হিমি মিত্র রায়: আমি শ্রুতি রায়, স্কুলে পড়াই। ময়নাগুড়ির কাছে সানুগ্ৰামে আমার স্কুল। এখানে একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া নিয়ে থাকি, একাই। আমার ফ্ল্যাট থেকে স্কুলের দূরত্ব বেশি না, তিন কিলোমিটার মতো। দোতলার ফ্ল্যাটে থাকি। পাশের ফ্ল্যাটে এক বৃদ্ধ দম্পতি থাকেন। আমি তাঁদের মাসিমা-মেসোমশাই বলি। ওঁরাও আমাকে স্নেহ করেন মেয়ের মতো। এটা সেটা রান্না করলে মাঝে মাঝেই আমাকে দেন। আমিও ওঁদের জন্য যতটা পারি করার চেষ্টা করি। ওঁদের একমাত্র ছেলে কর্মসূত্রে পরিবার নিয়ে বাইরে থাকেন। তবে শুনেছি, ওঁদের ছেলে নাকি এরই মধ্যে আসবে কিছুদিনের জন্য। ভালোই হবে। মাসিমা-মেসোমশাই বড্ড মিস করেন ছেলে-বউমা আর নাতিকে। অপেক্ষা করে বসে আছেন কবে আসবে।
সময়টা বর্ষাকাল, এদিককার বর্ষা মানে ভয়ানক অবস্থা হয়। একবার বৃষ্টি শুরু হলে সাতদিনের আগে থামে না, একেবারে পচিয়ে ছাড়ে। চারদিক জলে জলাকার, আর অহরহ বিদ্যুৎ চমকানো, মেঘের গর্জন এসব। মনে হয় আস্ত একটা হরর শো চলছে। লোডশেডিংয়ের কথা আর নাই বললাম।
সেদিনও বজ্রপাত আর বৃষ্টির তীব্রতা মারাত্মক। সন্ধে থেকে তেমনই লোডশেডিং শুরু হয়েছে। কাচের উপর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকের তীব্রতায় দু’কান চেপে বসে পড়ছি। বৃষ্টির শব্দটাও যেন মারাত্মক। বাপ রে বাপ, কী ভয়ঙ্কর অবস্থা। কোনওরকম একটা ঘরে জবুথবুু হয়ে বসে রয়েছি। ঠিক জবুথবু নয়, বিছানার মধ্যে পরীক্ষার খাতা ছড়িয়ে বসে আছি। ল্যাম্পটা আর কতক্ষণ জ্বলবে কে জানে, চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না।
ক্লাস এইটের চন্দ্রিমা অধিকারীর খাতাটার যেই না প্রথম পাতাটা দেখব, অমনি কলিং বেল বেজে উঠল। কারেন্ট নেই। ব্যাটারি আছে বলে বেলটা বাজল।
চোখ তুলে তাকালাম। দেওয়াল ঘড়িতে অন্ধকার, মোবাইলে দেখলাম রাত দশটা। অন্ধকার আর বৃষ্টির জন্য মনে হচ্ছে রাত দুটো বাজে। এই সময় কে?
ওপাশে কোনও সাড়া নেই। বৃষ্টি আর দুর্যোগে কেউ সাড়া দিলেও শোনা যাচ্ছে না। এখন কে আসবে, ফ্ল্যাটের কেউ? নাহ, মাসিমা-মেসোমশাই আসেন না। ফোন করলে আমিই যাই ওদের ঘরে। তাও যদি কোনও ইমারজেন্সি হয় এটা ভেবে দরজা খুললাম, তবে কে কে জিজ্ঞেস করার অন্তত মিনিট তিনেক পর।
কাউকে দেখতে পেলাম না। এদিক-ওদিক তাকালাম, অন্ধকার প্যাসেজ, মাসিমাদের দরজাও বন্ধ। অন্ধকার। স্বাভাবিক, ওরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন। বয়স্ক মানুষ।
আবার এসে খাটে বসলাম। কে হতে পারে এই দুর্যোগে! ভাবতে ভাবতে খাতাটা সোজা করে প্রথম অঙ্কের উত্তর দেখে পরের অঙ্ক দেখছি, অমনি আবার কলিং বেল। চমকে উঠলাম।
—কে?
কোনও উত্তর নেই।
দরজা খুলে ফেললাম। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল প্রথমে। দেখি সিঁড়ির কাছে দুটো জ্বলন্ত চোখ আমার দিকেই তাকানো। ভয় পেতে গিয়েও সামলে নিলাম নিজেকে। ওপরের ফ্ল্যাটে এক মহিলা থাকে। ওর মেয়ে বেড়াল পোষে। ওর বেড়ালটাই ঘুরে বেড়ায় এখানে। তবে রাতবিরেতে এরকম দেখলে হঠাৎ তো ভয় লাগতেই পারে। কিন্তু কলিং বেলটা বাজাল কে? এত রাতে ইয়ার্কি মারছে কেন এভাবে?
আমি যথেষ্ট সাহসী, অত ভয় নেই। কিন্তু এসব কী হচ্ছে! দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। যেখানে থাকি তা শহর থেকে একটু বাইরে। আসলে স্কুলটার কাছাকাছি থাকতে গেলে শহরের মাঝে থাকলে চলত না। তাই এখানে ফ্ল্যাট নিয়েছি। ক’দিন আগে দুটো ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল এদিকে। তারপর সে ডাকাতের গ্যাং অবশ্য ধরা পড়ে যায়। তবে এসব উল্টোপাল্টা চিন্তা কেন আসছে আমার!
এদিকে বৃষ্টির কোনও বিরাম নেই, কারেন্ট সেই যে গেছে আসার নাম করছে না। ভাবতে ভাবতেই আবার কলিং বেল।
এবার আমার অস্বস্তি হচ্ছে, দরজার দিকে পিঠ করে দাঁড়ানো আমি। অঝোর ধারায় বৃষ্টি, তার শব্দ শুনে যাচ্ছি। কী করব একদম মাথায় আসছে না। দরজা খুলব না ঠিক করলাম। ঘরের মধ্যে মোবাইলের হালকা আলোয় ফাঁকা চেয়ার টেবিলগুলো যেন আমার দিকেই ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে।
মাকে ফোন করব? নাহ থাক, শুধু শুধু চিন্তা করবে আর বলতে থাকবে এই জন্যই বলেছিলাম পূর্ণিমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যা, সারাদিন বাড়িতে থাকবে, তোর অসুবিধা হবে না।
কিন্তু সেগুলো সব ঠিক আছে। এখন কে কলিং বেল বাজাচ্ছে? বাজালেও দেখা দিচ্ছে না কেন? কী মতলব তার?
বিশাল জোরে একটা বাজ পড়ল। মনে হল খুব সামনে কোথাও। অদূরেই বন্দিনীর মাঠ বলে একটা জায়গা আছে। কেন ওই নামটা বন্দিনী জানি না, কে বন্দি ছিল তাও না। তবে জায়গাটার নাম আরও মনে আছে এই কারণে যে লাগোয়া মাসকলাই বাড়ি শ্মশান। সেই শ্মশান নাকি অনেক ঘটনা দুর্ঘটনার সাক্ষী। সে যাই হোক, আমার এই সমস্ত কথা এখন মনে হওয়ার কারণ কী! আমি তো ভূতে বিশ্বাস করতাম না! মানে করি না আর কী।
দু’কান চেপে সরে গেলাম। কাঠের দরজাটা অন্ধকারে মিশে রয়েছে, তাও ওদিকেই তাকিয়ে আছি, চোখ সরছে না। এরই মধ্যে আবার কলিং বেল।
ভেতর থেকেই জোরে চিৎকার করলাম, কে? কে? উত্তর দিচ্ছেন না কেন?
কোনওরকমে এগিয়ে টেবিলটার কাছে গেলাম। হাতড়ে হাতড়ে জলের বোতলটা নিয়ে গলায় ঢাললাম ঢক ঢক করে। কোনও উত্তর নেই কেন? কে এমন করছে!
হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ হল বাইরে, মনে হচ্ছে ঘ্যাষঘ্যাষে গলায় কেউ কোনও শব্দ করছে।
আমার শরীরের ভেতর একটা ঠান্ডা সর্পিল বস্তুর নাড়াচাড়া টের পেলাম, ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত কিলবিল করে চলে গেল।
বৃষ্টির তীব্রতা, কলিং বেলের শব্দ, ঘ্যাষঘ্যাষে আওয়াজ, সবমিলিয়ে আমার এবার ভয় করছে।
দরজায় কেউ আওয়াজ করল, ঠক ঠক ঠক! তিনবার। আবার চুপ কিছুক্ষণ। মনে হল এবার কেউ নখ দিয়ে আঁচড়ে দিল।
না আর নয়, আমি এবার পুলিশকে ফোন করব। অনেক হয়েছে। ভেবেই মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি নেটওয়ার্ক নেই, উফ! অসহ্য! ভালো লাগছে না! দৌড়ে বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় উবু হয়ে বসে পড়লাম। যা হয় হোক, আমি সকাল না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে নড়ব না।
ওই ঘর থেকে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে দরজায় আঁচড়ের শব্দ আসছে। কখনও নাকি সুরে কান্না, মাঝে মাঝে কলিং বেল। অন্ততপক্ষে আরও আধ ঘণ্টা পর সব চুপ হল অবশেষে।
প্রায় সারা রাত জেগে কাটিয়ে বসেছিলাম ঠায়। আবার যদি এমন হয়! কী করব! কাল মাসিমাদের ঘরে গিয়ে শোব?
আটটার সময় মাসিমার কাছে গেলাম।
থমথমে মুখ দেখে মাসিমা আমার হাত ধরে এসে বসালেন। একটা জলের বোতল হাতে নিয়ে বললেন, এ কী চেহারা করেছিস, এমন উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে কেন তোকে? নে, জল খা তো।
—ও কিছু না, কাল রাতে ঘুম হয়নি, দুর্যোগের জন্য।
—সে কী কথা, আমাদের ডাকতে পারতিস, আমরা কাল অনেকক্ষণ জেগেছিলাম।
—তাই নাকি?
আমি মনে মনে ভাবলাম বুড়োবুড়িকে টেনশন দিয়ে কী হবে, তার চেয়ে চেপে যাই।
বললাম, ওমা কেন? তোমরা তো দশটার মধ্যে শুয়ে পড়।
—ধুর, কাল কত রাতে শুয়েছি আমরা, এদিকে দেখবি আয়।
মাসিমা আমাকে ডেকে নিয়ে পাশের ঘরে গেল, মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করার মতো দেখিয়ে বিছানার দিকে তাকাতে বলে ফিসফিস করে বললেন, দেখ এখন কেমন ভালো ছেলের মতো ঘুমোচ্ছে গোগলটা!
—তোমার নাতি?
—হ্যাঁ রে হ্যাঁ, কাল অনেক রাতে এসেছে, বৃষ্টি ঝড়ে ফ্লাইট লেট ছিল। আর তারপর থেকে শুধু দুষ্টুমি। আমরা গল্প করছি সবাই মিলে। আর উনি বারবার বাইরের দরজা খুলে বের হচ্ছেন, ঢুকছেন। আবার বের হচ্ছেন ঢুকছেন। বলছি, বাইরে অন্ধকার যাস না। কিন্তু কে কার কথা শোনে। কী খেলা খেলছিল কে জানে! আর জানিস তো, নতুন কী কী সব হরবোলার মতো আওয়াজ শিখেছে বাঘ সিংহের। সারাক্ষণ ওই করে আমাদের ভয় দেখিয়ে চলল। যা দুষ্টু হয়েছে না কী বলব! এক মিনিটও চুপ করে বসে থাকে না।
মাসিমা আরও কত কী বলে চলছেন। আমার মাথা কান ভোঁ ভোঁ করছে। নিরীহ বাচ্চার মুখোশে এমন বিচ্ছু বাচ্চা! আমি দেখে নেব! একবার উঠুক ঘুম থেকে, দেখাচ্ছি মজা, দাঁড়া, একবার কাছে পাই তোকে!