তন্ময় মল্লিক: বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিজেপি। দেশের সবচেয়ে ধনী পার্টিও। শুধু নির্বাচনী বন্ডে বিজেপির তহবিলে জমা পড়া টাকার পরিমাণ ৬ হাজার ৬০ কোটি। এহেন বিজেপি উত্তরবঙ্গে বন্যায় ও ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেওয়ার জন্য রাস্তায় নেমে কৌটো নাচাচ্ছে। আর তাতেই বইতে শুরু করেছে কটাক্ষের বন্যা। কেউ বলছে, ফটোশ্যুটের প্রতিযোগিতায় দলের অন্য গোষ্ঠীকে টেক্কা দিতেই ত্রাণ সংগ্রহের নাটক। আবার কেউ বলছে, ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে বামেদের কাছে টানতেই তাদের কৌটো নাচানোর কৌশল নিয়েছে বিজেপি। উদ্দেশ্য যাই হোক, বিজেপির নয়া গিমিক রাজনীতির চর্চায় জুগিয়েছে নতুন মশলা। রাজনীতিতে ‘পারসেপশন’ শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নীতি, গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে সেই দলের প্রতি সাধারণ মানুষের একটা ধারণা তৈরি হয়।
সেই উপলব্ধির উপর ভিত্তি করেই মানুষ তার পছন্দের দলকে ভোট দেয়। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে তারাই ক্ষমতা দখল করে অথবা রাজ্যপাট ধরে রাখে। এটাই রাজনীতির নিয়ম। যেমন ধরুন, সিপিএম বোঝাতে চেয়েছিল তারা ক্ষমতায় এলে গরিব, খেটেখাওয়া মানুষের উপকার হবে। সেই লক্ষ্যেই তারা গ্রামে ঘুরে ঘুরে গরিব মানুষকে সংগঠিত করেছিল। কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকলে গরিবের কোনও উপকার হবে না, এটা বোঝাতে পেরেছিল বলেই বামেরা এ রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল। সরকার গঠনের পর সিলিং বহির্ভূত জমি ভূমিহীনদের বিলি করেছিল। খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করেছিল। তাতে বামেরা জোতদার ও পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে এবং গরিব মানুষের পক্ষে, এমন একটা ‘পারসেপশন’ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। তারই জেরে বামেরা দশকের পর দশক বাংলা শাসন করেছে। বাম আমলে রাজ্যে অনেক অঘটন ঘটেছে। অনেক অত্যাচার হয়েছে। অনেক নারকীয় ঘটনাও ঘটেছে। তা সত্ত্বেও তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়নি। কিন্তু টাটাদের গাড়ি কারখানার জন্য সিঙ্গুরের উর্বর কৃষিজমি কেড়ে নেওয়ায় সিপিএম সম্পর্কে প্রান্তিক মানুষের ধারণা বদলে যায়। খসে পড়ে গরিবের পার্টির তকমা।
রাজ্যে পালা বদলের পর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করে চাষিদের জমি তিনি ফিরিয়েও দিয়েছেন। কথা দিলে কথা রাখার সেই শুরু। তারপর তিনি চাষি, খেতমজুর, গরিব ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে একের পর এক সামাজিক প্রকল্প নিয়েছেন। সংখ্যাটা এই মুহূর্তে ৯০ ছাড়িয়ে সেঞ্চুরির পথে। ফলে সরকারের প্রতি রাজ্যের গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। বিগত ১৫ বছরে শাসক দলের বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতি সহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তোলপাড় হয়েছে রাজ্য রাজনীতি। কিন্তু তার প্রভাব ভোটে পড়েনি। কারণ এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার মনে করেন, এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাঁদের লাভ হবে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘অ্যান্টি ইনকামবেন্সি’ ফ্যাক্টর সেভাবে কাজ করে না। কিন্তু সিংহভাগ মানুষের ধারণা যেদিন বদলে যাবে, সেদিন এই সরকারকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। স্বয়ং ঈশ্বরও নয়।
বিজেপির কর্মসূচি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কেও দেশের মানুষের একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই বিজেপির লক্ষ্য। নেতৃত্ব অত্যন্ত সচেতনভাবে মানুষের মনে গেঁথে দিতে চাইছে, বিজেপি হিন্দুদের দল। তারা হিন্দুদের ভোটেই এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে চায়। তাই নেতাদের মুখে প্রধানমন্ত্রীর একদা প্রিয় ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’ স্লোগান শোনা যায় না। এখন বিজেপি নেতারা বলেন, ‘যো হামারা সাথ হাম উনকা সাথ’। তাই কোথাও কিছু হলে ধর্মকে জুড়ে দিয়ে তা থেকে ফায়দা লোটার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ধৃতদের নিয়েও সেই একই তাস খেলেছে।
অনেকে বলছেন, বিভাজনের রাজনীতি করে বাংলায় বড়জোর প্রধান বিরোধী দল হওয়া যায়, কিন্তু ক্ষমতা দখল অসম্ভব। সেটা হয়তো বঙ্গ বিজেপির একাংশ উপলব্ধি করেছে। তাই সিপিএমের কৌশল নিয়েছে। একটা সময় রাজ্যে, এমনকী ভিনরাজ্যে কোনও বিপর্যয় ঘটলে সিপিএমের নেতা ও কর্মীরা কৌটো হাতে রাস্তায় নেমে পড়তেন। ক্ষমতায় থাকার সময় সিপিএম নেতারা কৌটো নিয়ে রাস্তায় নামলে শুধু বাম সমর্থকরাই নয়, সাধারণ ব্যবসায়ীরাও হাসিমুখে সাহায্য করতেন। উদ্দেশ্য, সিপিএমের ‘গুডবুকে’ থাকা। তাঁরা বুঝেছিলেন, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়। ত্রাণের জন্য অর্থ সংগ্রহের আর একটি উদ্দেশ্য ছিল, জনসংযোগ বজায় রাখা। তবে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিপিএম আর সেভাবে কৌটো নিয়ে রাস্তায় নামে না। কারণ এখন আর কেউ হাসিমুখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না, উল্টে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।
উত্তরবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার জন্য বিজেপিও কৌটো নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। এসইউসি, সিপিআই(এমএল) এর মতো দলগুলো নামলে কোনও সমালোচনা হতো না। কিন্তু নেমেছে
বিজেপি। দেশের সবচেয়ে ধনী পার্টি। তাই বিজেপিকে হজম করতে হচ্ছে তীব্র কটাক্ষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষের বন্যা বইছে। কেউ বলছেন, ‘বামেরা কৌটো নাচিয়ে নাচিয়ে রাজনৈতিকভাবে ভিখারি হয়েছে। এবার বিজেপি শূন্যে নামার জন্য বামেদের রাস্তা নিয়েছে।’ আবার কেউ লিখেছেন,‘বিজেপির সাংসদ, বিধায়করা নিজেদের বেতনের টাকা দিতে পারতেন কিংবা দিল্লিতে গিয়ে উত্তরবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্তদের
জন্য আর্থিক সাহায্য নিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু
তা না করে রাজনীতি করছেন।’ আবার কেউ লিখেছেন, ‘সবচেয়ে ধনী পার্টির নেতারা এই নাটক না করলেই পারতেন।’
স্বাভাবিক প্রশ্নটি হল, বিজেপি হঠাৎ করে কৌটো নিয়ে রাস্তায় নামল কেন? বাংলায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় এই প্রথম নয়। এর আগে অনেক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে রাজ্য। কিন্তু কোনও সময় তারা ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেওয়ার জন্য রাস্তায় নামেনি। এমনকী, করোনার সময় মানুষ চরম দুর্গতির শিকার হলেও বিজেপি নেতাদের টিকি দেখা যায়নি। কিন্তু এবার ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেওয়ার জন্য বিজেপি রাস্তায় নেমেছে।
কারণ, দুয়ারে ভোট।
ভোট এলেই শুরু হয়ে যায় বিজেপির গিমিকের রাজনীতি। দলিতের বাড়িতে খাওয়া, বাউল গান শোনা, মুষ্ঠিভিক্ষার মতো নানান কর্মসূচি নিয়ে থাকে। ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণের জন্য কৌটো নাচানো সেই গিমিকেরই অঙ্গ। পাশাপাশি এটাও ঠিক, তারা জনসংযোগ বাড়াতে চাইছে। একের পর এক নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ায় বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের মনোবল তলানিতে। দিল্লির সদস্য সংগ্রহের বেঁধে দেওয়া টার্গেটের ধারে কাছে পৌঁছতে পারেনি বঙ্গ বিজেপি। এমনকী, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে রাজ্য কমিটি তৈরি করতে পারেনি। ফলে সংগঠনের অবস্থা খুবই
করুণ। পার্টি অফিসগুলিতে লোকজনও সেভাবে আসছে না। বাংলায় বিজেপির আস্ফালন শুধু মিডিয়ায়। এই অবস্থায় রাস্তায় নেমে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করতে চাইছে নেতৃত্ব।
এছাড়াও একটা বড় কারণ রয়েছে, তা হল সিপিএমের ভোটারদের আরও বেশি করে কাছে
টানা। বিজেপি নেতৃত্ব জানে, বামেদের ভোট শিফ্টিংয়ের দৌলতেই তারা এ রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল। কিন্তু, একুশের পর হওয়া প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে বিজেপির ভোট কমেছে এবং বামেদের ভোট বিক্ষিপ্তভাবে হলেও বেড়েছে। তাই ছাব্বিশের আগে বিজেপি সেই ভোটারদের ফের টানতে বামেদের কৌশলকেই হাতিয়ার করছে। তারা বোঝাতে চাইছে, রাম ও বামের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। কিন্তু বিজেপির সেই কৌশলও মানুষ ধরে ফেলেছে। তাই ক্ষতিগ্রস্তরা ত্রাণ নিতে অস্বীকার করছেন। তাঁরাও বুঝেছেন, ভোট আসছে বলেই বিজেপি ত্রাণ দিচ্ছে। ভোট মিটলে টিকিও দেখা যাবে না। তাই আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষগুলোও ত্রাণ দিতে আসা বিজেপি নেতাদের মুখের উপর ‘না’ বলে দিচ্ছে। এটা বিজেপির জন্য অবশ্যই অশনি সংকেত।
সিপিএমের স্টাইলে রাস্তায় কৌটো নাচানোয় বিজেপিকে তীব্র কটাক্ষ হজম করতে হচ্ছে।
কিন্তু তাতে তাদের হেলদোল নেই। কারণ নেতা
তৈরি অপেক্ষা অন্যের দল ভাঙিয়ে ‘রেডিমেড
নেতা’ হাইজ্যাক করতেই তারা বেশি পছন্দ করে। উদাহরণ মহারাষ্ট্র, অসম, বাংলা...। আবার
সঙ্কটে পড়লে নকল করে অন্য দলের কৌশলও। বিজেপির মুখে আত্মনির্ভরতার বুলি। কিন্তু পরনির্ভরতাই তাদের সম্বল। আসল সত্যিটা হল, বিজেপির সবটাই ধার করা।