ঢুকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়া হয়েছে— তার নজির নেই। কিন্তু অনায়াসে সেই কাজটাই করে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, নিউইয়র্কের ফেডেরাল আদালতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মাদক পাচার অভিযোগের বিচার হবে। কিন্তু বিচারের নামে কোনও দেশের প্রেসিডেন্টকে কি এভাবে তাঁর বাড়ি থেকে অন্য দেশে কেউ তুলে আনতে পারে? এই আগ্রাসী প্রবণতা আগামী দিনের জন্য আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে বুঝেই দুনিয়াজুড়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সঙ্গত কারণেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কার্যত গোটা আমেরিকাই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। বহু মার্কিন নাগরিক দাবি তুলেছেন ‘লক হিম’। গত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে পরাজিত প্রার্থী কমলা হ্যারিস থেকে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, এই কাজ বেআইনি। ট্রাম্পের এ হেন আচরণের নিন্দা করে সরব হয়েছেন রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া সহ একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। প্রতিবাদে কার্যত গোটা ভেনেজুয়েলা দিন-রাত পথে কাটাচ্ছে। সে দেশের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিয়ে ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, তিনি শপথ নিলেও দেশের মানুষ এখনও মাদুরোকেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মনে করেন। তবে অনেকের ধারণা, ডেলসিকে শেষপর্যন্ত আমেরিকার চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে হবে।
ভেনেজুয়েলার ঘটনা নিয়ে ভারতের অবস্থান কী? তথ্যবিজ্ঞ মহলের মতে, এই মুহূর্তে ৫০ শতাংশ শুল্কের কাঁটা বিঁধে রয়েছে ভারতের গলায়। কথা না শুনলে আরও শুল্ক বাড়াবেন বলে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বেপরোয়া ট্রাম্প। পাশাপাশি ভারতকে চাপে রাখতে ‘চরম শত্রু’ পাকিস্তানের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রেখে চলেছে মার্কিন প্রশাসন। এই অবস্থায় ট্রাম্পকে সরাসরি চটানো কোনওভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করছে না নয়াদিল্লি। তাই ভেনেজুয়েলার ঘটনার দু’দিন পরেও ‘দোস্ত’ ট্রাম্পের এই কীর্তিকলাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চুপ। বিদেশমন্ত্রকের তরফে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেখানেও আমেরিকার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয়নি। কৌশলী সেই বার্তায় ‘শান্তিপূর্ণ পথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান’-এর কথা বলে নিছক ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করা হয়েছে। এমনিতে গত কয়েকবছরে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতে তেল আমদানি কমেছে। হ্রাস পেয়েছে বাণিজ্যিক কার্যকলাপ। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অতএব মোদির ‘বন্ধু’ ট্রাম্পের নির্লজ্জ দাদাগিরি চললেও আপাতত নিরাপদ দূরত্বে বসে ‘দর্শক’ হয়ে থাকতে চায় ভারত।