গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ আরম্ভ হতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে সেই দেশগুলি যাদের জীবাশ্ম জ্বালানির অভ্যন্তরীণ জোগান বহুলাংশের আমদানিনির্ভর। এই রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ভারত উল্লেখযোগ্য এবং সর্ববৃহৎও বটে। ভারতে খনিজ তেলের মোট চাহিদার ৮৮ শতাংশের বেশি পূরণ করা হয় আমদানি থেকে। গ্যাসের মোট প্রয়োজনের ৫০ শতাংশের অধিক ভারত আমদানি সূত্রে মিটিয়ে থাকে। এমনকি বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সত্ত্বেও ভারতকে ১৫-২০ শতাংশের মতো আমদানিকৃত কয়লা ব্যবহার করতে হয়। মোদ্দা কথায়, প্রাইমারি এনার্জি সাপ্লাই বা প্রাথমিক শক্তির জোগানের কমবেশি ৪০ শতাংশ ভারতকে আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। এই গোটা ব্যাপারটার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা, অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশের উপর ভারত বিশেষভাবে নির্ভরশীল। আমরা জানি, এই মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়ার যে অঞ্চল যুদ্ধে বিধ্বস্ত এবং মত্ত, সেই অঞ্চলটি তৈলসমৃদ্ধ বলেই পরিচিত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের নানা অঞ্চলে খনিজ সম্পদ আদানপ্রদান হয়ে থাকে। ওই বিখ্যাত জলপথ এখন প্রকারান্তরে রুদ্ধ। তার প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছে তেল ও গ্যাসের বাণিজ্য ও জোগানে।
এই যুদ্ধপরিস্থিতিতে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলির অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন। তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করা নিয়ে কোনো কোনো জায়গা থেকে রীতিমতো সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলার দুঃসংবাদ পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া এইসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবহারে বেনজির রেশনিং যে চলছে তা বলাই বাহুল্য। যুদ্ধের আঁচ ভারতের প্রতিটি প্রান্তেই পড়েছে। বিশেষ সমস্যা দেখা দিয়েছে রান্নার গ্যাস (এলপিজি) এবং গাড়ির জ্বালানি গ্যাসের জোগান নিয়ে। তেল কোম্পানিগুলি নানাবিধ নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দিয়েছে। হোটেল, রেস্তরাঁ এবং ক্যাটারিং ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মহা আতান্তরে। এমনকি স্কুলে গরিব ছেলেমেয়েদের মিড ডে মিলের জোগানও বহুলাংশে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট খারাপ। চাহিদা মতো জোগান দিতে অপারগ সরকার কিন্তু ভেঙেও মচকাতে রাজি নয়! এই প্রসঙ্গ উঠলেই বড়ো গলায় দাবি করছে, ‘সব ঠিক হ্যায়’! সংসদের ভিতরে বাইরেও ঘোষণা করছে, তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। কিন্তু সরকারের দাবির সঙ্গে বাস্তবের ফারাক অনেকটাই। যেমন তিনবছর যাবৎ বাংলায় উজ্জ্বলা যোজনায় রান্নার গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ রেখেছে মোদি সরকার। এই চেনা বঞ্চনার সঙ্গে এবার জুটেছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দোহাই। রান্নার গ্যাসের নতুন সংযোগ প্রদান সটান বন্ধ করে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। এমনকি, সিঙ্গল সিলিন্ডারের গ্রাহকরা দ্বিতীয় সিলিন্ডারের জন্য আবেদন করলেও এখন হতাশ হবেন। এই নির্দেশ ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে পাঠিয়েছে তেল সংস্থাগুলি। অন্যান্য নির্দেশিকার মতো এক্ষেত্রেও কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে তাঁদের নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। তবে ডিস্ট্রিবিউটরদের একাংশের বক্তব্য, গতমাসের গোড়ায় রান্নার গ্যাসের সংকট বৃদ্ধির পর অনেকেই নিজের থেকে নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ রাখেন। কোনো কোনো পদাধিকারীর মৌখিক নির্দেশে সেটা হয়েছিল।
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে উজ্জ্বলার পাশাপাশি কোনোরকম গ্যাস সংযোগের আবেদনেই সাড়া মিলবে না। উজ্জ্বলাতে বাংলাকে বঞ্চনা নতুন নয়। চব্বিশের ভোটের আগে এরাজ্যে প্রায় ১৪ লক্ষ উজ্জ্বলা গ্যাসের আবেদন জমা পড়ে। নানা অজুহাতে সেগুলি নিয়ে কেন্দ্র কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। এই অবস্থায় নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধেরই নির্দেশিকা পৌঁছেছে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে। এই বার্তা আবেদনকারীদের কাছেও স্পষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের তরফে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে? সেই জবাব আপাতত কারো কাছে নেই। সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধিই দস্তুর মোদিযুগে মোদির ভারতে। শুধু নতুন নতুন বাহানার অবসর। এই এখন যেমন পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ। তবে অন্যরা অপারগ অকপটে হলে তা কবুল করে। কিছু ক্ষেত্রে দেশবাসীর পক্ষে ক্ষমাসুন্দর হয়ে উঠতে আপত্তি থাকে না। কিন্তু মোদিবাবুদের যা কারবার, দেশবাসীর সামনে সেই সুযোগও থাকে না কখনো। কারণ, এঁরা লেজেগোবরে হলেও মুখে তা মানেন না। অর্থাৎ ভিতর থেকে ভেঙে খান খান হয়ে গেলেও মচকান না এই মহানরা। এই শাসক বস্তুত সমস্ত নিন্দার ঊর্ধ্বে!