মায়াকে চিনতে পারলেই মায়া আপনি পালায়; যেমন চোর বাড়ি এসেছে, গেরস্থ টের পেলে চোর আপনি পালায়। সচ্চিদানন্দ সাগরে ডুবতে হবে। যদি বলো কাম-ক্রোধ রূপ কুমীর ধরবে, তা হলে বিবেক বৈরাগ্যরূপ হলুদ মেখে ডুব দাও। যখন কোন খারাপ জায়গায় যাবে, তখন মা আনন্দময়ীকে সঙ্গে নিয়ে যেও। তা হলে অনেক মন্দ কাজ করবার ইচ্ছে থাকলেও তা থেকে রক্ষা পাবে। মার কাছে থাকলে লজ্জায় মন্দ কাজ করতে পারবে না।
তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকা কি প্রয়োজন? তিনি পিঁপড়ের পায়ের শব্দও শুন্তে পান। তোমার যে রকম ইচ্ছে ডাকো, তিনি শুন্তে পাবেন। শরীরের প্রতি আসক্তি কমে কিসে? মানুষ হাড় মাংসের ঘরকন্না করে, এ দেহখানা কেবল হাড়, মাংস, পুঁজ, রক্ত, মল ও মূত্রের আধার, এ সকল বিচার করলে তার উপর আর আসক্তি থাকে না।
সাধকের কোন রকম ভেক ধারণ করা কি ঠিক?
ভেক ধারণ ভাল, গেরুয়া পরলে ও খোল করতাল নিলে মুখে খেয়াল টপ্পা আসে না। কালা পেড়ে ধুতি পরে বাঁকা সিঁতে কেটে ছড়ি হাতে করে বেরুলে নিধুর টপ্পা গাইতে ইচ্ছে হয়।
এক একবার মনে বেশ ভাব হয়, কিন্তু থাকে না কেন?
বেঁশো আগুন নিভে যায়, ফুঁ দিয়ে রাখতে হয়—সাধনা চাই।
হরির আগমন কিরূপে হয়?
সূর্য ওঠবার আগে যেমন অরুণোদয়। যেমন রাজা কোন চাকরের বাড়িতে যাবার আগে আপনার ভাঁড়ার থেকে বাড়ির সাজসজ্জা ও তাঁর বসবার মতো আসন, খাবার ইত্যাদি পাঠিয়ে দেন; সেই রকম হরি আসবার আগে নিজের সমস্ত যোগাড় করে ভক্তের বাড়িতে আগে পাঠান। প্রেম, ভক্তি, বিশ্বাস ও ব্যাকুলতা সাধকের হৃদয়ে আগে দেন।
বিষয় বাসনা কিরূপে দূর হয়?
অখণ্ড সচ্চিদানন্দ কোটী কোটী সুখের জমাট বাঁধা, তাঁকে যাঁরা সম্ভোগ করেন, তাঁদের আর বিষয়সুখ ভাল লাগে না।
হৃদয়ের কিরূপ অবস্থায় ঈশ্বর দর্শন হয়?
হৃদয় স্থির হলে ঈশ্বর দর্শন হয়। হৃদয়রূপ সরোবর যখন কামনারূপ বায়ুতে চঞ্চল থাকে, তখন ঈশ্বর দর্শন অসম্ভব।
ঈশ্বরকে কিভাবে লাভ করা যায়?
রাঙামুড়ো রুই মাছ ধরতে যেমন ছিপ ফেলে ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হয়। সেই রকম ধৈর্য ধরে সাধনা করা চাই। বাছুর বিশবার পড়ে, বিশবার ওঠে, তারপর দাঁড়াতে পারে। সাধনা করতে গেলে তেমনি অনেক বার পড়ে যায়, তারপর সিদ্ধ হয়। দুই জনে শব সাধনা করতে গিয়ে একজন ক্ষেপে গেল, আর একজন শেষ রাত্রে মা’র দর্শন পেয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলো, “মা! ও ক্ষেপে গেল কেন? তিনি বললেন, “তুইও অমন কত জন্মে কতবার পাগল হয়েছিলি, তারপর আমার দেখা পেলি।”
সুরেশচন্দ্র দত্তের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের উপদেশ’ থেকে