সোমনাথ বসু: হাডসন নদী বয়ে চলেছে নিজস্ব ছন্দে। অন্য সময় জল কাচের মতো স্বচ্ছ। কিন্তু এখন তার বিন্দুতে বিন্দুতে সূর্যমুখীর হলুদ রং। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ পেরনোর সময় নীচের দিকে উঁকি মারলে ব্রাজিলের জাতীয় পতাকার জলছবি দেখা যাবে। আসলে, সপ্তাহখানেক ধরেই নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সির দখল নিয়েছেন সাম্বা অনুরাগীরা। আট থেকে আশি— প্রত্যেকেই হেক্সার খোঁজে এসেছেন মার্কিন মুলুকে। তাই হলুদের সমারোহ চারদিকে। নিউ জার্সির কলম্বিয়া পার্ক ট্রেনিং ফেসিলিটিতে আপাতত ঘাঁটি গেড়েছে কার্লো আনসেলোত্তি ব্রিগেড। জোরকদমে চলছে প্রস্তুতি। ট্রেনিংয়ে ইতালিয়ান কোচ কখনো মশকরা করছেন ভিনিসিয়াসদের সঙ্গে, আবার পান থেকে চুন খসলেই রাফিনহাদের শুনতে হচ্ছে কড়া ধমক। ভারতীয় সময় শনিবার ভোররাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল। গ্রুপ-সি’এর শীর্ষে থাকার জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেকটাই। তাই অনুশীলনে খামতি নেই অ্যালেক্স স্যান্ড্রো- মার্কুইনহোসদের।
কাতার বিশ্বকাপে চমক দিয়েছিল মরক্কো। পৌঁছেছিল শেষ চারে। সেই ম্যাচে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কাছা খুলে আক্রমণে ওঠার খেসারত দিতে হয়েছিল তাদের। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা আদায় করে নেয় উত্তর আফ্রিকার দেশটি। কৌলিন্যে তারা ব্রাজিলের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। কিন্তু ফিফা র্যাংকিংয়ে দুই দেশই গায়ে গায়ে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এখন ষষ্ঠ স্থানে। আর এক ধাপ পিছনেই মরক্কো। কিন্তু সাম্বা সমর্থকরা এই পরিসংখ্যান ধর্তব্যের মধ্যেই রাখছেন না। আচরাফ হাকিমিদের দুরমুশ করেই অভিযান শুরু করতে মরিয়া তাঁরা। চেনা-অচেনা মাটির পরোয়া তাঁরা করেন না। ইউরোপ হোক, এশিয়া বা আমেরিকা... বিশ্বজয়ে সাম্বার ছন্দ জাদু ছড়ায় দুনিয়ার যে কোনো প্রান্তে। যেখানেই ব্রাজিলের ফুটবল ডানা মেলে, সেই মাটি যেন হয়ে যায় তাঁদেরই। যেমন ফুটবলার, তেমনই সমর্থক। ঠিক যেন টাইমস স্কোয়ারে ফুডস্টলের কাছের ওই একঝাঁক পায়রার মতো। খাবারের খোঁজেই এসেছে তারা। হয়তো রিও ডি জেনেইরো, পোর্তে অ্যালেগ্রে থেকে। একবুক ফুটবল-আবেগ আর জয়ের খিদে নিয়ে। ২২ বছরের মারিও কিংবা ৫৮’র অস্কাররাও তো হেক্সার টানেই পা রেখেছেন ট্রাম্পের দেশে। তাই ব্যাগ থেকে খাবার বের করে তাঁরা অকাতরে বিলিয়ে দিলেন পায়রাদের জন্য। কিছুক্ষণ পরেই টাইমস স্কোয়ার মেতে উঠল ‘ওলে ওলে’ গানে। হলুদ ভিড়ের কণ্ঠে ধরা দিয়েছেন রিকি মার্টিন। উজ্জ্বল আলোর বিলবোর্ডে ভেসে উঠছে ফিফা বিশ্বকাপের ছবি।
এমনই আবহে কার্লো আনসেলোত্তির টেনশন বাড়াচ্ছে রক্ষণ। বর্ষীয়ান মার্কুইনহোস কিংবা অফ কালার অ্যালেক্স স্যান্ড্রো বেশ নড়বড়ে। মাঝমাঠে আমরাবত-এল আয়নাউইদের রুখতে অবশ্য তৈরি অভিজ্ঞ কাসেমিরো-গুইমারেসরা। প্রথম ম্যাচ জেতার জন্য উইং প্লে’ই ভরসা ব্রাজিলের। ভিনিসিয়াস ও রাফিনহা পাখা মেলতে পারলে গোল আসা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। তবে হাকিমিরাও শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে জানেন। পিএসজি’র এই ডিফেন্ডারের সঙ্গে ভিনিসিয়াসের দ্বৈরথই ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচের মুখ্য আকর্ষণ। আনসেলোত্তির তুরুপের তাস হতে পারেন প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন এনড্রিক।
নেইমারকে নিয়ে না লিখলে ব্রাজিলের প্রিভিউ অসম্পূর্ণ। তিনি এখনও রিহ্যাবে ব্যস্ত। দলের সঙ্গে ট্রেনিং গ্রাউন্ডে এলেও বল পায়ে অনুশীলন করছেন না। প্রথম ম্যাচে তাঁর খেলার সম্ভাবনা নেই। তা সত্ত্বেও আনসেলোত্তি ভরসা রাখছেন নেইমারের উপর।
বহু বছর পর ব্রাজিলের দায়িত্বে এক বিদেশি। আনসেলোত্তি এই চাপ উপভোগ করছেন। তবে পদস্খলন হলে সূর্যমুখী হলুদ মুহূর্তে আগুনের চেহারা নেবে তা তিনি জানেন। তাই ধীরেসুস্থে পা ফেলাই তাঁর লক্ষ্য। শেষ আট কিংবা শেষ চার নয়, এখন মরক্কোকে হারানোর জন্যই ছক কষছেন ৬৭ বছরের তরুণ।