তন্ময় মল্লিক: আজ, শনিবার ব্রিগেডে শপথ নেবে নতুন বিজেপি সরকার। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ বিজেপির একঝাঁক মুখ্যমন্ত্রী। তবে, সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর স্বপ্নের উড়ানে সওয়ার হয়েছেন বাংলার প্রায় তিন কোটি ভোটার। কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই সরকার থাকলে পশ্চিমবঙ্গ হবে ‘সোনার বাংলা’। তাঁর কথায় বিশ্বাস করেছে বাঙালি। স্বপ্নের সওদাগরের দেখানো স্বপ্নের নীচে চাপা পড়েছে বাঙালির অস্মিতা-অহঙ্কার। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর বাংলার মানুষ পেতে চলেছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। বিজেপির সরকারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাঙালির গগনচুম্বী প্রত্যাশা। তাই এই দিনটি শুধু সরকার গঠনের নয়, বাঙালির প্রত্যাশা পূরণের শপথ নেওয়ার দিন।
রাজ্যের ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২০৭টি। এই বিপুল জয় অতি বড়ো বিজেপি সমর্থক কল্পনাও করেননি। যদিও তৃণমূল এসআইআরে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ, ইভিএমে কারচুপি, এজেন্টদের মেরে বের করে দিয়ে একতরফা কাউন্টিংয়ের অভিযোগ এনেছে। কিন্তু, এই সমস্ত অভিযোগ মানুষ এখন শুনতে চাইবে না। বস্তাপচা মনে হবে। কারণ ‘পালটানো দরকার চাই বিজেপি সরকার’ স্লোগানে সায় দিয়েছেন বাংলার প্রায় তিন কোটি ভোটার।
নির্বাচনে হেরে গেলে সাফাই দেওয়াটা এরাজ্যের প্রথা। শাসক কখনো নিজের ভুল দেখতে পায় না। সব শাসকই নিজেদের ধোয়া তুলসিপাতা মনে করে। ২০১১ সালে যখন ৩৪ বছরের বাম শাসনের পতন হয়েছিল, তখন বহু সিপিএম নেতাকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘মানুষ ভুল করেছে।’ অর্থাৎ ভুলটা মানুষের, তাদের ছিল না। এখন অনেক তৃণমূল নেতা বলছেন, ‘মানুষের ভোটে তাঁরা হারেননি। জোর করে হারানো হয়েছে।’ কেউ কেউ এও বলছেন, ‘তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষ এভাবে বিদ্রোহ করলে ফল প্রকাশের পর পথেঘাটে জনস্রোত বইত। রাস্তায় নেমে আসত বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাস। কিন্তু, সেটা কি হয়েছে?’ তবে, তৃণমূল নেতৃত্ব যে দাবিই করুক না কেন, বিজেপির এই জয়কে কোনোভাবেই খাটো করা যাবে না। বিজেপির এই অভাবনীয় জয় মানুষেরই রায়।
বিজেপির পাহাড়প্রমাণ নির্বাচনি সাফল্য ও তৃণমূলের বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। তাতে তৃণমূলের দেড় দশকের শাসনকালে দুর্নীতি, নেতাদের দম্ভ, দলের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে আইপ্যাকের চ্যাংড়াদের দুর্ব্যবহার, নেতাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া, সরকারি শূন্যপদে নিয়োগের ব্যর্থতা সহ অনেক কারণ উঠে আসছে। এতদিন বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস যেসব অভিযোগ করত নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অনেক তৃণমূল নেতা সেই কথাই বলছেন। যে সমস্ত কারণ সামনে আসছে তা নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালের পর থেকেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে এই সব অভিযোগ অল্পবিস্তর উঠতে শুরু করেছিল। তারপরেও ২০১৯ সালের লোকসভা বাদে প্রতিটি নির্বাচনে তৃণমূল বিপুল সাফল্য পেয়েছে। এমনকি, ২০২৪ সালে লোকসভার ৭টি আসন তৃণমূল বাড়িয়েছে, বিজেপির কমেছিল ছ’টি।
বিগত দু’বছরে নতুন দু’টি ঘটনা ঘটেছে, যা রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে যেতে পারে। এক, ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। দুই, অভয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শিক্ষিত এবং মেধাবী বেকার যুবক-যুবতীরা মনে করেছেন, তৃণমূল সরকার থাকলে স্বচ্ছভাবে নিয়োগ হবে না। বিজেপি সরকার এলে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। ফলে যুবসমাজের ভোট বিজেপির দিকে ঝোঁকা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
অভয়ার মৃত্যু নিয়ে গোটা রাজ্য উত্তাল হয়েছিল। বিশেষ করে শহরাঞ্চল। কিন্তু, সিবিআই একজনকেই দোষী সাব্যস্ত করায় অভয়ার মা কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও বিজেপির দিকে আঙুল তুলেছিলেন। সেই অভয়ার মা এবারের নির্বাচনে বিজেপিরই প্রার্থী হয়েছিলেন। তারজন্য তাঁকে বিস্তর কটাক্ষ হজম করতে হয়েছে। কঠিন লড়াইয়ের শেষে তিনি জিতেছেন। অভয়া আবেগ কাজ করলে তাঁর মা রেকর্ড ভোটে পানিহাটি থেকে জিততেন। কিন্তু, সেটা হয়নি।
তাহলে কী এমন ফ্যাক্টর কাজ করল যার জন্য বিজেপি বাংলায় বিপুল সাফল্য পেল? প্রথম কারণ অবশ্যই হিন্দুত্ব। আরএসএস এবং বিজেপি প্রচার করেছিল, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চতুর্থবার ক্ষমতায় এলে রাজ্যে হিন্দুরা সংকটে পড়বে। মুসলিমরা খবরদারি করবে। প্রকাশ্যে গো মাংস বিক্রি করবে। বদলে যাবে রাজ্যের ভৌগোলিক সমীকরণ।’ অধিকাংশ হিন্দু সেকথা বিশ্বাস করেছেন। নির্বাচনি ফলে মেরুকরণে তা স্পষ্ট। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারকে ঘিরে বাংলার উন্নয়নের স্বপ্ন।
অনেকে বলছেন, নেগেটিভ ভোটে নয়, এবার প্রত্যাশার ভোটে জয়ী হয়েছে বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ মাটি কামড়ে পড়ে থেকে বাঙালিকে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। শাসক দলের বয়সের সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে ‘অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর’। তৃণমূল সরকারের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটছিল। তারপরেও তৃণমূল একের পর এক নির্বাচনে জিতছিল। তার প্রধান কারণ বিনাপয়সায় রেশন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো সামাজিক প্রকল্প। ছাব্বিশের নির্বাচনেও নবান্নে পৌঁছানোর পথ যাতে মসৃণ করা যায় তার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চালু করেছিলেন যুবসাথী প্রকল্প। বাড়িয়েছিলেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা। কিন্তু তৃণমূলের সমস্ত পরিকল্পনায় জল ঢেলে দেয় ‘বিজেপির সংকল্পপত্র’।
নির্বাচনের অনেক আগে থেকে আরএসএস বাংলায় তৃণমূলের জেতার কারণগুলি চিহ্নিত করেছিল। তার ‘কাউন্টার প্রডাক্ট’ বিজেপির সংকল্পপত্রে জায়গা করে নেয়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে ‘ভিক্ষে’ না বলে তা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য করতে নির্বাচনের আগেই অন্নপূর্ণা যোজনার কার্ড মহিলাদের দিয়ে পূরণ করিয়েছে। বহু মহিলা মনে করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাঁরা দ্বিগুণ টাকা পাবেন। সেই বিশ্বাস থেকেই বাংলার মা, বোনেদের একাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিদায়ের দিনেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই বাংলার নতুন সরকারকেও অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। তাহলেই বিজেপিকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করবে বাংলার মানুষ।
নির্বাচন ঘোষণার মুখে তৃণমূল সরকার যুবসাথী প্রকল্প চালু করেছিল। মাসে দেড় হাজার টাকা ভাতা নেওয়ার জন্য পড়েছিল লম্বা লাইন। টাকা দেওয়া শুরুও হয়েছিল। বেকারদের কাছে টানার জন্য বিজেপি স্লোগান দিয়েছিল, ‘ভাতা নয়, স্থায়ী কাজ চাই।’ সবাই সরকারি চাকরি পাবেন, এমনটা কেউ আশা করেন না। কিন্তু, রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে শিল্প, কল-কারখানা হবে। তাতে স্থায়ী কাজের সুযোগ হবে। এই আশাতেও লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশাও বিজেপি সরকারকে পূরণ করতে হবে।
রাজ্যে লক্ষ লক্ষ সরকারি শূন্যপদ বহু বছর পূরণ হয়নি। সেই সব পদ পূরণের পাশাপাশি প্রতি বছর পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। ভোটের আগে অনেক যুবককেই বলতে শোনা গিয়েছে, ‘দেখা যাক না এবার সরকার পালটে কী হয়। এই সরকার থাকলে তো নিয়োগ হবে না। কথা না রাখলে পাঁচ বছর পর পালটে দেব।’ যুবসমাজকে বিজেপি যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা পূরণ করলে কলেজগুলিতে অনার্সের আসন ফাঁকা থাকবে না। ভর্তির জন্য লাইন পড়ে যাবে। চালু করতে হবে সপ্তম পে কমিশন। মেটাতে হবে বকেয়া ডিএ।
আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন কেবল টেস্ট ম্যাচ হত। পাঁচ দিনের খেলা। ব্যাটসম্যান কখন চার হাঁকাবেন, তার জন্য টিভির পর্দা থেকে চোখ সরাতাম না। তারপর এল পঞ্চাশ ওভারের খেলা। গুরুত্ব হারাল টেস্ট। এখন টি-টোয়েন্টি। প্রথম বল থেকেই উত্তেজনা। ক্রিকেট হল রোমাঞ্চকর। টি-টোয়েন্টিতে বদলে গিয়েছে খেলার ধরন। রাজনীতিও বদলে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টির মতোই। রাজ্যবাসী বামফ্রন্টকে সময় দিয়েছিল ৩৪ বছর। তৃণমূলকে দিল ১৫ বছর। স্বপ্নপূরণের জন্য বিজেপিকে কত বছর দেয়, সেটাই দেখার। তবে, মানুষের ধৈর্য ক্রমশ কমছে। তাই বিজেপিকেও টি-টোয়েন্টির স্টাইলে পূরণ করতে হবে রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা। তা না হলে পর্যাপ্ত উইকেট থাকলেও ম্যাচ বেরিয়ে যেতে পারে হাতের বাইরে।