Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিজেপির বর্বরতা

বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ার এর চেয়ে উত্তম দৃষ্টান্ত‌ আর কী দেখবে ভারত! দেশের পাঁচ জায়গায় বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে।

বিজেপির বর্বরতা
  • ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ার এর চেয়ে উত্তম দৃষ্টান্ত‌ আর কী দেখবে ভারত! দেশের পাঁচ জায়গায় বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর যার দিকে তার নাম বাংলা। বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে শায়েস্তা করার সংকল্প নিয়েই মাঠে নেমেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। আর লুকোছাপা নেই যে, মোদি-শাহের পার্টির নির্দেশেই প্রতিটি পদক্ষেপ করছেন জ্ঞানেশ কুমার। অথচ তিনি একটি স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সর্বময় কর্তা। এসআইআর-এর নামে তাঁর ইসিআই প্রথমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম নির্বিচারে বাদ দেওয়ার এক ‘অনন্য কীর্তি’ স্থাপন করল। দ্রুত খোলসা হল যে, এই পাপাচারের মূল উদ্দেশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটব্যাংক ছেঁটে দেওয়া, তাতে মেরুকরণের রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন বিজেপি যদি বাড়তি সুবিধা কিছু পেয়ে যায়! অতঃপর শুরু হল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নামে নামে বজ্রআঁটুনি। সন্ত্রাসকবলিত জম্মু ও কাশ্মীরের চেয়ে বেশি সংখ্যক আধাসেনা মোতায়েন করা হল ভোটের বাংলায়। শুরু হল বেছে বেছে ধরপাকড়। বলা বাহুল্য, ট্রাবল মঙ্গার, হিস্ট্রি শিটার, বিগ ফিশ প্রভৃতি টার্ম আমদানি করে বস্তুত তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী ও ভোট ম্যানেজারদের নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার খেলা শুরু হল। উপর থেকে নির্দেশ পেল তাদের চটপট পাকড়ে গরাদের পিছনে আটকে রাখার জন্য। কমিশনের বক্তব্য, এভাবেই নাকি তারা নিশ্চিত নিরাপত্তা দেবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবং ভোটারদের; পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনী এমন সক্রিয় থাকলে শাসক, বিরোধী কেউই নির্বাচনি প্রচারে বাধা পাবে না এবং প্রার্থীরা ইচ্ছেমতো পৌঁছে যেতে পারবেন ভোটারদের কাছে; সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে তারা গণতন্ত্রের উৎসবের চেহারা দেবে, যেটা বাংলা থেকে হারিয়ে গিয়েছে!  

Advertisement

কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের এত গর্জন কী বর্ষণ করল দিনের শেষে? এই বাগাড়ম্বরের মধ্যেই প্রাণঘাতী হামলা পর্যন্ত ঘটে গেল! কে তার শিকার? তৃণমূল কংগ্রেস এমপি মিতালি বাগ। আর মারাত্মক অভিযোগ উঠল সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে। ঘটনাটি দিনেদুপুরের। সোমবার আরামবাগে রোড শো ছিল তৃণমূল ‘সেনাপতি’র। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই নির্বাচনি কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন মিতালিদেবী। যাত্রাপথের মাঝে গোঘাট এলাকায় আচমকাই ওই মহিলা সাংসদ বেনজির হামলার শিকার হন। গেরুয়া শিবিরের একদল নৃশংস দুর্বৃত্ত বাঁশ, লাঠি প্রভৃতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোনো কথাবার্তা নেই, বেপরোয়াভাবে ভাঙচুর করা হয় তাঁর গাড়ি। তাঁর গাড়ি তাক করে ইট-পাথর ছোড়া হয় বিজেপির পার্টি অফিসের সামনে থেকে। তবে বাহাদুর ছিলেন এমপির গাড়িচালক। তাঁর তৎপরতায় এযাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান মিতালি বাগ। কিন্তু গাড়ির ভাঙা কাচের আঘাতে রীতিমতো গুরুতর জখম ও রক্তাক্ত হতে হয় তাঁকে। তাঁরই সঙ্গে জখম হয়েছেন তাঁর গাড়ির চালক, দুই দেহরক্ষী এবং আপ্তসহায়ক। শারীরিক পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে মিতালিদেবীকে দ্রুত আরামবাগ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউ বিভাগে ভরতি করা হয়। সকলে দেখেছেন, বিজেপির মবতন্ত্রের শিকার একজন গণতন্ত্রপ্রেমী লড়াকু নেত্রীও কতটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন! প্রাণভয়ে তিনি আর্তনাদ করতে থাকেন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে এক বার্তায় এই বর্বরতার সমুচিত প্রতিকার দাবি করেন। 
বাঙালির মনে পড়ে যায়, প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এই  বিজেপিকেই একবার ‘বর্বর দল’ বলেছিলেন। প্রবীণ মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতার রাজনীতি নিয়ে হাজার মতপার্থক্য থাকলেও বহু মানুষ তাঁর এই পর্যবেক্ষণের তারিফ করেন এখনো। জ্যোতি বসু এই প্রশ্নে কতটা সঠিক ছিলেন, পরবর্তীকালে দেশ তা উপলব্ধি করেছে অসংখ্য লজ্জার ঘটনায়। গোধরা, হাতরাস, মণিপুর থেকে শুরু করে এক সুদীর্ঘ তালিকা দেওয়া যায়। তফসিলি সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় মহিলা এমপির উপর সংঘটিত ন্যক্কারজনক ঘটনাটি তাতেই একটি সংযোজন মাত্র। এই মুহূর্তে বাংলায় তৃণমূল, বিজেপি বা অন্যকোনো দলের শাসন নেই। পুরো শাসনযন্ত্র কুক্ষিগত করে রেখেছে ইসিআই। তবুও জ্ঞানেশ কুমার একজন মহিলা এমপিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন। তাও দিনেদুপুরে। রাজ্যের আরো নানা জায়গায় বিজেপির গুন্ডা-বদমাশরা বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের টিকিটিও ছুঁতে সাহস পাচ্ছে না কমিশনের লোকজন। বস্তুত পুরো শাসনযন্ত্র জ্ঞানেশ কুমারের সৌজন্যে এই মুহূর্তে বিজেপির দালাল এবং তারা তৃণমূলের উপর খুল্লামখুল্লা মস্তানি করছে। আজ বুধবার কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে ভোটগ্রহণ। দ্বিতীয় তথা অন্তিম দফায় এবার ভোট নেওয়া হচ্ছে ১৪২টি আসনে। কিন্তু এই দফায় প্রচারের শেষপর্বে কমিশন যে ‘ভয়াবহ দক্ষতা’ উপহার দিল তাতে আজকের নির্বাচনে নিরপেক্ষতা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যথারীতি আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে ৪ মে গণনার দিনটি নিয়েও। কমিশন যদি ন্যস্ত সাংবিধানিক দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয় তবে বাংলার গণতন্ত্রের বুকে রচিত হবে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ