Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দায়িত্ব কিন্তু ভোটদানেই শেষ নয়

বিহারের জনগণ বলেছেন। এনডিএ ২০২ আসন এবং এমজিবি ৩৪ আসন পাবে। সকল নাগরিক এই রায় অবশ্যই মেনে নেবেন। মুখ্যমন্ত্রী পদে যিনিই আসীন হোন না কেন, নতুন সরকার আমাদের শুভেচ্ছা পাওয়ার যোগ্য। কারণ, আমাদের শুভেচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য বিহারের জনগণের।

দায়িত্ব কিন্তু ভোটদানেই শেষ নয়
  • ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: বিহারের জনগণ বলেছেন। এনডিএ ২০২ আসন এবং এমজিবি ৩৪ আসন পাবে। সকল নাগরিক এই রায় অবশ্যই মেনে নেবেন। মুখ্যমন্ত্রী পদে যিনিই আসীন হোন না কেন, নতুন সরকার আমাদের শুভেচ্ছা পাওয়ার যোগ্য। কারণ, আমাদের শুভেচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য বিহারের জনগণের।

Advertisement

বিহারের নির্বাচনী প্রচারে গণমাধ্যম গর্বিত বোধ করার মতো কিছু করেনি। সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলির মধ্যে যারা একটু ভিন্ন পথের পথিক তারাও শেষমেশ গড্ডলিকায় ভেসে গিয়েছে। যেসব সাংবাদিক ময়দানে নেমে সংবাদ পরিবেশন করেছেন তাঁরা বস্তুত একযোগে বলে গিয়েছেন: জনগণ জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মনোভাবের মুখে পড়তে হচ্ছে না নীতীশ কুমারকে। তেজস্বী যাদব প্রচারে জোশ এনেছেন বটে কিন্তু তাঁর আবেদন পার্টির ট্র্যাডিশনাল বেস বা চিরাচরিত ক্ষেত্রের বাইরে পৌঁছে দিতে পারেনি। প্রশান্ত কিশোর ভোটারদের সামনে নতুন ধারণা তুলে ধরেছেন বটে কিন্তু তাঁকে একজন নবিশ (স্টার্ট-আপ) এবং অপরীক্ষিত হিসেবেই দেখা হয়েছে। অন্যদিকে, ভোটারদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির যে যোগাযোগ রয়েছে তা ‘ইনস্ট্যান্ট’। রাহুল গান্ধী তাঁর ‘ভোট চুরি’ এবং ‘বেকারত্ব’ নামক মূল থিমের উপরেই আস্থা রেখেছেন... ইত্যাদি প্রভৃতি। সংবাদ মাধ্যম সমস্বরে যা বলে গিয়েছে এই নির্বাচনের ফলাফল যেন সিলমোহর দিয়েছে তাতেই। একমাত্র নতুন গানটি ছিল দশ হাজারি (১০ হাজার টাকা)—ভোটগ্রহণের আগে, ভোটগ্রহণের সময় এবং তারপরেও প্রতিটি পরিবারের একজন মহিলাকে নগদ অর্থ প্রদান।
নীচের ধাপ
বিহারের মানুষের যে স্মৃতি স্পষ্টতই তা দীর্ঘ। তাঁরা লালু প্রসাদের (অথবা তাঁর স্ত্রীর) সরকারের (১৯৯০-২০০৫) মোট ১৫ বছরের কাহিনি মনে রেখে তার দোষ অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দিয়েছেন তেজস্বী যাদবের ঘাড়ে। অথচ ওই সরকার যখন জনগণের ভোটে উৎখাত হয়েছিল সেইসময় তেজস্বী ছিলেন মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোর। তাঁরা নীতীশ কুমারের (অথবা তাঁর ‘প্রক্সি’) ২০ বছরের সরকারের কথাও মনে রেখেছেন কিন্তু নীতীশের বিবিধ ব্যর্থতা নিয়ে তাঁদের মনে কোনও ক্ষোভ নেই বলেই মনে হচ্ছে।
বিহার কি একটি দরিদ্র রাজ্য নয়? সেখানে বেকারত্ব ব্যাপক নয় কি? কোটি কোটি মানুষ কি চাকরির সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন না? বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কি জনগণের একটি বিশাল অংশকে কষ্ট দেয় না? শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল কি ভয়াবহ নয়? ‘নিষেধাজ্ঞা’ সত্ত্বেও, সেখানে মদ কি অবাধে পাওয়া যায় না? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’। যদি তাই হয়, তাহলে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে জনগণ কেন এইভাবে ভোট দিলেন সত্যিই তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। মিস্টার শেখর তাঁর একটি কলামে কটাক্ষ করে লিখেছেন যে ‘বিহার আজ যা ভাবে, বিহার গত পরশুও তাই ভেবেছিল।’ যাই হোক, নির্বাচন-পরবর্তী সমীক্ষাগুলিতে সম্ভবত এর কারণ ভালোভাবেই প্রকাশ পাবে।
আমি বিহারের জনগণকে চম্পারণ যুগের চেতনা পুনরাবিষ্কার করতে অনুরোধ করি। শিক্ষার্থীদের অযোগ্য শিক্ষক; শিক্ষকবিহীন স্কুল/কলেজ; গ্রন্থাগার এবং ল্যাবরেটরি; প্রশ্নপত্র ফাঁস; পরীক্ষায় গণ টোকাটুকি; পরীক্ষার ফলাফলে কারচুপি; ফালতু ডিগ্রি; এবং সরকারি চাকরিতে প্রহসনের নিয়োগ প্রভৃতি অপরাধ নীরবে সহ্য করা উচিত নয়। নিজ রাজ্যে চাকরির আকালকে তরুণদের নীরবে মেনে নেওয়া উচিত নয় এবং ‘যেকোনও’ একটি চাকরির জন্য বহু দূরবর্তী এমন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া উচিত নয় যেখানকার মানুষ, ভাষা, খাদ্য, সংস্কৃতি প্রভৃতি সবই তাঁদের কাছে আনকোরা। বাবা-মা এবং পরিবারগুলিকে ভাগ্যের এই পরিহাস মেনে নেওয়া উচিত নয় যে, পুরুষরা তাঁদের আত্মীয়পরিজনদের সঙ্গে থাকবেন না। আর তাঁদের বাপ-ঠাকুর্দার মতো জীবন কাটাতে পারবেন না আজকের বিহারবাসী। 
মূল কথা হল সংগঠন
স্পষ্টতই, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি জনগণের সামনে একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রশান্ত কিশোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বহুবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে। যদি সত্য হয়, তাহলে দোষ কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির। যোগ্য নেতা এবং কিছু সম্পদ থাকাই যথেষ্ট নয়; মাটিতে লক্ষ লক্ষ পা থাকতে হবে তাদের এবং ওইসঙ্গে একটি শক্তিশালী সংগঠন থাকাও জরুরি। ভোটে জিততে দলের নেতা বা প্রার্থীদের চেয়েও বেশি ভূমিকা থাকে দলীয় সংগঠন এবং ময়দানের যোদ্ধাদের। কিছু বিরল ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তাছাড়া একটি সাধারণ নিয়ম হল—প্রতিটি নির্বাচনে এমন দল বা কিছু দলের জোট জয়ী হয় যাদের সাংগঠনিক শক্তি মজবুত। জনগণের ভোট তাদের পক্ষে ফেলতে সংগঠনই আসল ভূমিকা গ্রহণ করে। এবারের ফলাফল দেখে এটাই মনে হয় যে বিহারে তেমনই সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে বিজেপির এবং তারপরেই শক্তিশালী নীতীশ কুমারের পার্টি জেডি (ইউ)।
দায়িত্ব যেখানে বিশ্রামে
ভারতের নির্বাচন কমিশন যে ভূমিকা পালন করেছে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়ে গিয়েছে। বিহার নির্বাচনের প্রাক্কালে, তারা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘোষণা করেছিল। ওই এসআইআর করা হয়েছিল শুধুমাত্র বিহারে। বিতর্কটাকে ভিন্ন দিকে ঠেলে দিতেও সমর্থ হয়েছিল তারা। ভোটদানের হার বৃদ্ধির আংশিক কারণ হল এসআইআরের কারণে তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা হ্রাস, যে সংখ্যাটি গণিতে বিভাজকের (ডিনোমিনেটর) কাজ করেছে।
ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার মাত্র দশদিন আগে প্রধানমন্ত্রী চালু করে গেলেন ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’! অথচ নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে চোখ বুজে থাকল। এই ঘোষণার আগে থেকে ১০ হাজার টাকা হস্তান্তর শুরু হয়েছিল এবং তা অব্যাহত ছিল প্রচার পর্বেও। এই অন্যায় রুখে দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন কোনও পর্যায়েই হস্তক্ষেপ করেনি। এই অর্থ হস্তান্তর ভোটারদের জন্য ছিল পরিষ্কার একটি ঘুষের ব্যবস্থা। ব্যাপারটা ছিল তামিলনাড়ুতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার উলটো। কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালের মার্চ মাসে। সেবার পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন ছিল ২০০৪-এ। অথচ ওই নির্বাচনের দোহাই দিয়েই প্রকল্পটি সেবার বন্ধ করে দিয়েছিল কমিশন। একটি বিনামূল্যে রঙিন টিভি বণ্টনের প্রকল্প চালু ছিল ২০০৬ সাল থেকে; ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা করার সময় প্রকল্পটি অপ্রত্যাশিতভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল (সূত্র: দ্য হিন্দু)। বিহারে নির্বাচন কমিশনের ‘দলীয় আচরণ’ স্পষ্ট ছিল।
এই বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও, এটা স্বীকার করতে হবে যে এনডিএর এই জয় দুর্দান্ত। 
আগামী পাঁচ বছর কে রাজ্য সরকারের তরফে প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং জবাবদিহি করবেন তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। বিহারের জনগণ রাজ্য বিধানসভায় একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের পক্ষে ভোট দেননি, এবং এর ফলে দায়িত্ব ফিরে আসে জনগণের নিজেরই উপর। ভোটাধিকার প্রয়োগের চেয়ে একটি বড়ো দায়িত্ব এটা‌ই।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ