ভারতের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান সবচেয়ে চমকপ্রদ। ১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া ভারতীয় জনতা পার্টি ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জয়লাভ করে মাত্র দুটি আসনে। তারপর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে দলটি সময় নেয় মাত্র ১৬ বছর (১৯৯৬)। অটলবিহারী বাজপেয়ীর সেই উদ্যোগ এবং সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী না-হলেও পরবর্তীকালে (১৯৯৯-২০০৪) তিনিই প্রথম পূর্ণ মেয়াদের অকংগ্রেসি সরকার গঠনের নজির স্থাপন করেন। গত সাড়ে চার দশকে দেশ বিজেপির নেতৃত্বে মোট চারটি পূর্ণ মেয়াদের সরকার পেয়েছে। শেষ তিনটি সরকারে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের রাজনীতিতে এই ঘটনা অভূতপূর্ব। শতবর্ষ প্রাচীন জাতীয় কংগ্রেসকে অনেকে ‘স্বাধীনতার ভগীরথ’ আখ্যা দিয়ে থাকেন। সেই সুবাদে তৎকালীন কংগ্রেসের অবিসংবাদী নেতা জওহরলাল নেহরুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া জলভাত ছিল। তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী এবং দৌহিত্র রাজীব গান্ধীর উত্তরাধিকারকেও চ্যালেঞ্জ করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। মধ্যবর্তী পর্যায়ে লালবাহাদুর শাস্ত্রী, নরসিমা রাও, মনমোহন সিং প্রমুখ ক্ষমতা পেয়েছিলেন গান্ধী পরিবারের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে। আর এখানেই কঠিন লড়াই জারি রাখতে হয়েছে গান্ধীবাদী ঘরানার বাইরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আগ্রহী নেতৃত্বকে। প্রথম চ্যালেঞ্জটা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ভারতে হিন্দু সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার সংকল্প নিয়ে ১৯৫১ সালে তিনি গঠন করেছিলেন ভারতীয় জন সংঘ, যদিও দলটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল শুধু জন সংঘ নামে। দলটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) রাজনৈতিক শাখা হিসেবেই শক্তিবৃদ্ধির সংকল্প গ্রহণ করে। ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে জন সংঘ জিতেছিল মাত্র তিনটি আসনে। ইতিমধ্যে ১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ প্রয়াত হন এবং কাশ্মীর কারাগারে তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু বিতর্কে যবনিক পড়েনি আজও। বস্তুত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতোই নতুন মৃত্যু বিতর্কের সংযোজন ঘটে ভারতীয় রাজনীতিতে। লক্ষণীয় যে, এই দুটি বিতর্কই দুজন কৃতী বঙ্গসন্তানকে ঘিরে।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে শ্যামাপ্রসাদের চিরবিদায় জন সংঘ এবং হিন্দুত্ববাদীদের রাজনীতিকে অনেকখানি দুর্বল করে দেয়। যদিও বাজপেয়ীর নেতৃত্বে এই শক্তি মাথা তোলার জন্য ভিতরে ভিতরে তৎপরও ছিল। সেই সূত্রে সত্তরের দশকে জনতা পার্টির দাপটের সময় শরিক হিসেবে এই অতিডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি দেশের কিছু অংশে বিক্ষিপ্তভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কিন্তু তাকে ‘দাগ কাটা’ বলতে যা বোঝায় জনমানসে সেই জায়গা তারা নিতে পারেনি। জনতা পার্টি, গান্ধীবাদী এবং সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে যে সাময়িক কৌশলী সম্পর্ক তারা গড়ে তুলেছিল, অতঃপর, তাতে পূর্ণযতি টেনে দেয় তারা। ১৯৮০ সালে তৈরি হয় ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। নতুন দলটি রামজন্মভূমি আন্দোলনকে সামনে রেখে গোবলয়ের হৃদয়হরণ করে দ্রুত। অতঃপর আন্দোলনের সেই ধারায় দেশের আরও একাধিক প্রান্তকে স্নান করাবার চেষ্টায় বিশেষভাবে সফল হয় গেরুয়াবাহিনী। বিজেপি একে একে সরকার গড়ে ফেলেছে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, অসম, ত্রিপুরা, কর্ণাটকসহ অনেকগুলি রাজ্যে।
নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বিজেপির বেপরোয়াভাব অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। মোগল সম্রাটদের যেমন দাক্ষিণাত্য নীতি ছিল, বিজেপিও নিয়েছে বিশেষ বেঙ্গল নীতি। তারা জানে, দেশের যত জায়গাতেই ছড়ি ঘোরাও না কেন, বাংলার ক্ষমতা দখল করতে না পারলে জাতীয় রাজনীতিতে তুমি কুলীন হিসেবে কল্কে পাবে না, এমনকি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার গায়ে চাঁদের মতোই কলঙ্ক চেপে থাকবে। তার উপর জন সংঘ থেকে ধরলে বিজেপি দলটার প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ। প্রতিষ্ঠাতার রাজ্যেই যদি দল ব্রাত্য থেকে যায় তাহলে সেই রাজনীতির সার্থকতা কোথায়? এই প্রশ্ন দলের অন্দরেই অহরহ ওঠে। একুশে মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করেও যারপরনাই ফেল করেছিল বঙ্গ বিজেপি। তাই প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে মোদি চব্বিশে হ্যাটট্রিক করার পর থেকে এই অভাব পূরণে জান লড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ডানহাত অমিত শাহও একইরকম মরিয়া। কিন্তু এই অধরা মাধুরী কীভাবে উপহার পাবে দল? সংগঠন কোথায়? কোথায় বাংলা এবং বাঙালির প্রতি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দরদ। তিন টার্মের মোদি সরকার উপর্যুপরি বঞ্চনার অধিক কী দিয়েছে বাংলাকে? এই গুচ্ছ অপ্রিয় প্রশ্ন কেন্দ্রীয় শাসক দলকে সবসময় তাড়া করে ফিরছে। অথচ ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে রাজ্য বিধানসভার ভোট। তাহলে বাংলার কোটি কোটি মানুষ এত দ্রুত ম্যানেজ হবে কী করে? ফের চেনা রাস্তায় মোদির পার্টি—কোটি কোটি চাকরির জুমলাতেই ভরসা রাখছে তারা, সঙ্গে নগদের টোপ (অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার)। অর্থাৎ জোড়া ‘জুমলা’। যে প্রধানমন্ত্রী কথার খেলাপে অন্তত ডজনখানেক বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী, তাঁর দলের ললিপপ খাবে বাংলা ও বাঙালি! বাংলার মানুষকে হাঁদা ভোঁদা ভাবার পুরস্কার প্রদান থেকে বাঙালি যে বিজেপিকে কোনোভাবেই বঞ্চিত করবে না, তা এখনই এবং হলফ করে বলে দেওয়া যায়।