Bartaman Logo
৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ব্রহ্ম

পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের বিশ্ববন্দিত সুপ্রাচীন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার মূল মর্ম্মবাণী ব্রহ্মচর্য্য বা ইন্দ্রিয়সংযম, যজ্ঞ বা ত্যাগ এবং ব্রহ্মসাধনা। প্রাচীন আর্য্য ঋষিগণ সৃষ্টিরহস্য ও জগৎকারণ অনুসন্ধান করতে করতে ধ্যানমগ্ন হয়ে জগৎকারণের দর্শনলাভ করে তাঁদের উপলব্ধ তত্ত্বজ্ঞান উপনিষদ প্রভৃতি শাস্ত্রে লিখে রেখে যান।

ব্রহ্ম
  • ১১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের বিশ্ববন্দিত সুপ্রাচীন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার মূল মর্ম্মবাণী ব্রহ্মচর্য্য বা ইন্দ্রিয়সংযম, যজ্ঞ বা ত্যাগ এবং ব্রহ্মসাধনা। প্রাচীন আর্য্য ঋষিগণ সৃষ্টিরহস্য ও জগৎকারণ অনুসন্ধান করতে করতে ধ্যানমগ্ন হয়ে জগৎকারণের দর্শনলাভ করে তাঁদের উপলব্ধ তত্ত্বজ্ঞান উপনিষদ প্রভৃতি শাস্ত্রে লিখে রেখে যান। “তে ধ্যানযোগানুগতা অপশ্যন্ দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈর্নিগূঢ়াম্।” “বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্” ইত্যাদি শ্রুতি। পরব্রহ্ম ও তাঁহার পরা অপরা প্রভৃতি বিবিধ শক্তি তাঁর সহিত অভিন্ন এবং ব্রহ্মশক্তির দ্বারাই বিশ্বজগৎ সৃষ্ট পালিত ও সংহত হয়। শ্রুতি বলেন, ব্রহ্ম একাকী আনন্দ পেলেন না তাই নিজেকে পুরুষ ও প্রকৃতি দুই রূপে ভাগ করলেন। দ্বিধাবিভিক্ত হলেও শাশ্বত বস্তুটী এক ও অভিন্ন। দুইতে এক আবার একই দুই। যেমন একটা চণক (ছোলা) দুই দল-বিশিষ্ট হলেও বল্কলাবৃত একটী পদার্থ, তেমন যোগমায়ার শক্তির আবরণে ব্রহ্ম ও তাঁর শক্তি একই বস্তু। গীতায় ভগবানের উক্তি “নাহং প্রকাশঃ সর্ব্বস্য যোগমায়াসমাবৃতঃ।” একই ব্রহ্মের লীলার জন্য যুগলরূপ পুরুষ-প্রকৃতি, রাধা-কৃষ্ণ, সীতারাম, শিবকালী প্রভৃতি অনাদি মিথুন। স্বরূপে অভিন্ন কিন্তু ভক্তের রুচি অনুসারে ভাববন্ধু ভগবান্ নানা নাম, রূপে প্রকাশ হয়ে উপাসিত হন। সাধকের যোগ্যতা, সাধনা ও রুচিভেদে একই ব্রহ্ম, পরমাত্মা বা ভগবানের ভিন্ন ভিন্ন উপাসনামার্গ, বৈষ্ণব, শাক্ত শৈব ইত্যাদি। ভিন্ন ভিন্ন পৰ্ব্বত হ’তে বহির্গত নদনদী যেমন একই সমুদ্রে গিয়ে মিশে তেমন সব উপাসনামার্গের একমাত্র কাম্য ও উপাস্য পরব্রহ্মই। গুরু বা ঈশ্বরের নানা মূর্তির মধ্যে বড় ছোট কল্পনা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরস্পর বিদ্বেষ বা নিন্দা প্রভৃতি মাৎসর্য্য ও অজ্ঞতা হ’তেই উদ্ভূত হয়ে সমাজের ক্ষতি করেছে। অজ্ঞান-তিমির দূর করে জ্ঞানালোকে বিতরণের জন্যই দয়ালু মহাপুরুষগণ যুগে-যুগে অবতীর্ণ হয়ে ধর্মসমন্বয়, ব্রহ্মতত্ত্ব ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক বাণী প্রচার করেন। সর্ব্বোপাস্য ব্রহ্ম অভিন্ন এবং উপাসনার পথ হিন্দুধর্মে ভিন্ন মাত্র, এই শিক্ষা আমরা সকল শাস্ত্র ও সাধু-মহাত্মার কথা হ’তে জানতে পারি। নিম্নে কিছু শাস্ত্রবাক্য লিখছি—‘একমেবাদ্বিতীয়ং’ “একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”-শ্রুতি। “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ণানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ।।»-গীতা। “একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা”- চণ্ডী। “যথাদ্রিপ্রভবা নদ্যঃ... বিশন্তি সর্ব্বতঃ সিন্ধুং তদ্বৎ ত্বাং গতয়াহন্ততঃ”- ভাগবত। “ঈশ্বরত্বে ভেদ মানিলে হয় অপরাধ”, “একই ঈশ্বর ভক্তের ধ্যান অনুরূপ। একই বিগ্রহে ধরে নানাকার রূপ”-চৈতন্যচরিতামৃত। ঈশ্বর-বিশ্বাসী মুসলমান, খৃষ্টান ও অন্যান্য জাতির মধ্যে নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা-পদ্ধতি ও পাঠ্যপুস্তকাদি যে যার ধর্ম্মে একই প্রকার। খৃষ্টধর্ম্মের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল, মুসলমান ধর্ম্মে কোরাণ এবং শিখধর্মে গ্রন্থসাহেব ও ব্রাহ্মধর্মে উপনিষদ। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছায় ভারতের প্রাচীন সনাতন ধর্মে বহু বৈচিত্র্যের মধ্যে একেরই অনুসন্ধান, একই সর্ব্বেশ্বরের উপাসনা। 

Advertisement

জ্যোতির্ময় নন্দের ‘উপাসনা-বিজ্ঞান’ থেকে

সম্পর্কিত সংবাদ