নয়াদিল্লি: প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ বা এসপিজির। ‘ব্লু বুক’ নামে এক গোপন নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর চলাফেরার রুট, বাসস্থান এবং সভা-অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা তদারকি করা হয়। সেই ‘ব্লু বুক’-এর নিয়ম অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সফরের তিনদিন আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক সেরে ফেলে এসপিজি। অনুষ্ঠানের গোটা রুটে ওই তিনদিন লাগাতার চলে যৌথ নজরদারি। কিন্তু খাস দেশের বাণিজ্য রাজধানী মুম্বইতে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার সেই বজ্রআঁটুনিতেই বড়োসড়ো ফাটল দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্সে জিও ওয়ার্ল্ড সেন্টারে আয়োজিত গ্লোবাল ফিনটেক ফেস্টের উদ্বোধন করেছেন নরেন্দ্র মোদি। ঠিক তার আগের রাতেই খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (পিএমও) ভুয়ো আইডি কার্ড দেখিয়ে অনুষ্ঠানস্থলের ভিতরে ঢোকার ঢোকার চেষ্টা করল দুই যুবক। তাও আবার আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী আসার কয়েকঘণ্টা আগে ভিআইপি জোন দিয়ে প্রবেশের সময় দু’জনকে ধরে ফেলেন নিরাপত্তারক্ষীরা। অভিযোগ, ধৃতদের মধ্যে একজনই নিজেকে পিএমও আধিকারিক বলে পরিচয় দেয়। সেই যুবকের নাম রোহন পারেখ। অন্যজন ছিল দেহরক্ষী পরিচয়ে, দিলীপ কুন্ডে। দু’জনে কেন মোদির সভাস্থলে যাচ্ছিল, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত নন তদন্তকারীরা। যদিও নিজেকে প্রতারণার শিকার প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন ধৃত রোহন। প্রধানমন্ত্রীর সভার আগে এমন ঘটনা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অবাক করেছে। বিশেষ করে রোহনের পরিচয় জানার পর। কারণ, তদন্তকারীদের দাবি, ওই যুবক পেশায় একজন ড্রোন ব্যবসায়ী। খারে এলাকায় অফিসও রয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে মামলাটির তদন্তভার নিয়েছে মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ।
মুম্বই পুলিশ অবশ্য এই ঘটনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে জড়াতে নারাজ। তাদের দাবি, মোদির অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলাকালীন জিও ওয়ার্ল্ড প্লাজায় ঢুকেছিলেন রোহন। পরে তাঁর দেহরক্ষী দিলীপ কুন্ডে সেখানে পৌঁছান। মেটাল ডিটেক্টরে তাঁর কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের হদিশ মেলে। এরপরই তাঁকে আটকে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে কুন্ডে ফোন করেন পারেখকে। এরপর পারেখ প্রবেশপথে ফিরে আসেন। তখনই তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের পিএমও-র দেওয়া একটি পরিচয়পত্র দেখান। ওই কার্ডে তাঁকে ‘গ্রেড সি আধিকারিক’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু কার্ডটিতে শুধু ইস্যু করার তারিখ ছিল। কিন্তু কোনো মেয়াদ লেখা হয়নি। এমনকি আইডি ইস্যুকারীর স্বাক্ষর থাকলেও তাঁর পদ উল্লেখ ছিল না। এরপরই পারেখ ও কুন্ডেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারি কর্মীর ভুয়ো পরিচয় দেওয়া, এবং অস্ত্র নিয়ে বেআইনিভাবে প্রবেশের মতো গুরুতর ধারায় এফআইআর দায়ের হয় বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্স থানায়। পরে পুলিশ জানতে পারে, কুন্ডের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রটির বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। রোহনকে আদালতে পেশ করা হলে তাঁকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেপাজতে পাঠানো হয়। ঘটনায় আরও এক ব্যক্তি, প্রথমেশ বাগুলের যোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর খোঁজ চালাচ্ছে পুলিশ।
ইতিমধ্যে আদালতে পারেখের আইনজীবী জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেল সম্ভবত প্রতারিত হয়েছেন। তাঁকে পিএমও-র উপদেষ্টা পদে চাকরি দেওয়ার কথা বিশ্বাস করানো হয়েছিল। আর তা করা হয়েছিল পিএমও দপ্তরের নিয়োগপত্র, সরকারি মেল আইডির মতো ঠিকানা থেকে আসা ই-মেল এবং পরিচয়পত্রের একটি স্ক্রিনশট পাঠিয়ে। পরিচয়পত্রের কোনো আসল কপি ছিল না। এমনকি ই-মেল মারফত দেহরক্ষী নিয়োগ করতেও বলা হয়েছিল বলে দাবি আইনজীবীর। তিনি এও বলেন, বাগদত্তার জন্য পারফিউম কিনতে মলে গিয়েছিলেন রোহন। যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও যোগাযোগের তথ্যও পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই ভুয়ো পিএমও পরিচয়পত্রের উৎস নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছেন তদন্তকারীরা। চারদিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়েছেন। সেখানেই অনুপ্রবেশের চেষ্টা কপালে ভাঁজ ফেলেছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলির।