Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফের বুজরুকি

নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য দুটি কাজ করেছিলেন। এক, মুণ্ডপাতের জন্য পাখির চোখ করেছিলেন নেহরু-গান্ধী পরিবারকে।

ফের বুজরুকি
  • ১১ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য দুটি কাজ করেছিলেন। এক, মুণ্ডপাতের জন্য পাখির চোখ করেছিলেন নেহরু-গান্ধী পরিবারকে। দুই, সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন ভারতবাসীর পুরনো আবেগে। কারণ স্বাধীনতার পর ভারতের ক্ষমতার আসনে এই পরিবারটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই পরিবারের তিনজন সদস্য জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধী দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেছেন। এছাড়া লালবাহাদুর শাস্ত্রী, পি ভি নরসিমা রাও, মনমোহন সিং প্রমুখ সরাসরি নেহরু-গান্ধী পরিবারের সদস্য না-হলেও প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁদের মনোনয়ন নিয়ে এই পরিবারের পছন্দই ছিল শেষকথা। দেশের অর্ধেকের বেশি সংখ্যক রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতির ভাগ্যও নির্ধারিত হয়েছিল নেহরু-গান্ধী পরিবার কর্তৃক। সোনিয়া গান্ধী নিজে কখনও প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে না-বসেও দীর্ঘদিন কিং মেকাররের ভূমিকায় বিশেষ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তারপরেও ভারত রয়ে গিয়েছিল ‘উন্নয়নশীল’ (আসলে গরিব) দেশের পংক্তিতে। বেকার বাহিনী, কালো টাকা আর গৃহহীন মানুষের প্রশ্নে ভারত বারবার শীর্ষস্থান দখল করেছে। 

Advertisement

মোদি জাতীয় রাজনীতিতে পা দিয়েই, দেশবাসীকে বোঝাতে চাইলেন, সমস্ত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ভারতের এই দুর্দশার জন্য এক ও একমাত্র দায়ী নেহরু-গান্ধী পরিবার। দেশের মুক্তির একটাই রাস্তা—দেশকে এই বীভৎস পরিবারতন্ত্র থেকে বের করে আনতে হবে। অর্থাৎ তাঁর সোজা-সাপটা দাবি, সরকার গড়তে দিতে হবে বিজেপিকে এবং প্রধানমন্ত্রীর আসনে সুযোগ দিতে হবে তাঁকে। তাহলেই তিনি দিনে তারা দেখাতে শুরু করবেন। ব্যাপারটা কী রকম? দেশে বছরে ২ কোটি হারে নতুন চাকরি হবে। কৃষকের আয় দ্বিগুণ হবে দ্রুত। কালো টাকার শেষ দেখে ছাড়বে তাঁর সরকার। দেশে যত কালো টাকা আছে সেসব তো বটেই, বিদেশেও যত কালো টাকা পাচার হয়ে গিয়েছে, মোদি সরকার উদ্ধার করবে সেসবও। অর্থাৎ কালো টাকার সমান্তরাল অর্থনীতির গলায় ফাঁস পরানো শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তিনি আরও জানিয়ে দিলেন, যত কালো টাকা উদ্ধার হবে তার হকদার একমাত্র দেশবাসী, দেশের প্রতিটি মানুষ। অতএব, ওই টাকা দেশবাসীর মধ্যেই ভাগ করে দেওয়া হবে সমান হারে। প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা করবে সরকার। স্বচ্ছতা আর সাম্যের এই অভূতপূর্ব খেল দেখবে বলে দেশের কোটি কোটি মানুষ উদ্বাহু হয়ে ভোট দিয়ে মোদি সরকার বসাল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রাপ্তির ভাঁড়ারে কী জমা হয়েছে? জবাবে ‘দুর্ভোগ’-এর অধিক বর্ণনা পাওয়া মুশকিল। 
কিন্তু এই ‘সার্টিফিকেট’ নিয়ে ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’ বাজার মাত করবে কী করে? অতএব ফের কৌশলের রাজনীতিতে ভরসা রাখলেন মোদিবাবুরা। সবচেয়ে বেশি দাগা দেয় বেকারত্বের সরকারি বেসরকারি হিসেব এবং নির্মম বাস্তব। কেননা, লক্ষ কোটি কর্মসংস্থানের বার্তা যে শুধু মুখেই। উল্টে মোদির ‘বিকশিত ভারতে’ লাফিয়ে বেড়ে চলেছে কেবলই বেকারত্ব। ২০১৯ সালে তো খোদ সরকারি রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়, দেশে বেকারত্বের হার ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ! তারপর পেরিয়েছে আরও দুটি লোকসভা নির্বাচন। টানা ১১ বছর ক্ষমতায় মোদি। কিন্তু দেশে কর্মসংস্থানের বেহাল দশা কাটেনি। বিরোধীদের চাপের মুখে সম্প্রতি কেন্দ্র ঘোষণা করে, এবার থেকে প্রতিমাসেই কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হবে। পরিসংখ্যান মন্ত্রকের এই কর্মযজ্ঞের নাম পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (পিএলএফএস)। গতমাসে প্রকাশিত সেই রিপোর্ট বলছে, ১৫-২৯ বর্ষীয়দের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৫ শতাংশ। সামগ্রিক বেকারত্বের হারও মোটেই সুখকর নয়—৫.৬ শতাংশ। কিন্তু কেন্দ্রের খাতায় বেকার কারা? কারাই বা রোজগেরে? সরকার বলছে, কেউ সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করলেই তাঁকে আর ‘বেকার’ বলা যাবে না। সংশ্লিষ্ট নাগরিককে ‘রোজগেরেই’ ধরা হবে। একে কর্মসংস্থানে মোদিবাবুদের নয়া ‘ভোজবাজি’ বা নয়া ‘জুমলা’ ছাড়া আর কী বলবেন আপনি? শুধুমাত্র সংজ্ঞা বদলে দিলেই যদি বেকারদের ভাগ্য বদলে যেত, তাহলে তো কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কোনও কসরত করারই দরকার পড়ে না। পরিকল্পনা গ্রহণ, সেসব রূপায়ণের উদ্যোগও তাহলে এবার বাহুল্য গণ্য হবে। এই ফর্মুলায় ভারতকে এখনই ‘উন্নত দেশ (ডেভেলপড কান্ট্রি)’ ঘোষণা করে দিতেও আর বাধা থাকবে কেন? ২০৪৭ পর্যন্ত অপেক্ষার কী প্রয়োজন? তবে হ্যাঁ, এই বুজরুকি কোনও সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। বিদেশেও হাসির রোল উঠবে, নিশ্চিতভাবেই, এই যা! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ