Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ব্যবসায়ীর অপমৃত্যুতে দিশেহারা হাজার কর্মী, ‘অন্নদাতা’র শেষযাত্রায় শামিল সকলেই

ব্যবসায়ীর অপমৃত্যুতে দিশেহারা হাজার কর্মী, ‘অন্নদাতা’র শেষযাত্রায় শামিল সকলেই
  • ১৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: বিষ্ণুপুরে ব্যবসায়ীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রায় এক হাজার কর্মচারী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টের ভিতরে ব্যবসায়ী শ্যামাপদ চট্টোপাধ্যায়ের (৫৪) ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের খবর শুনেই শয়ে শয়ে কর্মচারী ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছিলেন। বুধবারও শতাধিক কর্মী তাঁদের প্রিয় মালিককে শেষবারের জন্য দেখতে হাসপাতালের মর্গে ভিড় করেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মী এদিন দুপুরে শ্মশানেও আসেন। চোখের জলে তাঁকে শেষ বিদায় জানান।
Advertisement
শহরের তিলবাড়ির বাসিন্দা শ্যামাপদবাবুর বাড়িতে তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও মেয়ে এবং বয়স্ক বাবা রয়েছেন। মেয়ে বারাসতে বিটেক পড়ছেন। ছেলে এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে। ওইদিন শ্যামাপদবাবুর মৃত্যুর খবর শুনেই তাঁর স্ত্রী ঘন ঘন মূর্চ্ছা যাচ্ছেন। মঙ্গলবার রাতেই আত্মীয়রা বাড়িতে আসেন। প্রত্যেকেই সিনেমায় অর্থলগ্নি করে ডুবে যাওয়াকেই মৃত্যুর কারণ বলে দাবি করেন। পুলিস জানিয়েছে, বুধবার শ্যামাপদবাবুর মৃতদেহ বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়। ঘটনায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছে।
মৃতের বোন অসীমা গণ্ড বলেন, দাদা সিনেমা, সিরিয়ালের প্রতি বিরক্ত ছিল। এনিয়ে বাড়ির লোকজনকে বকাবকি করত। তা সত্ত্বেও ঝোঁকের মাথায় সিনেমায় অর্থলগ্নি করে ফেলে। কিন্তু, ওই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা না থাকায় ডুবে যায়। সেই জন্য কালীপুজোর সময় দাদা আমার কাছে কেঁদেছিল। সব ঠিক হয়ে যাবে বলে আমরা ওকে সাহস জুগিয়েছিলাম। অন্যান্য সময় সকালে ও বিকেলে ও বাড়ি থেকে বের হতো। দুপুরে বাড়িতে ঘুমাত। কিন্তু, শেষ কয়েকদিন অস্থির হয়ে উঠেছিল। বাড়িতে থাকতে পারছিল না। দুপুরে ভাত খেয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঘুমাচ্ছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেখান থেকেই দাদার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। 
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শ্যামাপদবাবু দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবা পুরোহিতের কাজ করতেন। শ্যামাপদবাবু নিজে কলকাতায় গেঞ্জি ছাপানোর কারখানায় কাজ করতেন। তারপর নিজেই বিষ্ণুপুর শহর ও আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে ধাপে ধাপে মোট ১০টি কারখানা খুলেছিলেন। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার যুবক-যুবতী সেখানে কাজ করেন। 
মৃতের এক মামা বিপদভঞ্জন বটব্যাল বলেন, ভাগ্নে কারখানার কর্মচারীদের প্রতি ভীষণ সহানুভূতিশীল ছিল। চরম অর্থ সঙ্কট সত্ত্বেও কালীপুজোর সময় কারখানার কর্মচারীদের বেতন দেবে বলে আমার কাছে টাকা ধার নিয়ে এসেছিল। আমাদের মনে হয়েছে সিনেমার অর্থলগ্নির বিষয়ে সে কোনও রকম চাপের মুখে পড়েছিল। বিষয়টি পুলিসকে তদন্ত করে দেখতে বলা হয়েছে।
কর্মচারীদের একাংশের বক্তব্য, মালিক খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আর্থিক সঙ্কটের কারণে তিনি এবার পুজোয় যখন বোনাসের অঙ্ক কমানোর কথা বলেন, সকলেই এক বাক্যে তা মেনে নেন। তিনি প্রায় এক হাজার মানুষের পেটের ভাত জোগাচ্ছিলেন। তাঁর মধ্যে কোনও অহংকার অথবা বিলাসিতা ছিল না। কর্মচারীদের নিজের ভাই-বোনের মতো স্নেহ করতেন। প্রতিদিন শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১০টি কারখানায় একবার করে যেতেন। মঙ্গলবার সকালেও তিনি একাধিক কারখানায় যান। সন্ধ্যায় এরকম ঘটনা শুনে আমরা হতবাক। শহরের ঝাপড় মোড়ে অবস্থিত একটি কারখানার কর্মচারী তথা কৃষ্ণগঞ্জের বাসিন্দা সৌরভ দে বলেন, মালিক যদি আমাদের বলতেন যে দু’মাস বেতন দিতে পারবেন না, আমরা তা অনায়াসেই মেনে নিতাম। কারণ জানি উনি আমাদের ঠকাবেন না। উনি চলে যাওয়ায় এরপর কী হবে সেটা ভেবেই আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।
-ব্যবসায়ী শ্যামাপদ চট্টোপাধ্যায়। 
সম্পর্কিত সংবাদ