ঢাকা: রাতের অন্ধকারে ফের হিংসায় উত্তাল বাংলাদেশ! তবে এবারের হিংসার চরিত্র আলাদা। উঠল ভারত বিরোধী স্লোগান। হামলা চলল ভারতীয় দূতাবাস, উপদূতাবাসে। খুন, ভাঙচুর, লুটপাট, আগুন কিচ্ছু বাদ গেল না। জনরোষ থেকে রেহাই পাননি সাংবাদিকরাও। ঢাকায় দু’টি প্রধান সংবাদপত্রের অফিসে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাতভর চলে এই তাণ্ডব। এমনকি শুক্রবার বাংলাদেশের সরকারি ছুটির দিনের সকালে পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রামে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। দিনভর দফায় দফায় বিক্ষোভ চলে বিভিন্ন জায়গায়। অশান্তি সামাল দিতে বিভিন্ন শহরে নামানো হয় বিরাট পুলিশ বাহিনী।
একসপ্তাহ আগে ঢাকার রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদি। বৃহস্পতিবার বিকেলে সিঙ্গাপুরের হাসপাতাল থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। সেই খবর আসামাত্র অভিযোগ ওঠে—এই হত্যার সঙ্গে ভারতের যোগ রয়েছে! সেই অভিযোগকে সামনে রেখেই রাজধানী ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় কার্যত তাণ্ডব শুরু করে মৌলবাদীরা। তাদের মূল টার্গেট ছিল ভারতীয় দূতাবাস ও সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়। চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ভারতীয় উপ-দূতাবাসে ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় মৌলবাদীরা। ছোড়া হয় ইট-পাটকেল। উপ-দূতাবাসের ভিতরে ঢোকার চেষ্টাও করা হয়। ভারত-বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে রাজশাহীর ভারতীয় উপ-দূতাবাসের হামলা করে মৌলবাদীরা। তাদের আটকানোর চেষ্টা করেন নিরাপত্তারক্ষীরা। দু’পক্ষের সংঘর্ষ বেধে যায়। দূতাবাসের কর্মীদের উদ্দেশে গালিগালাজ করে বিক্ষোভকারীরা। প্রয়োজনে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। একই ছবি দেখা যায়, চট্টগ্রামেও। সেখানে উপ-দূতাবাসের বাইরে মশাল জ্বালিয়ে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা তৈরি করা হয়। হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, ‘প্রয়োজনে আমরা রক্ত গঙ্গা বইয়ে দেব।’
একই সময়ে খুলনার ডুমুরিয়ায় মাথায় পরপর গুলি চালিয়ে খুন করা হয় ইমদাদুল হক মিলন নামে এক সাংবাদিককে। বাদ যায়নি বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ও। সেখানেও ভাঙচুর চলে। আছড়ে ভেঙে ফেলা হয় হারমোনিয়াম সহ বহু বাদ্যযন্ত্র। পুড়িয়ে দেওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বই, লালন শাহের ছবি। এদিন সকালেও পুরোপুরি থামেনি সেই তাণ্ডব। বিকেলে ঢাকায় উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর দপ্তরেও লাগানো হয় আগুন।
তবে নৃশংসতার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায়। সেখানে বৃহস্পতিবার রাতেই ইসলাম ধর্মের অবমাননার অভিযোগে দীপুচন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু যুবককে গণপিটুনি দেয় উন্মত্ত জনতা। এরপর তাঁর পায়ে দড়ি বেঁধে গাছে ঝুলিয়েও চলে নির্যাতন। শেষপর্যন্ত আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় ওই যুবকের গায়ে। জ্বলন্ত দেহ ঘিরে চলে উল্লাস! ঘটনার ভিডিয়ো দেখে শিউরে উঠেছেন অনেকে। দীপু পেশায় পোশাক কারখানার কর্মী ছিলেন। তিনি ঠিক কী করেছিলেন, তা এখনও প্রশাসন স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি।
একের পর এক এমন ঘটনায় দেশে-বিদেশে চাপ বাড়তে থাকায় শুক্রবার অবশেষে মুখ খোলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। এদিন বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর এই হিংসার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকুন। হিংসা, ভীতি প্রদর্শন, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনার কড়া নিন্দা জানাই।’
গত ১২ ডিসেম্বর হাদির উপর গুলি চলতেই বাংলাদেশের কয়েকজন ইউটিউবার দাবি করতে শুরু করেন, এই ঘটনার পিছনে ভারতের হাত রয়েছে। উত্তেজনার পারদ তখন থেকেই চড়ছিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে হাদির মৃত্যুর খবর আসতেই ঢাকার শাহবাগ চত্বরে জমায়েতের ডাক দেয় ‘জুলাই বিপ্লবে’র বিভিন্ন সংগঠন। সেখানে ভারত-বিরোধী উসকানিমূলক বক্তৃতা দেন একাধিক নেতা। তার মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, বাংলাদেশের দুই সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সঙ্গে ভারতের যোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর কাওরানবাজার এলাকায় দুই সংবাদপত্রের অফিসে ভাঙচুর শুরু করে উন্মত্ত জনতা। অবাধে চলে লুটপাট। ভাঙচুরের পর সেখানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে ছাদে আশ্রয় নেন সাংবাদিকরা। বেশ কিছুক্ষণ পর তাঁদের কোনওমতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয় দমকল। ঘটনার জেরে দু’টি সংবাদপত্র এদিন প্রকাশিত হয়নি।
একদল জনতা আবার হামলা চালায় ৩২, ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। ইতিমধ্যেই ভেঙে দেওয়া বাড়িটিতে ফের আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িটি পুরো ভেঙে ফেলার জন্য নিয়ে আসা হয় বুলডোজার। শুক্রবারও সেখানে শাবল-হাতুড়ি দিয়ে ভাঙচুর চলেছে। এদিন সকালে ঢাকার শাহবাগে হাদি-হত্যার প্রতিবাদে ‘আগ্রাসনবিরোধী সমাবেশ’ আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল সেখানে জড়ো হয়। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে পুলিশ। গুলশনে বিভিন্ন দূতাবাসের সামনেও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজেপি সাংসদ তথা বঙ্গ বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, প্রতিবেশী দেশে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে মৌলবাদ। ঘটনা পরম্পরার নিন্দায় সরব হয়েছে তৃণমূলও। তাদের বিবৃতি, ‘দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা সর্বদা কেন্দ্রের পাশে আছি। তবে বিজেপির কিছু নেতা বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা টেনে পশ্চিমবঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে যে মন্তব্য করছেন, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। এই বিষয়ে বিদেশ মন্ত্রক এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে।’