অম্বরীশ চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: মোহন বাগান মাঠে তখন প্রাক্তন ফুটবলারদের প্রদর্শনী ম্যাচ জমে উঠেছে। সেই সময়ই হন্তদন্ত পায়ে ক্লাবের গেট পেরিয়ে গ্যালারির দিকে এগিয়ে এলেন হাওড়ার সালকিয়ার বিশ্বনাথ মুখার্জি। হাতে রজনীগন্ধার তোড়া। কিন্তু গ্যালারিতে না উঠে তিনি থামলেন অমর একাদশের মূর্তির সামনে। পরম শ্রদ্ধায় তোড়া অর্পণ করে প্রণাম জানালেন। তারপর ক্লাবের দিকে ফিরে ডান হাত ঠেকালেন কপালে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খুদে সমর্থককে বললেন, ‘দাদুভাই, এরাই আসল নায়ক। এই এগারো জনের জন্যই আজ মোহন বাগানের এত গৌরব। মাঠে এসে আগে এখানে প্রণাম করবে।’ বৃদ্ধকে অনুসরণ করে খুদে সমর্থকও প্রণাম করল। সবুজ-মেরুনের আবহমান ঐতিহ্যের ব্যাটন যেন নিঃশব্দেই এক প্রজন্মের হাত থেকে আর এক প্রজন্মের হাতে পৌঁছে গেল।
১৯১১ সালের ২৯ জুলাই ব্রিটিশ দল ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে ২-১ ব্যবধান হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতেছিল মোহন বাগান। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে সেই অবিস্মরণীয় জয়কে স্মরণ করে ২০০১ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে মোহন বাগান দিবস। প্রতিবারের মতো এবারও বুধবার গঙ্গাপাড়ের ক্লাব তাঁবু সেজে উঠেছিল উৎসবের আবহে। সকাল থেকেই সানাইয়ের সুর যেন ফিরিয়ে আনছিল ১১৫ বছর আগের ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতি। কালো মেঘের আনাগোনা উপেক্ষা করে আট থেকে আশি— সবুজ-মেরুন সদস্য-সমর্থকদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে তাঁবু। আর মাঝেমধ্যেই শোনা যায় শিবদাস, বিজয়দাস ভাদুড়িদের স্মৃতিচারণ।
ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এরপর ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে অমর একাদশের মূর্তিতে মাল্যদানও করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘মোহন বাগান কেবল বাংলার বা বাঙালির ক্লাব নয়, দেশের সবচেয়ে গৌরবান্বিত ক্লাব। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফুটবল মাঠে খালি পায়ের সেই লড়াই অদম্য সাহসের প্রতীক হয়ে থাকবে চিরকাল।’ এরপর তিনি উপভোগ করেন প্রাক্তন ফুটবলারদের প্রদর্শনী ম্যাচ। মঞ্চে তখন সুব্রত ভট্টাচার্য, আলোক মুখার্জি ও প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে যেন চাঁদের হাট। অন্যদিকে সবুজ-মেরুন ও সাদা জার্সিতে বিভক্ত হয়ে মোহনরাজ, দীপেন্দু বিশ্বাস, ষষ্ঠী দুলেরা মাঠে ফিরিয়ে আনলেন সোনালি অতীতের স্মৃতি। বৃষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গ্যালারি ভরিয়ে তুললেন সমর্থকরা। গমগমে আবহে মোহন বাগান সভাপতি দেবাশিস দত্তের মন্তব্য, ‘আজ অঞ্জনদার (মিত্র) কথা খুব মনে পড়ছে। ওঁর উদ্যোগেই এই দিন পালন শুরু হয়েছিল। আজ শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও মোহন বাগান দিবস পালিত হয়।’ সচিব সৃঞ্জয় বসুর কথায়, ‘ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস ১৫ আগস্ট। তবে মোহন বাগান দিবসের গুরুত্বই আলাদা। এটাই ভারতীয় ফুটবলের প্রকৃত জন্মদিন।’
সন্ধ্যা নামতেই আলোর রোশনাইয়ে সেজে ওঠে মোহন বাগান তাঁবু। গোষ্ঠ পাল সরণি যেন মায়াজালে মোড়া। সেই আলোয় অভিলাষ ঘোষদের মূর্তিকে ঘিরে সেলফির ভিড়। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই মিশে থাকে আবেগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম।