Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বিপন্ন পেশা, তবু আজও তাহেরপুরের শিল্পীরা সরায় তুলির টানে সৃষ্টিতে মগ্ন

বিপন্ন পেশা, তবু আজও তাহেরপুরের শিল্পীরা সরায় তুলির টানে সৃষ্টিতে মগ্ন
  • ৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: কৃষ্ণনগরমুখী কালো কুচকুচে পিচ রাস্তা থেকে ঢালু পথ নেমে গিয়েছে নীচে। জায়গাটার নাম তাহেরপুর এ ব্লক। যেখানে আজও নদীয়ার মৃতপ্রায় এবং অনালোচিত এক হস্তশিল্প অতিকষ্টে ধরে রেখেছে তার প্রাণবায়ু। ছিমছাম দর্শন কাঁচা-পাকা বাড়িগুলিতে উঁকি দিলেই নজরে আসে বিপন্ন শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে আজও চর্চার অভাব নেই। মাটির সরায় শিল্পীর একাগ্রচিত্তে টান দেওয়া তুলির আঁচড় ফুটিয়ে তুলছেন প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন বঙ্গের সংস্কৃতিকে।
Advertisement
বাংলার বহু অংশেই মাটির সরায় চিত্রণ বা দেবদেবীর প্রতিকৃতি অঙ্কন উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এহেন শিল্পে সমৃদ্ধ এলাকা বর্তমান নদীয়া জেলাতেও। অথচ প্রচারের অভাবে সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি মূল্যায়নই করতে পারল না জেলার দক্ষিণাংশের উপশহর তাহেরপুরের সৃষ্টিকে। সরার চাহিদা কমে যাওয়া, নতুন প্রজন্মের আগ্রহ হারানো, সরকারি উদ্যোগের অভাব সহ অন্তত আধ ডজন কারণে তাহেরপুরের সরা শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। কেমন এই অঞ্চলের সৃষ্টির অন্দরমহল? দেখা গেল, তাহেরপুরের সরায় ছাপ রয়েছে ফরিদপুরী এবং সুরেশ্বরী সরার। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আসা এই অঞ্চলের মানুষজনের মধ্যে সংস্কৃতির আদানপ্রদানে মিলেমিশে গিয়েছে সরায় আঁকা ছবিগুলি। যদিও সুরেশ্বরী সরার ছোঁয়াই বেশি তাহেরপুরে। কিন্তু একাধিক কারণে ধুঁকছেন এখনকার শিল্পীরা। একসময় শতাধিক শিল্পীর বাস থাকলেও আজ এ ব্লকের ২৫ নম্বর রোড সংলগ্ন পালপাড়ায় এই শিল্পকে আঁকড়ে বেঁচে রয়েছেন বড়জোড় জনা পনেরো পরিবার। স্থানীয় শিল্পী সুজিত পালের কথায়, সারা বছর কাজ করে হাজার দশেক সরা তৈরি করাই সম্ভব হয়। মেরেকেটে তা বিক্রি হলে আয় কোনওভাবেই লাখ দেড়েকের বেশি যায় না। অগত্যা, শিল্প ছেড়ে দিনমজুরের কাজে ভিন দেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সরকারি সুযোগ সুবিধা কিছুই নেই। ফলে বছরভর চড়া সুদে ধার নিতে হয় টাকা। হাজার টাকা পিছু ৫০ টাকা সুদ গুনতে গিয়েই কত শিল্পীর ঘটি বাটি বিকিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। যেহেতু তাহেরপুর নিয়েমাতামাতি নেই, তাই নেইব্র্যান্ডিংও। ফলে ঢালাও চাহিদার জায়গাও তৈরি হয় না। ওরই মধ্যে এখানকার সরা কলকাতা, শিলিগুড়ি, এমনকী অসম থেকেও মহাজনরা এসে সস্তায় কিনে নিয়ে যান। 
এলাকার শিল্পীদের কথায়, এখানকার লক্ষ্মী সরায় তিন পুতুল, লক্ষ্মী নারায়ণ, সপরিবার দেবী দুর্গা, রাধাকৃষ্ণর ছবি আঁকার প্রচলন রয়েছে। এঁটেল-দোআঁশের মিশ্রণ ‘ঘাই’ তুলে তারপর ভিতের উপর সেই ঘাই বৈলা ঠুকে তৈরি হয় মাটির সরা। এরপর ফাল্গুন মাসে মুড়ি দিয়ে রাখা সরা পোড়ানো হয়। তারপর খড়িমাটি দিয়ে সাদা রং করে তাতে আঁকা হয় ছবি। যেহেতু দাম এবং চাহিদা কমেছে, সেহেতু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আর শিখছে না সরা আঁকা। 
তাহেরপুরের এই ক্রম বিলুপ্ত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই বড়সড় প্রশাসনিক উদ্যোগ। বিষয়টিকে সমর্থন করেই তাহেরপুর নোটিফায়েড এরিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান উত্তমানন্দ দাস বলেন, সরকারের উচিত এই শিল্পীদের নিয়ে কাজ করা। নাহলে আমাদের এলাকার অন্যতম ঐতিহ্যটাই হারিয়ে যাবে। তাছাড়া তাহেরপুরের সরা শিল্প প্রচারের আলোয় আনা অত্যন্ত দরকার। তাহলে অন্তত এখানকার শিল্পীরা একটু আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখবে এবং শিল্প সাধনা করতে পারবে।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ