Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিজেপির রাজনীতি ভয়-নির্ভর, ভরসা স্রেফ জুমলা!

কুতুবুদ্দিন আনসারিকে মনে আছে? খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ২০০২ সালে গোধরার দাঙ্গায় বিপন্ন কুতুবুদ্দিনের হাতজোড় করা ভয়ার্ত ছবি দেশের অন্তরাত্মাকে শুধু আঘাতই করেনি, চুরমার করে দিয়েছিল।

বিজেপির রাজনীতি ভয়-নির্ভর, ভরসা স্রেফ জুমলা!
  • ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০

হিমাংশু সিংহ: কুতুবুদ্দিন আনসারিকে মনে আছে? খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ২০০২ সালে গোধরার দাঙ্গায় বিপন্ন কুতুবুদ্দিনের হাতজোড় করা ভয়ার্ত ছবি দেশের অন্তরাত্মাকে শুধু আঘাতই করেনি, চুরমার করে দিয়েছিল। ২৮ বছরের অসহায় যুবকের চোখেমুখে সেদিন আতঙ্ক আর মৃত্যুভয়। দু’গাল বেয়ে নেমে আসা জল শুকিয়ে মুখটা ধূসর। পাঁচ বছরের মেয়ে, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে মোদিরাজ্য গুজরাত ছেড়ে সেদিন আশ্রয় নিয়েছিল বাংলায়। তখনও মোদিজি প্রধানমন্ত্রী হননি, এক অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মাত্র, তবুও কী দাপট! বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ি সেদিন মোদি সরকারের ‘নির্মমতায়’ বিচলিত হয়ে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রিয় শিষ্যকে। তাতেও কাজ হয়নি। আরএসএস সংখ্যালঘু গণসংহারের পক্ষে দাঁড়িয়ে হিন্দুত্বের জয়গান গেয়েছিল। অগত্যা অসহায় কুতুবুদ্দিনকে বুক পেতে আশ্রয় দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, দিয়েছিল সুরক্ষা, হানাহানি এড়িয়ে বেঁচে থাকার বাস্তব ‘গ্যারান্টি’। আজ আড়াই দশক পর বাজপেয়িজি বেঁচে নেই। বিজেপিও আজ ব্যক্তিতন্ত্রের নিশ্ছিদ্র ঘেরাটোপে বন্দি। পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়েই সেদিনের ‘মৌত কা সওদাগর’ আজ মেকি পরিবর্তনের রাজনীতিতে সওয়ার। হরেক কিসিমের স্তোকবাক্য শোনাচ্ছেন নির্বাচনি জনসভায় দাঁড়িয়ে। দু’হাতে বিলোচ্ছেন ডজন ডজন গ্যারান্টি। বাহ রে বিশ্বগুরু! বাংলাকে অশান্ত করতে সকাল বিকেল হাওয়াই জাহাজে ছুটে আসছেন মন্ত্রী-সান্ত্রি সমেত। ‘নির্মম’ সরকার বলে তোপ দাগছেন অহরহ। প্রশ্ন একটাই, দাঙ্গার রক্ত যাঁর হাতে এখনও টাটকা, সংখ্যালঘুরা যে দলের ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, তাঁদের ভরসায় আশ্বস্ত হয়ে বাঙালি সমাজ আদ্যন্ত ফ্যাসিস্ট একটা শক্তিকে বিশ্বাস করবে? 

Advertisement

নির্মম সরকারের সংজ্ঞাটা ঠিক কী, তা ২০০২ সালের গোধরা দাঙ্গায় টের পেয়েছে দেশ। নোট বাতিলের কুনাট্যে, এসআইআরের লাইনে 
উপলব্ধি হয়েছে হাড়ে হাড়ে। জগদীপ ধনকারও জেনে গিয়েছেন হালে। বাঙালি সমাজ সেই একই ভুল করবে? অতি সম্প্রতি বিলকিস বানোর উপর অত্যাচারের নায়কদের রহস্যজনক মুক্তির পর জেলের বাইরে জমকালো সংবর্ধনার বহরেও মালুম হয়েছে এহেন দলের চালিকাশক্তি কোন মতাদর্শের কাছে বন্ধক রাখা আছে। এই সেই দল যারা সাভারকরকে স্থান দেয় দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর নেতাজিরও আগে। ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতাই যাদের রাজনীতির মূল মন্ত্র। বাঙালি অনেক ভুল করেছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে সেই একই পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয়! এই ভোট শুধু তৃণমূলের অস্তিত্ব রক্ষা কিংবা মমতার চতুর্থবার ক্ষমতায় আসার লড়াই নয়, বহিরাগতদের বিষ নজর থেকে বাংলাকে বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ।
গত ৬ মাস ধরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বাংলা বিরোধী চক্রান্ত চলছে। ট্রাইবুনাল কাজ করছে। আজও তা শেষ হয়নি, অথচ মনোনয়ন জমার শেষ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। কী হবে এই বাদ যাওয়াদের ভবিষ্যৎ? সুপ্রিম কোর্টে কি এবারের জন্য কোনো স্বস্তি মিলবে? চূড়ান্ত ধোঁয়াশা। কাল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের অপেক্ষা। সাধারণ নির্বাচকদের নিরাপত্তাই যাঁরা নিশ্চিত করতে পারে না, তাঁরা শোনাচ্ছেন মানুষকে ভরসা দেওয়ার আধাভৌতিক গল্প! আকাশে বাতাসে চোখ ধাঁধানো প্রচারে একটাই বার্তা, উনি নাকি ভয় কাটিয়ে সকলকে আস্থা জোগাবেন। ৯১ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার কুনাট্যে সত্যি কোন সুরক্ষা বাঙালি পেয়েছে, তা ভগবানেরও অজানা! ঘুসপেটিয়া ধরার নামে আঘাত করা হয়েছে মতুয়া, রাজবংশী, নমঃশূদ্রদের। এই বিপন্ন সময়ে মোদি-শাহ জুটি নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন, হাতে হাতে কাজ দেবেন! ‘সুনার বাংলা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। কিন্তু কীভাবে হবে, কবে হবে, তার নকশা কোথাও পাওয়া গিয়েছে? সিঙ্গুরে শিল্পস্থাপনের ব্লুপ্রিন্ট কোথায়? সংকল্প পত্রের নামে মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আর যুবসাথীকে টুকে দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে এক কোটি চাকরি দেওয়ার কথা বলে আবার গাজর ঝোলালেন। উলটে বাঙালির মাছ খাওয়া নিয়ে উঠতে বসতে কটাক্ষ। হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের পাশাপাশি মাছ খাওয়া ও আর না খাওয়াদের মধ্যেও সূক্ষ্ম বিভাজন তৈরির চেষ্টাও চলছে পাল্লা দিয়ে। সারা দেশে গড় মৎস্য উৎপাদন নাকি বাড়ছে, পিছিয়ে শুধু বাংলা। তর্কের খাতিরে তা মেনে নিলেও যে দল ক্ষমতায় আসার আগেই হুমকি দেয়, শাসায় তারা কী ভরসা জোগাবে, এই প্রশ্ন উঠবেই। পালা করে প্রায় প্রতিটি জনসভায় মোদিজি বলা শুরু করেছেন, একবার ক্ষমতায় এলে ‘চুন চুনকে হিসাব লেঙ্গে’। এই বুঝি তাঁর ভরসা জোগানোর আদর্শ উপায়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর মুখে ব্লক বাস্টার শোলের ডায়লগ নকল করে বদলার হুংকার বাঙালি মেনে নিতে তৈরি তো! একই নিঃশ্বাসে ভরসা আর বদলা চলতে পারে? এ কোন সংস্কৃতি আমদানির চেষ্টা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বাংলায়? 
সবকা সাথ সবকা বিকাশের নাটক অনেক হয়েছে বিগত ১২ বছর ধরে। সমাজটা কোনোভাবেই আর সব মত ও পথের মৃগয়াক্ষেত্র নয়, প্রত্যেকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি কোথাও। পদে পদে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন আর মেরুকরণের বিষ নিঃশ্বাস গিলে ফেলতে চাইছে সভ্যতাকে। বাংলা দূর অস্ত! আপনাদের সোনা দিয়ে গড়া হিন্দি বলয়ের রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র সর্বত্র সবকা সাথ সবকা বিশ্বাসের ফুল কি ফুটেছে বুকে হাত দিয়ে বলুন তো? না তার উদাহরণ দেখিয়ে বাংলার হৃদয় জয় করা সম্ভব? কিন্তু দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি, ধর্ষণ, খুন সত্ত্বেও হিন্দি বলয়ের কোথাও তো বাংলার মতো হিসাব বুঝে নেওয়ার কথা আপনার মুখে শুনিনি। উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টারে বেছে বেছে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ৩০০ লোককে মেরেছেন। নারী সুরক্ষার নামে যোগীরাজ্যে একের পর এক মহিলার ইজ্জত লুণ্ঠনের ঘটনায় সরকার নীরব দর্শক। হাতরাস, উন্নাওয়ের নির্যাতিতারা সুবিচার পায়নি কেন? কেন মৃত্যুর পর মাঝরাতেই দলিত তরুণীর অন্ত্যেষ্টি করল পুলিশ? সেই পরিবারকে আপনি ভরসা দেননি, ভয় উপহার দিয়েছেন। ওইটাই আপনার রাজনীতির ইউএসপি। একের পর এক রাজ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর দমনপীড়ন নেমে এসেছে। দিল্লিতে বিগত কুড়ি সালের দাঙ্গাতেও ৫৩ জনের প্রাণ গিয়েছে, যার সিংহভাগই মুসলিম। কিন্তু হিসাব বুঝে নেওয়ার কথা তো একবারও শুনিনি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মুখে। বঙ্গ দখলের অভিযানে হিসাব নেওয়ার হুংকারেই স্পষ্ট বাংলাতেও এনকাউন্টার, বুলডোজার রাজনীতি কায়েম করতে চান আপনি। ওই রাজনীতির লক্ষ্য অপরাধী  নিকেশ করা নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও নয়, মেরুদণ্ড ভেঙে বিরোধীদের শায়েস্তা করা। বঙ্গের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা। তাই বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে মোদির মুখে ‘সবকা হিসাব’ শুনে মুচকি হাসা ছাড়া আর কোনো পথ বাকি থাকে না। আসলে বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতি, জাত্যভিমানই বিজেপির গাত্রদাহ। তাই হিসাব বুঝে নেওয়ার এত তাড়া।
স্বঘোষিত বিশ্বগুরু নরেন্দ্র মোদি জীবনে অনেক  কিছু পেয়েছেন। কিন্তু একটাই আক্ষেপ বাংলায় প্রতিবারই বিগ জিরো! সেই কারণেই এবার অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যপাল থেকে শুরু করে মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিজি, প্রথম সারির আমলা, জেলাশাসক, এসপি পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো অংশকেই ছাড়া হয়নি। বদলে দেওয়া হয়েছে খোলনলচে। বর্হিশক্তি নয়, নরেন্দ্র মোদির শাসনে দেশেরই একটি অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে বিজেপি ও বশংবদ নির্বাচন কমিশনের চাপিয়ে দেওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নাম, ‘অপারেশন বেঙ্গল’! ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের স্বার্থপর হিন্দুরাষ্ট্রে অবনমনের গেরুয়া চক্রান্তের পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাধীনতা উত্তর ভারতের সেরা স্ট্রিট ফাইটার। পূর্ব ভারতের জননেত্রীকে আঘাত করার তাই এত আয়োজন। গোটা উত্তর ভারতে সামান্য কয়েকটি রাজ্যছাড়া অধিকাংশ প্রদেশেই নিরঙ্কুশ, পূর্ব ভারত প্রায় হাতের মুঠোয়, বাকি শুধু বাংলা। পশ্চিমবঙ্গ দখলের তাই এত তাগিদ। মোদি, অমিত শাহের আর তর সইছে না। কেন্দ্রীয় এজেন্সির দৌরাত্ম্য, ঝাঁকে ঝাঁকে বাহিনীর ভারী বুটের আওয়াজ, এসআইআর এবং শীর্ষ স্তরের আমলা বদলি-বহুমাত্রিক এই যুদ্ধটা শুধু ক্লাইম্যাক্সের অপেক্ষায়। কমিশনের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, প্রয়োজনে আড়াই লাখের পরও অতিরিক্ত আধাসেনা পাঠাতে কার্পণ্য করবে না কমিশন। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, পাঁচ রাজ্য নয়, একমাত্র বাংলাতেই ভোট হচ্ছে এবং এখানকার সবাই সমাজবিরোধী, সব বুথ দখল হয়ে যায়! ঘুরিয়ে এটাই তো বলতে চায় বাংলা বিরোধী বিজেপি ও বশংবদ জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশন। এটা বাংলা ও বাঙালির অপমান নয়? দেশে আধাসেনা আছে দশ লক্ষের মতো। তার ২৫ শতাংশ শুধু একটি রাজ্যে? নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত কি খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ? নাকি এটাও মোদি অমিত শাহের নির্মম জুমলা!
মমতা কিন্তু বামেদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি হিসাব বুঝে নেওয়ার কথা বলেননি। শোলের ডায়লগ ধার করেননি। বরং বদলা নয় বদল চাই— এই ছিল তাঁর স্লোগান। আপনি মানুন আর না মানুন তৃণমূল নেত্রীর সেই সংযমের জন্যই এগারো সালে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এলেও বড়ো কোনো রক্তপাত, অশান্তি হয়নি বাংলায়। নিঃশব্দ ফুলে ছাপের বিপ্লব হয়েছে শুধু। সেদিন তিনি যদি ‘চুন চুনকে বদলা’ নেওয়ার ডাক দিতেন তাহলে কয়েক হাজার প্রাণ ঝরে যেত। আর আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ভোটের প্রচারে বেরিয়েই ফল বেরোনোর আগেই বারবার হিসাব বরাবর করার কথা বলছেন। আপনাকে সম্মান জানিয়েই বলি আপনার মুখে ওই উসকানি শোভা পায় না! যিনি রক্ষক, যিনি পাহারাদার, তাঁর মুখে সস্তা হুমকি কি বাঙালি মেনে নেবে? আবার অন্য মুখে ভয় সরিয়ে ভরসার মলম লাগাচ্ছেন! আপনি গোধরায় ভরসা দিতে পারেননি। দিল্লির দাঙ্গাতেও আশ্বস্ত করতে পারেননি সবাইকে। বাংলার মানুষও আপনার জুমলা দেখে দেখে ক্লান্ত।  নোট বন্দি থেকে আজ কত শত প্রতিশ্রুতির মালা পরিয়েছেন আপনি তার লেখাজোখা নেই। আপনি ভরসা দিতে পারেন না কারণ এই বঙ্গে আপনার রাজনীতিটাই দাঁড়িয়ে ভয়ের উপর। আর বামেদের ভেঙে আসা জনসমর্থনের আশায়। বাংলার মাটি আপনাকে ঠিক কী চোখে দেখে, তা প্রমাণ হয়ে যাবে ৪ মে। মানুষও কিন্তু হিসাব ঠিক বুঝে নিতে পারে।

সম্পর্কিত সংবাদ