ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এখন মধ্যগগনে। ইউনিউমারেশন (গণনা) ফর্ম বিলি প্রায় শেষ। এখন পুরোদমে চলছে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ভরা ফর্ম সংগ্রহের কাজ। এরপর বিএলওরা সেগুলি যাচাই করার পর প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) পোর্টালে আপলোড করবেন। তার আগে কমিশনের নির্দেশমতো অবশ্যই ঝাড়াই বাছাই করতে হবে। এসআইআর ২০২৫ অনুসারে যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা তৈরি হবে সেখানে কাদের জায়গা হবে এবং একেবারে হবে না, তার স্ট্যান্ডার্ড বা মাপকাঠি ইসিআই ঠিক করে দিয়েছে। নির্দেশ মেনে চূড়ান্ত কাজটি করবেন বিএলওরা। ইসিআই বারবার জানিয়েছে, এই ব্যাপারে তাদের সর্বক্ষণের নজরদারিও আছে। আর এখানেই বিরাট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিএলওদের। প্রতিটি ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে বিএলওদের হাতে। এই উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই বিশেষ বদল আনা হয়েছে বিএলও অ্যাপে। এই অ্যাপ মারফত গণনা ফর্ম ডিজিটাইজ করছেন তাঁরা। সেখানে এবার একটি বিশেষ ‘অপশন’ দেওয়া হয়েছে। তার মাধ্যমে বিএলওরা পূরণ করা ফর্মগুলি ফের যাচাই করতে পারবেন। প্রয়োজনে সংশোধন তো বটেই, ওইসঙ্গে কোনও ভোটারকে ‘আনম্যাপ’ও করে দিতে পারবেন তাঁরা। সোজা কথায়, কোনও পূরণ করা ফর্ম আপলোড করার সময় খটকা লাগলে সেটি ফের যাচাইসহ সংশোধন করার ছাড়পত্র পেলেন তাঁরা। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ভোটারের ম্যাপিংয়ের (শেষ এসআইআরের বছরের ভোটার তালিকায় সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম) ক্ষেত্রে ভুল হয়ে থাকলে তা বাতিল করার ক্ষমতা থাকছে তাঁদের হাতে। কিছু বিএলওর বক্তব্য ছিল, কোনও ভুল সংশোধনের সুযোগ অ্যাপে নেই। অথচ তার জন্য বিএলওদের উপর শাস্তির খাঁড়া ঝোলানো থাকছে! এর সুরাহা করতেই অ্যাপে এই বিশেষ পরিবর্তন।
বিএলওদের এই ক্ষমতাকে স্বাগত জানানোই যায়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা অন্য প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। তা থেকে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের অবকাশ। এই অপশনটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না তো? যেমন বিহারে বহু যোগ্য ভোটারকে ‘মৃত’ কিংবা ‘রাজ্যছাড়া’ দেখানো হয়েছিল! ফলে খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৬৫ লক্ষ নাম। সর্বাধিক ছাঁটাই হয়েছিল সীমান্ত এলাকায়। অন্তত ৮০টি বিধানসভা ক্ষেত্রে পঞ্চাশের কম বয়সি বহু ভোটারকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছিল। ভাগলপুরে একটি পোলিং স্টেশনের এমন ৫৬ জন বঞ্চিত ভোটারের মধ্যে ৫০ জনেরই বয়স পঞ্চাশের নীচে। শেষমেশ শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপে বেশিরভাগ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য হয় ইসিআই। শুধুমাত্র পূর্ণিয়াতেই খসড়া তালিকায় প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার ভোটারের নাম বাদ যায়। যদিও চূড়ান্ত তালিকায় তার থেকে ৮৩ হাজার নাম ফের ঢোকাতে হয়েছে কমিশনকে। এই ইশ্যুতে ইসিআই কতখানি চাপে পড়েছিল, খসড়া এবং চূড়ান্ত তালিকার মধ্যেকার পার্থক্যটাই তার প্রমাণ। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪৭ লক্ষে। অর্থাৎ, ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে উঁকি দিচ্ছে এই ঝক্কিটাই।
তাই রাজ্যবাসীর দাবি, বিএলওরা যেন কোনোভাবেই কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষ অবলম্বন না করেন। এই পবিত্র তাঁদের কাজটি সুসম্পন্ন করতে হবে পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে। তাঁদের কাছে এই প্রত্যাশা থাকবে যে, তাঁরা অনাবশ্যক ক্ষমতা জাহির করতে যাবেন না। পর্যাপ্ত নথি-প্রমাণ এবং যুক্তি থাকা সত্ত্বেও কোনও তুচ্ছ বাহানায় প্রকৃত ভোটারকে তাঁরা যেন বাদ না দেন। একইসঙ্গে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের চাপে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় ঢুকিয়ে দিলেও তা হবে অন্যায়। যার বা যাদের নাম নিয়ম অনুযায়ী বাদ যাওয়া জরুরি তাদের নাম যেন কোনোভাবেই না রয়ে যায়। বিশেষ করে ‘মৃত’ ভোটার এবং ‘ডুপ্লিকেট’ ভোটারদের এসআইআর ২০২৫ তালিকা থেকে অবশ্যই ছেঁটে ফেলতে হবে। তা না-হলে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কোনও মানে থাকবে না। একদিকে যেমন প্রকৃত ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ সুনিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে সর্বতোভাবে রুখে দিতে হবে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভোট জালিয়াতির অপচেষ্টা। গণতন্ত্রের মানোন্নয়নের জন্যই এটা জরুরি। মনে রাখতে হবে, এই ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই আগামী দিনে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকারগুলি গঠিত হবে। সরকারগুলিকে মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠতে হলে নির্বাচনব্যবস্থা বা গণতন্ত্রের গোড়ার গলদ দূর হওয়া আবশ্যক। সেই প্রাথমিক অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি আজ ইসিআই নিযুক্ত বিএলওদের কাঁধে ন্যস্ত।