বিশ্বকল্যাণকে উপলক্ষ্য করে সর্ব্বনিয়ন্তা যখনি আচার্য্যরূপে জগতে অবতরণ করেন তখনই সে বিরাট ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এক প্রবল আধ্যাত্মিক শক্তির মহান্ আবর্ত উদ্ভূত হয় এবং চতুর্দ্দিকে দ্রুতবেগে প্রসারিত হতে থাকে। ভাগ্যবান্ তারা—যারা এই বিপুল আধ্যাত্মিক ভাববন্যায় ভাসিয়া, ডুবিয়া, মজিয়া, আত্মহারা হইয়া মহামুক্তির অমৃত আস্বাদন করে! কতকগুলি স্বতঃশুদ্ধ, পবিত্র মানবাত্মায় ঐ মহতী ভাগবতী শক্তি ও বিরাট আধ্যাত্মিক মহাভাব প্রতিফলিত ও সংরক্ষিত হয়, তাহারাই সঙ্ঘের প্রাণ; প্রধানতঃ তাহাদিগকে আশ্রয় করিয়াই সঙ্ঘ গড়িয়া উঠে। সঙ্ঘরূপ বিরাট হর্ম্ম্যের তাহারাই স্তম্ভস্বরূপ।
আচার্য্যের স্বহস্তে সুগঠিত, সুশিক্ষিত এই শুদ্ধ, পবিত্র চরিত্রগুলি আচার্য্যের মহাভাব ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে সমগ্র বিশ্বমানবের পরম কল্যাণ-বিধানের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। ইহারা ত্যাগী, সন্ন্যাসী,—“আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ” সর্বভূতহিতে উৎসৃষ্টপ্রাণ। “সঙ্ঘশক্তিঃ কলৌ যুগে”—কলি যুগে—বর্তমান যুগে যখন মানবকুল সাধারণতঃ সর্ব্ববিষয়ে স্বল্লশক্তিবিশিষ্ট—তখন কোনো বিরাট কার্য্য সাধন করিতে হইলে সঙ্ঘশক্তি চাই,—সমষ্টিশক্তি চাই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য শক্তিগুলিকে একত্র সংহত করিয়া এক বিরাট মহাশক্তির সৃষ্টি চাই। “সংহতিঃ কাৰ্য্যসাধিকা,”—এই সমষ্টিশক্তি দ্বারা অসাধ্য সাধিত হতে পারে। যেমন “তৃণৈগুণত্তমাপন্নৈ বধ্যন্তে মত্তদন্তিনঃ।” “তুচ্ছ তৃণ গুচ্ছবদ্ধ হয়ে একতায়। মত্ত মাতঙ্গেরে রাখে বাঁধিয়া হেলায়।”
আচার্য্যের স্বহস্তে গঠিত এবং মহাভাবে অনুপ্রাণিত এই ত্যাগী সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারী এবং সেবকগণকে লইয়া এই সঙ্ঘের গ্রন্থিসমূহ রচিত। বাইরে ইহাদের প্রত্যেকের পৃথক্ পৃথক্ ব্যক্তিত্ব ও অস্তিত্ব থাকিলেও—অন্তরে ইহারা এক;-একমন, একপ্রাণ, একভাব, একমস্তিষ্ক— এক-শক্তি; ইহাদের সকলের সমগ্র দৃষ্টি এক লক্ষ্যে নিবদ্ধ: ইহাদের সকলের চরিত্র ঐ আচার্য্যের একই মহান্ আদর্শে সুগঠিত। সৌরজগতে যেমন সূর্য্যকে কেন্দ্র করিয়াই গ্রহ-নক্ষত্রাদি স্ব স্ব কক্ষে ভ্রাম্যমান তেমনি সর্ব্বনিয়ন্তার এই মানব-লীলায় আচার্য্যকে কেন্দ্র করিয়াই সঙ্ঘের এই ত্যাগী সন্ন্যাসিগণ বিরাজিত। সূর্য্যই যেমন সৌরজগতের প্রাণ ও অবলম্বন, তেমনি আচার্য্য স্বয়ংই সঙ্ঘের এই ত্যাগী, সন্ন্যাসিগণের প্রাণ ও একান্ত আশ্রয়।
ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রকাশিত শ্রীশ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের যুগবাণী ‘শ্রীশ্রীসঙ্ঘ-গীতা’ থেকে