নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: মানুষ তাঁকে চেনেন ‘পতাকা ম্যান’ নামে। দক্ষিণ হাওড়ার উনসানি বাদামতলার সরু গলির ভিতর ছোট্ট একটি কারখানাই তাঁর কর্মভূমি। স্বাধীনতা দিবসের আগে সেই কারখানায় এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে ত্রিবর্ণ পাতাকা তৈরির কাজ। খটাখট শব্দে ছুটে চলেছে সেলাই মেশিন। একদিকে গেরুয়া, সাদা ও সবুজ কাপড়ের স্তূপ, অন্যদিকে ব্যস্ত হাতে কাটিং, সেলাই ও ছাপার কাজ। আর সবকিছুর মাঝে বসে কাজ তদারকি করছেন পতাকা শিল্পী রাজু হালদার।
তিন পুরুষ ধরে পতাকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত রাজুর পরিবার। তাঁর দাবি, ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা এই কারবার তাঁদের পরিবারের ঐতিহ্য। তাঁর ঠাকুরদাও স্বাধীন ভারতের প্রথম দিকের জাতীয় পতাকা তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। সেই উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন রাজু। তাঁর কারখানায় একদিকে যেমন জাতীয় পতাকা তৈরি হয়, তেমনই উৎসবের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হয় রামনবমীর গেরুয়া পতাকা কিংবা মহরমের কালো নিশান। এক ছাদের নীচে যেন মিলেমিশে থাকে উৎসবের নানা রং। তবে এখন সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে তেরঙ্গার চাহিদা।
কলকাতা, হাওড়া, হুগলি থেকে জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ— রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে বরাত। প্রতিটি জেলায় প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার পতাকা পাঠানোর লক্ষ্য। কাজ সামলাতে মেমারি, ক্যানিং, উলুবেড়িয়া, বাগনানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে ২০-২৫ জন দর্জি। শেখ বাবলুদের মতো শ্রমিকদের প্রতিদিন তৈরি করতে হচ্ছে প্রায় দুই-তিন হাজার পতাকা। সকাল আটটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কাটিং, সেলাই ও প্রিন্টিং। এক ফুটের ছোটো পতাকা থেকে কুড়ি ফুটের বিশাল পতাকা, সবই তৈরি হচ্ছে এখানে।
রাজু বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রায় চারগুণ বরাত এসেছে। বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি বিজেপির তরফেও প্রচুর অর্ডার এসেছে। অতিরিক্ত শ্রমিক আনতে হয়েছে।’ তাঁর কথায়, ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ ঘিরে এবার মানুষের মধ্যে আলাদা উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। মানুষ নিজের বাড়ি, দোকানে পতাকা লাগাতে চাইছেন। দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ক্লান্তি নেই। এই কাজের সুযোগ পাওয়া গর্বের। পতাকা তৈরির কারখানার মতো রাজুর বাড়িটিও আলাদা। তেরঙ্গার রঙেই রাঙানো তাঁর বাড়ি যেন পেশার সঙ্গে জাতীয় পতাকার প্রতি ভালোবাসারও প্রতিচ্ছবি। উনসানির সেই ছোট্ট কারখানা থেকে তৈরি হয়ে এখন রাজ্যের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে ‘পতাকা ম্যান’-এর তেরঙ্গা। নিজস্ব চিত্র