নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: কলকাতার রবিনসন স্ট্রিটের ছায়া এবার মধ্য হাওড়ার সন্ধ্যাবাজারে। জি টি রোডের কাছে এই বাজারের কাছেই একটি গলিতে আবাসনের চারতলায় থাকতেন রাজকুমার গুপ্তা ও তাঁর ভাই। বুধবার সকালে চারতলার ফ্ল্যাট থেকে দাদা রাজকুমারের (৫০) পচাগলা দেহ উদ্ধার করেছে হাওড়া থানার পুলিশ। ওই দেহ আগলে বসেছিলেন তাঁর ভাই কিষান কানহাইয়া গুপ্তা। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, অন্তত দু’সপ্তাহ আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে পুলিশ। ২০১৫ সালে কলকাতার রবিনসন স্ট্রিটে একই ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন বাবা অরবিন্দ দে’র মৃতদেহ ঘিরে এভাবেই বসেছিল তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে পার্থ ও মেয়ে দেবযানী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ওই ফ্ল্যাটেই দুই ভাই থাকতেন। দু’জনের কেউই বিয়ে করেননি। এক সময় রাজকুমারবাবু টিউশন পড়াতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তিনি বাড়ি থেকে বেরতেন না। মল্লিক ফটকের কাছে তাঁদের অন্যান্য আত্মীয়রা রয়েছেন। কিন্তু এই বাড়িতে তাঁদের যাওয়া-আসা ছিল না। দুই ভাইয়ের কেউই প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন না। মহালয়ার আগে শেষবার রাজকুমারবাবুকে বাড়ির সামনে দেখতে পান প্রতিবেশীরা। পুজোর সময় তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীন ভাই কিষানকে জল আনতে দেখেছেন তাঁরা। কিন্তু রাজকুমারবাবুর মৃত্যুর বিষয়টি কেউই আঁচ করতে পারেননি। স্থানীয়রা জানান, এদিন সকালে রাজকুমারবাবুর এক আত্মীয় তাঁদের ফ্ল্যাটে আসেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করলেও কোনও সাড়াশব্দ না মেলায় প্রতিবেশীদের ডেকে আনেন তিনি। এরপর কিষান ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই ভিতর থেকে দুর্গন্ধ ভেসে আসে।
খবর দেওয়া হয় হাওড়া থানায়। পুলিশ এসে ভিতরে ঢুকলে দেখা যায়, খাটের উপর পচাগলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে রাজকুমারবাবুর দেহ। দেহে বাসা ধরেছে পোকা। গোটা ঘর আবর্জনায় ভর্তি। দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় পুলিশ।
হাওড়া সিটি পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘অসুস্থ হয়েই সম্ভবত ওই প্রৌঢ়ের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে বাকিটা বোঝা যাবে।’ এদিকে পুলিশ রাজকুমারবাবুর দেহ নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ওই ফ্ল্যাটে একাই রয়েছেন তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীন ভাই। কতদিন ধরে দাদা মৃত অবস্থায় পড়েছিল, সেটাও ঠিক করে বলতে পারছেন না তিনি। অসংলগ্ন অবস্থায় তিনি বলেন, ‘দাদা অসুস্থ ছিল। বিছানাতেই শুয়েছিল। কাকে আর বলব! আমি লাইট অফ করে রাখতাম। খাবার কিনে আনতাম।’
স্থানীয়রা বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে তাঁরা এই ফ্ল্যাটে রয়েছেন। দুই ভাই কারওর সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন না। আবাসনের পিছনে একটি ভ্যাট রয়েছে। সেখান থেকে সব সময় দুর্গন্ধ ভেসে আসে। তাই আলাদা করে গন্ধ পাইনি আমরা। রাজকুমারবাবুর অসুস্থ ভাইকে কোনও হোমে পাঠানোর ব্যবস্থা করুক প্রশাসন। তাঁকে তো এভাবে ফ্ল্যাটের ভিতরে রাখা যায় না।’