সংবাদদাতা, রামপুরহাট: কথা ছিল, দু’জনে মিলে দীঘা বেড়াতে যাওয়ার। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেমিককে ভিডিও কলে রেখে গলায় ওড়না জড়িয়ে ঝুলে ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন শেষ করে দিল মেধাবী ছাত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে রামপুরহাট শহরের কামারপট্টি মোড়ে। ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা পরিবার।
পুলিস ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতার নাম শ্যামা গড়াই (১৯)। বাড়ি মল্লারপুর থানার ধোবানন্দপুর গ্রামে। যদিও মাস চারেক ধরে রামপুরহাটের কামারপট্টি মোড়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাবা, মায়ের সঙ্গে থাকছিল। রামপুরহাট উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল শ্যামা। বাবা নন্দকুমার গড়াই সাঁইথিয়ায় একটি বেকারিতে কাজ করেন। মা পঞ্চমী গড়াই রামপুরহাটের একটি মিষ্টির দোকানের কর্মী। দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে মাধ্যমিকে মল্লারপুরের রাতগড়া হাইস্কুলে প্রথম হয়েছিলেন শ্যামা। ইচ্ছে ছিল চিকিৎসক হওয়ায়। মেয়ের সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য রামপুরহাটের নামি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন বাবা-মা। পরিবারের আর্থিক দুরাবস্থা দেখে টিউশন পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করত শ্যামা। সম্ভবনাময় এই ছাত্রীকে ঘিরে আশায় বুক বেঁধেছিলেন রামপুরহাট উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারাও। কিন্তু তার আগেই নিভে গেল প্রত্যাশার প্রদীপ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বছর তিনেক আগে মোবাইলে নলহাটির লক্ষ্মীবাটি গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় শ্যামার। তারপর প্রেম। দুই পরিবারই তাঁদের সম্পর্কের কথা জানত। মেয়ে ডাক্তার হয়ে বিয়ে করব বলে জানিয়েছিল। দুই পরিবারের সদস্যদের একে অপরের বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিল। বুধবার রাতেই ট্রেন ধরে তাঁদের দীঘা বেড়াতে যাওয়ার কথা। মঙ্গলবার রামপুরহাটে শপিংও করেন দু’জনেই।
পঞ্চমীদেবী এদিন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘প্রতিদিন সকালে আমরা স্বামী-স্ত্রী কাজে বেরিয়ে যাই। বাড়িতে একাই ছিল মেয়ে। সন্ধ্যা বেলায় মেয়ে ফোন করে বলে আমরা দীঘা বেড়াতে যাব। একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে কিছু খাবার তৈরি করে দিতেও বলে। আমি মালিকের কাছ থেকে তাঁদের জন্য চারটি মিষ্টি নিয়ে রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ বাড়ি ফিরে দেখি ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পাচ্ছি না। ফোন করলেও কল রিসিভ করছিল না। পরে প্রতিবেশীরা জড়ো হন। স্বামীকে ফোন করে বিষয়টি জানাই। স্বামী এসে দরজা ভেঙে দেখে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না জড়িয়ে ঝুলছে মেয়ে। মোবাইলটি পাশের একটি টেবিলে তাক করে লাগানো ছিল। তারপর মোবাইল ঘেঁটে দেখি ওই যুবককে ভিডিও কলে রেখে মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।’
তাঁর দাবি, মোবাইলে তাঁদের মধ্যে নিশ্চয় কোনও বড়সড় গণ্ডগোল হয়েছে। যার জেরে মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। পুলিস এসে দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রামপুরহাট মেডিক্যালে পাঠানোর পাশাপাশি মোবাইলটি বাজেয়াপ্ত করে।
শ্যামার মৃত্যুর খবরে মুষড়ে পড়েছেন রামপুরহাট উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা মল্লিকা হালদার। তিনি বলছিলেন, ‘শ্যামা পড়াশোনায় বড্ড ভালো ছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে ও খুব ভালো ফল করত। কিন্তু এভাবে চলে যাবে, ভাবতেই অবাক লাগছে।’ একইভাবে মেধাবী ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় মর্মাহত রাতগড়া হাইস্কুলের টিআইসি পার্থসারথী মণ্ডলও।
পুলিস জানিয়েছে, এঘটনায় এখনও পর্যন্ত থানায় কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি। একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়েছে।