Bartaman Logo
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

শুধু এফিডেভিট করলেই নাম বদলানো যায়?

সুকুমার রায় সেই কবেই লিখে গিয়েছেন, গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। বঙ্গবাসী সেই গোঁফের জায়গায় ‘নাম’ করে নিয়েছে। যতই শেক্সপিয়র বলে যান না কেন, নামে কী আসে যায়?

শুধু এফিডেভিট করলেই নাম বদলানো যায়?
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারতীয় আইনে নাম-পদবি বদলের নিয়ম কী? পরামর্শে আইনজীবী অয়না বন্দ্যোপাধ্যায়

Advertisement

সুকুমার রায় সেই কবেই লিখে গিয়েছেন, গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। বঙ্গবাসী সেই গোঁফের জায়গায় ‘নাম’ করে নিয়েছে। যতই শেক্সপিয়র বলে যান না কেন, নামে কী আসে যায়? আসলে নামেই অনেক কিছু যায় আসে। নাম মানুষের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিচায়ক। কিন্তু অনেকেরই নিজের নাম না-পসন্দ। তাই নাম বদলে ফেলতে চান। কারও আবার বিয়ের পরে নাম পরিবর্তন হয়। কারও নামের বানান ভুল থাকে, সেটি পরবর্তীকালে পরিবর্তন করতে চান। কেউ আবার পদবি ছেড়ে শুধু নামে পরিচিত হতে চান অথবা পদবির বানান বদলাতে চান। কারও ক্ষেত্রে ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণেও নাম বদলাতে হয়। তবে কারণ যাই হোক, চাইলেই সরকারি নথিতে নাম বদলে যায় না। এর জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

 কী কী আইনি ধাপ
নাম বদলে এফিডেভিট গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে সব ক্ষেত্রে এটিই শেষ ধাপ নয়। কোন নথিতে নাম বদলাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রমাণ চাইছেন, তার উপর পরবর্তী প্রক্রিয়া নির্ভর করে। বেশ কিছু ধাপ পেরিয়ে তবেই নাম বদল করা যায়। 

 কেন নাম বদলাবেন?
নাম পরিবর্তনের আগে তার কারণটি পরিষ্কার করা জরুরি। কেউ সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন করতে পারেন, কেউ শুধু পদবি বদলাতে পারেন, আবার কেউ নামের বানান বা নামের অংশ পরিবর্তন করতে পারেন। বিবাহের পরে পদবি পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে আলাদা প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়। আবার বিবাহবিচ্ছেদ বা পুনর্বিবাহের পরে আগের নাম বা পদবি গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নথি গুরুত্বপূর্ণ।

 এফিডেভিট আসলে কী?
এফিডেভিট একটি আইনি পত্র যা আদতে একটি লিখিত ঘোষণা। যিনি নাম বা পদবি পরিবর্তন করছেন, এতে তাঁর পুরানো নাম, নতুন নাম, পিতা/স্বামী বা অভিভাবকের পরিচয়, ঠিকানা এবং পুরানো ও নতুন নামের ব্যক্তি যে একই ব্যক্তি— এই মর্মে ঘোষণা লেখার আকারে থাকে। অর্থাৎ এফিডেভিটের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি আইনিভাবে ঘোষণা করেন যে তিনি পুরানো নামটি পরিবর্তন করে নতুন নাম গ্রহণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে নতুন নামেই পরিচিত হতে চান। এর সঙ্গে তিনি জানান যে পুরানো নাম, নতুন নাম দুই-ই এক ও অভিন্ন ব্যক্তির পরিচয়।
তবে এফিডেভিট করলাম মানেই নিজে থেকে সব সরকারি রেকর্ডে নাম পরিবর্তন হয়ে গেল এমন হয় না। আর এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। অনেকে মনে করেন, নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট করিয়ে নিলেই আধার, পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড, শিক্ষাগত শংসাপত্র, ব্যাংকের নথি— সব জায়গায় নাম পরিবর্তন করা যাবে। বিষয়টা তেমন নয়। এফিডেভিট সবসময়ই প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে করতে হবে। এফিডেভিটের পর যদি নাম বা পদবি বা ধর্ম সম্পূর্ণ বদলে যায়, তাহলে প্রথম শ্রেণির দৈনিকের ক্লাসিফায়েড বিভাগে নাম-পদবি পরিবর্তন সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনও দিতে হবে। সরকারি নানা দপ্তরের নিজস্ব নিয়মও থাকে। কোথাও এফিডেভিট গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কোথাও আবার গেজেট নোটিফিকেশনের প্রয়োজন প঩ড়ে। আবার কোথাও বিয়ের শংসাপত্র, ডিভোর্স ডিক্রি বা অন্য নির্দিষ্ট নথি চাওয়া হয়।

 গেজেট নোটিফিকেশন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশনা দপ্তরের বর্তমান নির্দেশিকায় স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্রে নাম পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথাও রয়েছে। অর্থাৎ নাম পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ঘোষণা নয়; নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তা সরকারি ভাবে প্রকাশ ও নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও যেতে পারে।

 সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন কেন?
নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়ার উদ্দেশ্য হল বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা। একজন ব্যক্তি পুরানো নাম থেকে নতুন নাম গ্রহণ করছেন— এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশের ধরন, ভাষা এবং পরবর্তী নথিপত্রের প্রয়োজনীয়তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী পালন করতে হবে।

  নাম বদলানোর পর আধারে কী হবে?
নাম পরিবর্তনের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল— আধারে নতুন নাম কীভাবে উঠবে? সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নাম আপডেটের জন্য বৈধ প্রমাণপত্র প্রয়োজন। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তনের সীমা অতিক্রম করলে গেজেট নোটিফিকেশন বা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন সহ পুরানো নামের পরিচয়পত্র নিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। নাম পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিগুলিও এক এক করে আপডেট করে নেওয়া জরুরি। পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড, ব্যাংক, সব জায়গায় আলাদা করে রেকর্ড আপডেট করতে হবে। 

  বিয়ের পরে পদবি বদলানোর নিয়ম
বিয়ের পরে স্ত্রী স্বামীর পদবি গ্রহণ করতে চাইলে, বিষয়টি সাধারণ নাম পরিবর্তনের থেকে কিছুটা আলাদা। এক্ষেত্রে বিবাহের শংসাপত্র অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজ করে। আবার কোনো মহিলা বিয়ের পরে হয়তো পদবি বদলেছিলেন। তিনি ফের তার পদবিতে ফিরতে চাইলে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি, বিবাহের নথি বা অন্য সমর্থনকারী নথিপত্র প্রয়োজন হতে পারে। তাই বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ বা পুনর্বিবাহের কারণে নাম পরিবর্তন হলে আগে কারণ অনুযায়ী সঠিক নথির তালিকা জেনে নেওয়া উচিত।

 ভুল নামের বানান সংশোধন আর সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন এক নয়
আর একটি বিষয় নিয়ে মানুষ প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। নামের বানান ভুল হলে, তা পরিবর্তন করলে সেটিকে কি ‘নেম চেঞ্জ’ বলা হবে? আদতে তা বলা হয় না। যেমন: যদি ‘Rina’ কোনো নথিতে ভুল করে ‘Reena’ হয়ে যায় এবং ব্যক্তি আসলে নিজের নাম পরিবর্তন করতে না চান, তাহলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে শুধুই সংশোধনের বিষয় হতে পারে। কেউ যদি পুরানো নাম সম্পূর্ণ বদলে নতুন নাম গ্রহণ করেন, তখন সেটি ‘নেম চেঞ্জ’ বলে গণ্য করা হবে। দু’টি বিষয়কে এক করে দেখলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

  নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কী কী নথি হাতে রাখবেন?
প্রক্রিয়া শুরু করার আগে পুরানো নামের পরিচয়পত্র, ঠিকানার প্রমাণ, ছবি এবং প্রয়োজনীয় সমর্থনযোগ্য নথি প্রস্তুত রাখা ভালো। তবে কোন নথি লাগবে তা আপনার পরিস্থিতি এবং কোন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করছেন তার উপর নির্ভর করবে। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও অনেকেই পুরানো নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, প্যান, আধার বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি রেখে দেন। এতে ভবিষ্যতে সম্পত্তি, চাকরি, পেনশন, ব্যাংকিং, ভিসা বা অন্য কোনো আইনি কাজে পুরানো ও নতুন নামের মধ্যে সম্পর্ক প্রমাণ করতে সমস্যা হতে পারে। তাই নাম পরিবর্তনের পরে সব গুরুত্বপূর্ণ নথিতে একই নাম ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনীয় আপডেট সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত জরুরি।

আইনজীবীর পরামর্শ
নাম মানুষের পরিচয়, আর সেই পরিচয় যখন সরকারি নথির সঙ্গে যুক্ত, তখন সামান্য অসতর্কতাও ভবিষ্যতে বড়ো সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই শুধু তৈরি করা একটি এফিডেভিট নিয়ে নাম পরিবর্তনের কাজ শুরু করবেন না। বরং আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে প্রথমেই ঠিক করে নিন আপনার ক্ষেত্রে এফিডেভিট যথেষ্ট, নাকি আরও কিছু বাড়তি পদক্ষেপ করতে হবে। নাম পরিবর্তনের পরে কোন কোন নথি আপডেট করতে হবে, তার একটি তালিকা তৈরি করুন। পুরানো ও নতুন নামের মধ্যে একই ব্যক্তির পরিচয় স্পষ্ট রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নথিগুলি নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।

মনীষা মুখোপাধ্যায় 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ