Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশন নীতীশের গদি বাঁচাতে পারবে?

বিহার বিজেপি’র অ্যাসিড টেস্ট! গতবারই কানঘেঁষে সরকার গড়েছিলেন নীতীশ কুমার। তারপরও তাঁর পুতুলনাচ কম দেখেনি বিহারবাসী।

নির্বাচন কমিশন নীতীশের গদি বাঁচাতে পারবে?
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: বিহার বিজেপি’র অ্যাসিড টেস্ট! গতবারই কানঘেঁষে সরকার গড়েছিলেন নীতীশ কুমার। তারপরও তাঁর পুতুলনাচ কম দেখেনি বিহারবাসী। কখনও বিজেপি’র কোলে, কখনও লালু পুত্রর দরবারে। তাঁর জিনে পাল্টিবাজি সুপ্ত আজন্ম। এই খেলায় তিনিই নায়ক আবার তিনিই খানসামা! তবে এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ। যদি ইন্ডিয়া জোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে পারে সেক্ষেত্রে দু’দশকের নীতীশরাজ (পড়ুন গিরগিটিরাজ!) খতম হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। নীতীশ কুমারও তা বিলক্ষণ জানেন বলেই প্রতিদিন নতুন নতুন ডোল দিচ্ছেন আর মোদির চরণে আরও বেশি বেশি করে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন। মোদিজিরা এই পরিস্থিতিতে যা করতে অভ্যস্ত সেই ফর্মুলা মেনে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং ‘বশংবদ’ নির্বাচন কমিশনকে পুরোদমে নামিয়ে দিয়েছেন। তবু এতকিছুর পরও বিহার এখনও বিশেষ কোনও সুখবর বয়ে আনেনি গেরুয়া শিবিরে। উল্টে নানা প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটি সর্বভারতীয় সমীক্ষক গোষ্ঠী যারা সাধারণত বিজেপি’র দিকে ঝুঁকেই পূর্বাভাস দিয়ে থাকে, তারা পর্যন্ত পুজোর মধ্যেই বিহারে মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে লালুপুত্র তেজস্বীকে পোড়খাওয়া নীতীশ কুমারের চেয়ে কয়েক যোজন এগিয়ে রেখেছে। তেজস্বীর পক্ষে বিহারের ৩৫.৫ শতাংশ মানুষ। আর নীতীশের পক্ষে মাত্র ১৬ শতাংশ। অর্ধেকেরও কম! এখানেই শেষ নয়, বিহারের ছোট আঞ্চলিক দল জনসুরাজ পার্টির প্রধান ভোট-পণ্ডিত প্রশান্ত কিশোরের তুলনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সির দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে নীতীশ। প্রশান্ত কিশোরকে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চান ২৩ শতাংশ বিহারবাসী। অর্থাৎ জনসমর্থনের নিরিখে পিকে’র চেয়েও ৭ শতাংশ পিছিয়ে আছেন লালু পরবর্তী বিহারের মসিহা কুর্মি সম্রাট নীতীশ।

Advertisement

সম্প্রতি রাহুল গান্ধীর ভোটার অধিকার যাত্রাতে মানুষের ঢল ও সমর্থন দেখে দ্বিগুণ উৎসাহ ছড়িয়ে পড়েছে বিরোধী শিবিরে। কোনও বিধানসভা ভোটের আগে রাহুল গান্ধীর ১৬দিন ধরে এত বড় মাপের কর্মসূচি খুব কম দেখা গিয়েছে। যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই নীতীশ কুমারের দু’দশকের সরকার ভোটার অধিকার যাত্রার অভিঘাতে টলমল। উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিজেপি-আরএসএস বাংলার মতোই বিহারেও দলের সব গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য মুখের সন্ধান পায়নি এখনও। একদা লালুর সৈনিক শকুনি চৌধুরীর পুত্র সম্রাট বিজেপির গড় সামলাচ্ছেন বটে, তবে ক্ষমতা গেলে তিনিও যে তেজস্বী  শিবিরে চলে যাবেন না তার গ্যারান্টি কোথায়? পৃথিবীর সব দলবদলুই আখেরে সুযোগসন্ধানী, আদর্শের কোনও দাম নেই তাঁদের কাছে! অগত্যা মোদি আর অমিত শাহের বারবার যাওয়া এবং কোটি কোটি টাকা খরচে প্রচারের 
কার্পেট বোম্বিং করে দিল্লি ফিরে যাওয়াই ‘ট্র্যাজিক’ ভবিতব্য। আজ যখন এই লেখা লিখছি মোদিজি স্বভাবসিদ্ধভঙ্গিতে ৬২ হাজার কোটির ‘সওগাত’ নিয়ে ভার্চুয়ালি হাজির বিহারে। দু’দিন বাদে এই একই নাটক মঞ্চস্থ হবে বাংলাতেও!
গত লোকসভা ভোটে বিহারে ফল মোটেই ভালো হয়নি ক্ষমতাসীন দলের। ২০১৯ সালে যেখানে ৩৯ আসনে জয়ী হয়েছিল বিজেপি জোট। চব্বিশে তা কমে দাঁড়ায় ৩০। রাজপুত, কুশওয়া সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটারের সমর্থন মেলেনি। হাতছাড়া হয়েছে মগধ, আরা, সাসারাম, বক্সার, জেহানাবাদ, ঔরঙ্গাবাদ। মানুষ ঢেলে সমর্থন দিয়েছে আরজেডিকে। কুশওয়া এবং রাজপুত ভোটের বিভাজনের ফলে মোদি মন্ত্রিসভার জনপ্রিয় মুখ আর কে সিং পর্যন্ত পরাজিত হন। তার আগে ২০২০ সালের বিধানসভা ভোটেও এই অঞ্চলের ২২টি আসনের ২০টিতেই লালুর দল জয়ী হয়। বাকি দু’টি জেতে বিজেপি। নীতীশের দল এবারও খুব একটা সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। শুধু সাসারাম, বক্সার, আরা নয়, এই একই চিত্র গোটা বিহারে সংক্রমিত। সেই কারণেই নরেন্দ্র মোদি তাঁর শেষ অস্ত্র নির্বাচন কমিশনকে ভীমরবে নামিয়ে দিয়েছেন বিহার বাঁচাতে। আর কমিশনের এই একচোখামির কারণেই রাজ্যের ৮০ শতাংশ ভোটার নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাসই করে না। এই বক্তব্যটা অবশ্য আমার নয়, বিহারের বিরোধী জোটের এমপি মনোজ শাহের। 
পুজোর মধ্যেই বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছেন মহামান্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, অমিত শাহের বিশ্বস্ত আমলা জ্ঞানেশ কুমার। বিহারে এসআইআরের খসড়া তালিকায় প্রথমে ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল। তা নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে পরে আরও ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার নাম বাদ পড়েছে। অর্থাৎ বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ৬৮ লক্ষ ৬৬ হাজার। এক বছরে এত মানুষ বিহার ছেড়েছে কিংবা মারা গিয়েছে, এই পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য? নাকি ডাল মে কুছ নয়, পুরোটাই কালা? এখানেই শেষ নয়, এরসঙ্গে সাড়ে ২১ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম যুক্ত হওয়ায় চোখ কপালে বিরোধীদের।
রহস্যটা এখানেই। তেজস্বীরা বলছে, নির্বাচন কমিশন নিজেই বলেছিল সাড়ে ১৬ লক্ষ নতুন ভোটারের আবেদন জমা পড়েছে। তাহলে ৫ লক্ষ নতুন ভোটার উড়ে এসে জুড়ে বসল কোন চমৎকারে! বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে এতটা বেশি কেন? মহিলারা কি বেশি বীতশ্রদ্ধ নীতীশ সরকারের উপর? তাই তাদের নাম কাটার এমন প্রতিযোগিতা! শেষে গত দুর্গাঅষ্টমীর দিন যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ ভোটার থেকে কমে রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪২ লক্ষ। সবমিলিয়ে নির্বাচনের মুখে ভোটার তালিকায় ফারাক প্রায় ৯০ লক্ষের। এই বাদ পড়া ও নতুন করে আসা মিলিয়ে ৯০ লক্ষ মানুষই বিহারের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। বিধানসভা ভোটে ৪-৫ শতাংশ স্যুইংই যেখানে ব্যবধান গড়ে দেয়, সেখানে এই ১২-১৩ শতাংশ ভোট তো নির্ণায়ক ভূমিকা নেবেই! বিজেপির নির্দেশে নীতীশের ভরাডুবি রুখতে মরিয়া কমিশন, বলাটা কেন বাড়াবাড়ি হবে!
দিল্লি ও মহারাষ্ট্র ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে গত এক বছর ধরে অভিযোগের বন্যা বইছে। বিশেষত মহারাষ্ট্রে লোকসভা নির্বাচনে যেখানে বিরোধীরা ভালো লড়াই দেয়, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিধানসভায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা শুধু রহস্যজনকই নয়, রীতিমতো উদ্বেগেরও। মাত্র চার পাঁচ মাসে ভোটারের সমর্থনের গ্রাফ এতটা বদলে যেতে পারে? দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের ঠিক আগের ৬ মাসে নতুন ভোটারের নাম তালিকায় যুক্ত হওয়া নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উঠেছে। মহারাষ্ট্রে বিধানসভা ভোটের আগে রহস্যজনকভাবে ৪০ লক্ষ নতুন ভোটার সংযুক্ত করা হয়েছিল মাত্র ৭ মাসে। দিল্লিতেও স্রোতের মতো ভোটার বেড়েছে। অথচ বিহারে ৪২ লক্ষ ভোটার কমে গেল। নির্বাচন কমিশন কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে তালিকা মেনে দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে নির্বাচন হয়েছে তা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নির্ভুল ছিল? বেছে বেছে বিরোধীদের কোণঠাসা করতে এই নাটক কেন? আগের কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে এমন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠেনি। এমন সন্দেহজনক আচরণের পর একটি স্বয়ংশাসিত সাংবিধানিক অফিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। স্বভাবতই চব্বিশ সালে বিহারে বিজেপি জোটের আসন সংখ্যা ৩৯ থেকে কমে ৩০ হয়ে যাওয়া দলের কাছে বড় ধাক্কা ছিল। ধাক্কা ছিল উত্তর প্রদেশে আসন সংখ্যা কমে যাওয়াও। তাই বিহারের ভোট বিজেপি’র কাছে বিরাট পরীক্ষা। যদি নীতীশ কুমারের রাজত্ব খতম হয়, তাহলে শুধু ইন্ডিয়া জোটই সংঘবদ্ধ হবে তাই নয়, বাংলা, তামিলনাড়ু, কেরল, অসম ও পুদুচেরির ভোটেও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। মোদিজির ভক্তরা তা বিলক্ষণ জানেন। আর জানেন বলেই এতটা মরিয়া।
দেশজুড়ে বিজেপি’র অবস্থা মোটেও ভালো নয়। সেনার বীরত্ব আর শৌর্যের রথে চড়ে আগ্রাসী মার্কেটিং ব্যক্তিসর্বস্ব সরকারের ভাবমূর্তিকে কতদিন ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারবে তা কেউ বলতে পারে না! কিন্তু ঘুণ ধরে গিয়েছে! দলের ভিতরও একই অবস্থা। ৭৫ পেরিয়ে অন্যদের যখন ঠাঁই হয় মার্গদর্শক মণ্ডলীতে, তখন একজনই সমস্ত রীতিনীতি ভেঙে দেশের সবচেয়ে পরাক্রমশালীর কুর্সিতে। মোদি-অমিত শাহ অক্ষ এবং আরএসএসের আশীর্বাদ কতদিন সরলরেখায় বইবে কে জানে! আজ সবাই চুপ করে আছে, কিন্তু চিরদিন কাউকে চুপ করিয়ে রাখা কি সম্ভব! গণতন্ত্রে মানুষই শেষ কথা বলবে। আর বিজেপি’র মতো জাতীয় গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় শেষ কথা বলবে দলের অনুশাসন ও শৃঙ্খলা। নরেন্দ্র মোদি কিংবা অমিত শাহও তার বাইরে নন। এই কথাটা না মানলে কংগ্রেসের মতোই বিজেপি’ও একদিন একতান্ত্রিকতার নাগপাশে বন্দি হয়ে যাবে। সেই দুর্দিনে দলকে টেনে তোলার লোক মিলবে না। 
বিহারে নীতীশ কুমার গদিচ্যুত হলে বাংলাতেও বিজেপি’র ভরাডুবি আরও নিশ্চিত হবে। বলাই বাহুল্য মোদিজি যতই চেষ্টা করুন না কেন, 
হিন্দি বলয়ের নির্দিষ্ট কয়েকটি রাজ্য ছাড়া গেরুয়া শিবিরের মুখ নেই। অসমে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও একজন দলবদলু। এ রাজ্যেও দলবদলুরা অধিকাংশই তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে আসা। ভগবানও জানেন বিজেপি গতবারের তুলনায় এবার বাংলায় অন্তত ২৫- ৩০টি আসন কম পাবে। একুশের মতো আবার প্রমাণ হবে দলবদলুদের দিয়ে দল ও সংগঠনকে শক্তিশালী করা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ