নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: এই মুহূর্তে কলকাতার পরিবহণের অন্যতম স্তম্ভ অ্যাপ ক্যাব ও বাইক। অনলাইনে বুক করলেই, চালক এসে আরোহীকে নিয়ে গন্তব্য স্থানে পৌঁছে দেয়। এই আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থাই সাইবার প্রতারণা চক্রের তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে। সাধারণ পাবলিক ট্রান্সপোর্টের বাস ড্রাইভার, কন্ডাক্টরের হাত ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা এটিএম কার্ড ও ব্যাঙ্কের বই কলকাতায় পৌঁছাচ্ছে। তারপর কলকাতার ধর্মতলা সহ বিভিন্ন জায়গায় ক্রমাগত তা হাতবদল হচ্ছে ক্যাব বাইক চালকদের মাধ্যমে। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছেন কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার সাইবার গোয়েন্দারা। তাঁদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজান্তে চালকরা প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন। কারণ শুধুমাত্র রাইড বুক করে এটিএম কার্ড আর ব্যঙ্কের বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। চালকরা বুঝতেও পারছেন না যে সে সব প্রতারণার কাজে লাগানো হচ্ছে। তাঁরা শুধুমাত্র রাইডের ভাড়াটাই পান।
তদন্তে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, প্রতারণার সামগ্রী পাচারে এইরকম অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে চক্রটি। প্রথমে কলকাতার কোনো একটি এলাকা থেকে চক্রের এক পান্ডা ক্যাব-বাইক বুক করত। চালক নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছনোর পরই সেই বুকিং বাতিল করে দেওয়া হতো। তবে চালককে বুকিংয়ের ভাড়াও মিটিয়ে দিত চক্রের ওই সদস্য। এরপর তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হত ব্যাঙ্কের বই ও এটিএম কার্ড। পাশাপাশি জানিয়ে দেওয়া হতো, কোন ঠিকানায় গিয়ে সেগুলি কার হাতে তুলে দিতে হবে। তারপর চালক ফের ওই নির্দিষ্ট ঠিকানার জন্য নতুন করে বুকিং নিত। এরপর যাত্রীকে গন্তব্যে নামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি চক্রের অন্য পান্ডার হাতে তুলে দেওয়া হতো ব্যাঙ্কের বই ও এটিএম কার্ড। তদন্তকারীদের অনুমান, এ ভাবেই চালকরা একেবারেই দু’টি ট্রিপের ভাড়া পেত।
কিন্তু কীভাবে বিষয়টি সামনে আসে? সম্প্রতি দেশজুড়ে ১ লক্ষ ৭২ হাজার অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হওয়া সাইবার প্রতারণার ৬৭৫ কোটি টাকার তদন্তে নেমে, নদীয়া জেলায় কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলায় ৬০০ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হদিশ পায়। যার মধ্যে সাইবার থানাতেই দুই মামলায় প্রায় ১১৫ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তদন্তে কয়েক সপ্তাহ আগেই নাকাশিপাড়া থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন আশিস মজুমদার নামে এক ব্যক্তি। সেই ঘটনার তদন্তে কলকাতা থেকে ইতিমধ্যেই সাইবার থানার দুঁদে অফিসাররা সোমনাথ বাউর আর জিতুকে গ্রেপ্তার করে। আশিস আশপাশের গ্রাম থেকে ভাড়া নেওয়া এটিএম কার্ড ও ব্যাঙ্কের বই কলকাতাগামী বাসের চালক-কন্ডাক্টরের হাতে তুলে দিত। কলকাতায় নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছনোর পর সেগুলি চক্রের পান্ডার কাছে, পরে ক্যাব-বাইক চালকদের মাধ্যমে অন্যদের হাতে যেত। গোয়েন্দাদের কথায়, ‘প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িতরা একে অপরকে সাধারণত চেনে না। শুধু নামটুকুই জানে। তাতেই প্রতারণার সামগ্রী হাতবদল হয়।’
প্রথমে আশিসকে দিয়ে সোমনাথকে টোপ দেয় পুলিশ। টালিগঞ্জে গিয়ে দেখা যায়, সোমনাথই আশিসের জন্য ক্যাব-বাইক বুক করে। সেখানেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোমনাথের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মেটিয়াবুরুজের জিতুর কাছে পৌঁছায় গোয়েন্দারা। প্রতারণা সামগ্রী হস্তান্তরের নামে জিতুকে ধর্মতলায় আনা হয়। সেখানে ক্যাব বাইক আরোহীর থেকেই জিতুকে সেই সামগ্রী নিতে দেখা যায়। সামগ্রী হস্তান্তরের মুহূর্তেই হাতেনাতে জিতুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই এই ব্যাঙ্কের বই আর এটিএম কার্ড হস্তান্তরে ক্যাব বাইকের ভূমিকা জানতে পারে পুলিশ।