সংবাদদাতা, কাটোয়া: বৃহস্পতিবার নদীয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভার উপ নির্বাচন হয়ে গেল। তার জন্য পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম লাগোয়া গ্রাম থেকে ভোটারদের পারাপার করছিলেন নৌকার মাঝি। আচমকা নৌকা থেকে ভাগীরথীতে পড়ে তলিয়ে গেলেন তিনি। ঘটনার পর নৌকায় থাকা মাঝির বাবা সে সময় হাল ধরে যাত্রীদের বাঁচান। ছেলে তলিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি যাত্রীদের নিরাপদে পারাপার করান। মর্মান্তিক ঘটনার পরেই ভাগীরথী জুড়ে পূর্ব বর্ধমান ও নদীয়া জেলার বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী তল্লাশি শুরু করেছে। দুই জেলার পুলিসও নদী পাড়ে রয়েছে।
পুলিস জানিয়েছে, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মাঝির নাম লালন হালদার (৩৬)। তাঁর বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার নলিয়াপুর গ্রামে।
পুলিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নদীয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনের জন্য এদিন পূর্ব বর্ধমান জেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বহু গ্রামের বাসিন্দা নৌকা করে পারাপার করেছেন। ভোটাররা কালীগঞ্জের গোবরা অঞ্চলের ফুলবাগানের ২৫২ নম্বর বুথে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন কেতুগ্রাম লাগোয়া শিলুড়ির চর গ্রাম থেকে। বুথটিতে মোট ৯৩৭ জন ভোটার। তারমধ্যে ২৮০ জন ভোটার বিচ্ছিন্ন গ্রাম হিসাবে পরিচিত শিলুড়ির চরে থাকেন। এদিন লালন হালদার নৌকা করে শিলুড়ির চর থেকে কালীগঞ্জের ফুলবাগান যাচ্ছিলেন ভোটারদের নিয়ে। সঙ্গে তাঁর বাবা রতন হালদারও ছিলেন। নৌকায় প্রায় ৫০-৬০ জন যাত্রী ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। মাঝনদীতে নৌকা যেতেই আচমকা জলে পড়ে যান লালন। এরপরেই যাত্রীদের চিৎকার শুনে নৌকায় থাকা তাঁর বাবা রতনবাবু এসে নৌকার হাল ধরেন। কিন্তু নৌকা আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছিলেন না৷ কারণ তাঁর হাতে তখন অনেক মানুষের জীবন রয়েছে। ছেলে তলিয়ে যাওয়ার শোক বুকে চেপেও তিনি কোনওরকমে পাড়ে নৌকা ভিড়িয়ে দেন।
এরপরেই নদীয়া জেলার বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে খবর দেওয়া হয়। স্পিড বোট নামানো হয়। পাশাপাশি পূর্ব বর্ধমান জেলাতেও একই টিম নদীতে তল্লাশি চালানো শুরু করে। কেতুগ্রাম-২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বিকাশ বিশ্বাস নিজে সীতাহাটি পঞ্চায়েত প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে নৌকা করে নদীতে খুঁজতে যান লালনকে। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি।
কেতুগ্রামের নলিয়াপুরের বাসিন্দা রতন হালদারের দুই ছেলে। লালন ও সাগর। লালন বাবার সঙ্গে নদীতে নৌকা করে খেয়া পারাপার করেন। সেখান থেকে যা আয় হয়, তাই দিয়ে সংসার চালান। লালনের বাবা বলেন, ছেলের মৃগীরোগ ছিল। নৌকায় মাথা ঘুরে গেল কি না বুঝতে পারছি না। আমি চিৎকার শুনে দেখি, ছেলে নৌকায় নেই। তখন ফিরে আসতেও পারছি না মাঝ নদী থেকে। আবার ছেলের তলিয়ে যাওয়ার কষ্ট বুকে চেপে যাত্রীদের কোনওরকম নদীর পাড়ে পৌঁছে দিই। আমার হাতে তখন অনেক মানুষের জীবন যে!
এদিন ছেলে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা বিশাখাদেবী। মামা মৃণালকান্তি হালদার বলেন, ভোটের জন্যই ছেলেটা নৌকা নিয়ে বেরিয়েছিল। যদি কিছু আয় হয়। কিন্তু এভাবে দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, বুঝতে পারিনি।