নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: এসআইআরের মূল ভিত্তি বর্ষ ২০০২ সাল। ওই বছর ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের আর কোনও নথি লাগবে না। অথচ, সেই তালিকায় নাম নেই খোদ বিএলওর! খুঁটিয়ে দেখে নজরে পড়েনি তাঁর বাবা-মা সহ গোটা পরিবারের কারও নামও! এমন বিরল উদাহরণ মিলেছে নদীয়ার শান্তিপুরে। এখানকার বিএলও হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন প্রাথমিক স্কুলশিক্ষক রজনীকান্ত পাল। তাঁর নাম এসআইআরের ভিত্তি বর্ষের ভোটার তালিকাতেই নেই। ঘটনাটি জানাজানি হতেই তুমুল শোরগোল পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এমন পরিচয়ের বিএলও কীভাবে বৈধ ভোটার যাচাই করবেন? স্বাভাবিকভাবেই রজনীকান্তবাবুকে নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে বিডিও’কে কাঠগোড়ায় তুলেছে বিজেপি। যদিও রজনীকান্তবাবু বলেছেন, ‘২০০২ সালে আমার বাবা এখানে থাকতেন না। তাই ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। আর আমার বয়স তখন আঠারো হয়নি। সেই কারণে আমারও নাম নেই। গোটা বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছি।’
মঙ্গলবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ জাতীয় নির্বাচন কমিশন। প্রথম পর্বে তাদের নির্দেশিকা ছিল, সরকারি কর্মী এমন কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে বুথ লেভেল অফিসার পদে। সেই মতো প্রতিটি ব্লকেই স্কুলশিক্ষক অথবা সরকারি কর্মীদের বিএলও হিসেবে নিয়োগ পত্র দেয় প্রশাসন। পরে পৃথক একটি নির্দেশিকা জারি করে কমিশন জানায়, সংশ্লিষ্ট বিএলওর নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকতে হবে। অথবা, তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম থাকতে হবে।
রজনীকান্তবাবু বেলগড়িয়া ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ফুলিয়া পাড়ার বাসিন্দা। স্থানীয় কালিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তিনি। স্থানীয় ১৮৫ নম্বর বুথের বিএলও হিসাবে তাঁকে নিয়োগ পত্র দিয়েছে ব্লক প্রশাসন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই রজনীকান্তবাবুর। ভোটার তালিকায় তাঁর নাম উঠেছে ২০১৪ সালে। সে ক্ষেত্রে তাঁর বাবা অথবা মায়ের নাম থাকার কথা আগের তালিকায়। অদ্ভুতভাবে সেই তালিকায় মেলেনি রজনীকান্তবাবুর বাবা অথবা মা কিংবা পরিবারের অন্য কারও নামই। এদিন, রজনীকান্তবাবু অবশ্য ২০০২ সালে তাঁর বাবা-মা কোথায় থাকতেন, তা স্পষ্ট করেননি।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরেই জলঘোলা শুরু হয়। যাচাই প্রক্রিয়া কতটা বৈধভাবে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক আক্রমণে নামে বিজেপি। নদীয়া দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলা বিজেপির মুখপাত্র সোমনাথ কর বলেন, ‘শান্তিপুর ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক (বিডিও)-এর উচিত ছিল যাচাই করে বিএলওদের দায়িত্ব দেওয়া। যাঁর নিজের নাম থাকার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে, তাঁকে দিয়ে এসআইআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ স্বচ্ছ ভাবে সম্ভব নয়।’ পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছে তৃণমূল। শান্তিপুরের তৃণমূল বিধায়ক ব্রজকিশোর গোস্বামী বলেন, ‘শুধু একজন বিএলও কেন, আগামীদিনে এরকম অনেকের নামই সামনে আসবে। তা হলেই বোঝা যাচ্ছে, যাঁরা এই কাজ করবেন, তারাই নাকি আইন অনুযায়ী অবৈধ! অথচ, এই ব্যক্তি তো রাতারাতি শান্তিপুরে চলে এসে নাম তোলেননি। তিনি একটি সরকারি চাকরি করছেন। তাঁর কাছে নিশ্চয়ই পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং কাগজপত্র রয়েছে।’ বিডিও সন্দীপ ঘোষ বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রথমে নির্দেশিকা এসেছিল সরকারি কর্মচারীদেরকেই বিএলও হিসেবে নিয়োগপত্র দিতে হবে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকা নাম থাকা নিয়ে নির্দেশিকা পরে এসেছে। ততক্ষণে বিএলও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তাদের কাছে সেই তালিকা পাঠানো হয়েছে। রাজনৈতিক দলের তরফে যে দাবি তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’