আত্মধর্ম মানবকে স্বাধীন করে এবং দেহধর্ম অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ধর্ম বা পরধর্ম মানবকে পরাধীন করে। কারণ ভোগ বাসনা প্রভৃতি দেহের জিনিস। প্রাণ চঞ্চল হয় বলে ইহারা দেহের মধ্যে জন্মায়, আবার দেহের নাশের সঙ্গে এদেরও নাশ হয়। দেহটা অসৎ অর্থাৎ অনিত্য, তাই দেহধর্ম বা ইন্দ্রিয়ধর্মও অনিত্য। কাজেই দেহের ভোগে রত থাকলে জন্মমৃত্যুশীল দুঃখময় জীবন ভোগ করতে হয়, শান্তিময় অমর জীবন লাভ হয় না। কিন্তু আত্মা স্বপ্রকৃতি সৎ; তাঁর জন্ম মৃত্যু নেই, তিনি নিত্য, অব্যয়, অবিনাশী। তাঁর আশ্রয় নিলে আর জন্ম-মৃত্যু হয় না, অমর জীবন প্রাপ্তি হয়। এই দেহের গ্রহণ বা ত্যাগ উভয়ই আত্মার জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নূতন বস্ত্র গ্রহণের মত। এজন্য স্বধর্ম অর্থাৎ আত্মধর্ম লক্ষ্য করে শোক করতে নেই। সকলেরই উচিত চরিত্রবান্ হয়ে প্রাণকর্মরূপ সাধন সংগ্রামে রত হওয়া, তা হলে স্বর্গ লাভ হয়, আর জয়ী হলে মোক্ষ বা স্বাধীনতা লাভ হবেই হবে। অসংযম, অনিয়ম ও ভোগবাসনা নষ্ট করলে পাপ হয় না। ঐগুলি নাশের জন্য যে ধর্মযুদ্ধ বা সাধনসমর তা ধর্মসঙ্গত। বরং উহা না করলে কীর্তিনাশ ও পাপ হয় এবং জন্মমৃত্যুশীল দুঃখ ভোগ করতে হয়। এজন্য বিচার পূর্বক সংযমী ও নিয়মী হয়ে চরিত্রবান্ হতে হয়। চরিত্রবান্ হলে দেহেন্দ্রিয় সকল আত্মকর্ম সাধনে সমর্থ হয়। অতএব অসংযম, কুবাসনা, ভোগ ইত্যাদিগুলিকে ত্যাগ করলে অর্থাৎ ইন্দ্রিয় বা রিপুদের তাড়নায় না চললে সর্বনাশ হবে এই মিথ্যা ভাবনা ভেবে বৃথা শোক করা উচিত নয়। ইন্দ্রিয়ধর্মে আসক্ত থাকলেই পাপ, আসক্ত না থাকলে পাপ নেই।
হৃদয়দৌর্বল্য পরম ক্ষতিকারক, তাই শ্রীভগবান্ অর্জুনকে উপলক্ষ্য করে সমগ্র মানবকে বললেন:—
ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্বষ্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্ব্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ।।
অর্থাৎ হে পার্থ, কাতরতা প্রাপ্ত হয়ো না। ইহা তোমার যোগ্য নয়; হে পরন্তপ, ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য ত্যাগ করে উত্থিত হও।
অর্জুন ক্ষত্রিয় অর্থাৎ যার রজোগুণ প্রধান সেই ক্ষত্রিয়। তার কাজ শত্রুগণের সহিত অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণের সহিত যুদ্ধ করে সত্ত্বগুণ বিশিষ্ট হতে চেষ্টা করা। ইন্দ্রিয়গণই সাধন পথের শত্রু। তারাই জীবকে বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে রাখে এবং জীব সেই ইন্দ্রিয়দের ভোগকেই নিজের ভোগ মনে করে। মনোবলের অভাবেই জীব বায়ুতাড়িত পত্রের ন্যায় এদিক ওদিক করে বেড়ায়। তার কখনও বিষয় ভাল লাগে, আবার কখনও বিষয় ত্যাগ করে ভগবানকে পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ক্ষত্রিয় ভাবাপন্ন সাধকের অর্থাৎ রজোগুণ প্রধান সাধকের প্রাণকর্মরূপ সাধন সমরে কাতরতা শোভা পায় না, তাই ভগবান্ বলছেন—ইহা তোমার যোগ্য নয়। হে পরন্তপ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়রূপ শত্রুগণের দমনকারী, তুমি ক্ষুদ্র অর্থাৎ তুচ্ছ হৃদয়দৌর্বল্য ত্যাগ কর অর্থাৎ শ্বাস ঢিলা করায় বা শ্বাসের বহির্মুখী গতি প্রাপ্ত হওয়ায় হৃদয়ের যে দুর্বলতা হয়েছে তা ত্যাগ করে ঊর্ধ্বে অর্থাৎ আজ্ঞাচক্রে কূটস্থে স্থিতিলাভ করবার জন্য সর্বপ্রকারে সচেষ্ট হও অর্থাৎ প্রাণকর্মরূপ সাধন সমরে লিপ্ত হও, তা হলেই উত্থিত অর্থাৎ ঊর্ধ্বে আজ্ঞাচক্রে বা কূটস্থে স্থিতিপ্রাপ্তি হবে।
অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রাণময়ং জগৎ’ থেকে