Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বিক্ষোভের মুখে ইছালাবাদে ছেড়ে স্বঘোষিত সাধ্বী ‘আবির্ভুতা’ নান্দরায়

বিক্ষোভের মুখে ইছালাবাদে ছেড়ে স্বঘোষিত সাধ্বী ‘আবির্ভুতা’ নান্দরায়
  • ১১ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
সুখেন্দু পাল, নান্দরা: কথায় বলে, প্রচার-মাহাত্ম্যে জড়বস্তুও ভগবান স্বরূপ! এখন তো আবার সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। গোটা দুনিয়া ‘মুঠঠি মে!’ কিছু একটা পোস্ট করলেই হল। একটু অন্য স্বাদের হলে বিশ্বে ভাইরাল। আর সেটা যদি হয় স্রেফ ‘জিয়নকাঠি’তে কঠিন কোনও রোগ সারানোর আশ্বাস, তা হলে তো আর কথাই নেই! এই সুন্দর পৃথিবীতে কে না বাঁচতে চায়? অতঃপর, ‘জিয়নকাঠি’র ধারকের কাছে ভক্তের ঢল, প্রণামীর ছড়াছড়ি! 
Advertisement
ঠিক যেভাবে বর্ধমানের নান্দরার কাছে বালিয়ারা গ্রামে ‘আবির্ভুতা’ হয়েছেন স্বঘোষিত এক সাধ্বীর। মহিলা এই সাধিকার বয়স মেরেকেটে চল্লিশ। হাতে ধরা ত্রিশূল। সামনে কয়েক’শো ভক্ত। কেউ এসেছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল থেকে। কেউ আবার দমদম থেকে। মহিলা বিড়বিড় করে কারও দিকে জবাফুল ছুড়ে দিচ্ছেন। কারও কপালে ত্রিশূল ঠেকিয়ে দিচ্ছেন। এটাই তাঁর ‘জিয়নকাঠি’। ছুঁয়ে দিলেই নাকি রোগমুক্তি। ভক্তভিড়ে মিশে সাধ্বীর কিছু বিশ্বস্ত অনুচর। সবার হাতে দামি অ্যানড্রয়েড মোবাইল। ক্যামেরা অন। সাধ্বী ‘মা’য়ের মহিমার ভিডিও হচ্ছে। পোস্ট হবে। ভিডিওগুলি কয়েকদিন লাফালাফি করবে সোশ্যাল মিডিয়ার একাধিক প্ল্যাটফর্মে। এরপর শুধুই মোক্ষলাভ! 
তবে, ভক্তদের রোগমুক্তির মোক্ষলাভ কতখানি হয়, সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন। কিন্তু সাধিকা ও তাঁর চ্যালাদের প্রণামী বাক্স যে মোক্ষলাভে উপচে ওঠে, সেটা চাক্ষুস প্রমাণিত। কেউ ৫০০ টাকার নোট ঢোকাচ্ছেন। কেউ আবার পাঁচ হাজার টাকা। কেউ কেউ আবার অ্যাকাউন্টে হাজার হাজার টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বালিয়ারা গ্রামের বাসিন্দারা বলছিলেন, ‘দিনের শেষে কমকরে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয়।’ 
কে এই স্বঘোষিত সাধ্বী? বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, এই মহিলা বিবাহিত। একদা একটি চিটফান্ড সংস্থায় কাজ করতেন। সেটি এখন বন্ধ। তার পর থেকেই তাঁর এই সাধিকার বেশ। স্বঘোষিত ধর্মমাতা বলেও অনেকে বলে থাকেন। কিছুদিন আগে তিনি ‘আবির্ভুতা’ হয়েছিলেন বর্ধমানের ইছালাবাদে। সেখানে মহিলার টোটকা অব্যর্থ কাজ করেনি। তাঁর কাছে রোগমুক্তির আশায় এসে হতদ্যোম হয়েছেন সকলেই। প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে ইছালাবাদ ছাড়েন। এখন বালিয়ারা গ্রামে ডেরা বেঁধেছেন। সেখানে মাঠে রোজ মেলা বসছে। তারাপীঠের আদলে ‘ডালার’ দোকান খুলেছেন। দূর থেকে দোকানিরা দর হাঁকছেন। ভক্তরা ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে সেই ডালা কিনছেন। মহিলার দাবি, যে রোগ কোথাও সারে না, সেটা তিনি সারিয়ে দেবেন। তাঁর কাছে এলে সবার স্বপ্নপূরণ হবে। সবাই বিশ্বাস করে ভিড় করছেন। শনি ও মঙ্গলবার সাধিকার কাছে ঘেঁষে সাধ্যি কার! 
বালিয়ারা গ্রামের বাসিন্দা গৌর সিংহ বলছিলেন, ‘স্থানীয় লোকজন কেউ তেমন জানেন না। সোশ্যাল মিডিয়ার ওঁর লোকজনরা এইসব নিয়ে প্রচার করেন। তা দেখেই সবাই ছুটে আসছেন। ক’দিন আগে গ্রামের এক ব্যক্তি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওঁর অলৌকিক ক্ষমতা থাকলে তো বাঁচিয়ে দিতে পারতেন! শুধু প্রচারেই ওঁর এই মাহাত্ম্য।’ পাশে দাঁড়িয়ে আর এক গ্রামবাসীর সংযোজন—‘এসব বুজরুকি ছাড়া কিছুই নয়। ধন্যি মানুষজন!’
ঘাটাল থেকে সাধিকার কাছে এসেছেন অনিমেষ মেটিয়া। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলছিলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় ওঁর ভিডিও দেখে এসেছি। এসেও ভাল কিছু বুঝতে পারছি না। আর আসবে না।’ পূর্ব বর্ধমান জেলাপরিষদের জনস্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘এভাবে রোগ সারানো যায় না। উনি কেন এমন করছেন বুঝতে পারছি না। প্রশাসনের বিষয়টি দেখা উচিত।’ জেলার এক পুলিস আধিকারিক বলেন, ‘ওই মহিলাকে এসব না করার জন্য বলা হয়েছে। সব কিছু বন্ধ করে চলেও গিয়েছিলেন। এখন আবার শুরু করেছেন শুনলাম। ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে মহিলার দাবি, আমি কাউকে আসতে বলি না। তারপরও সবাই আসেন। কাউকে তো আর ফেরাতে পারি না।’ 
ফেরালে যে প্রণামী বাক্স ভরবে না!—কটাক্ষ গ্রামবাসীদের। 
সম্পর্কিত সংবাদ