Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজ্যে অসভ্যতার নয়া নজির বিজেপি’র

একেবারে রাজযোটক! একজন বলছেন, নির্বাচিত সংখ্যালঘু জনপ্রতিনিধিদের ভোটের পর চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলবেন।

রাজ্যে অসভ্যতার নয়া নজির বিজেপি’র
  • ২৩ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: একেবারে রাজযোটক! একজন বলছেন, নির্বাচিত সংখ্যালঘু জনপ্রতিনিধিদের ভোটের পর চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলবেন। অপর জন কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়েছেন। জনসমক্ষে কুকথার হাঁড়ি উল্টে নিরীহ মহিলাদের অশ্লীল ভঙ্গিতে বাপবাপান্ত করছেন। প্রতিবাদ করলে মেজাজ সপ্তমে চড়িয়ে চিৎকার করছেন, ‘বেশ করব, চোদ্দ পুরুষ তুলব, বেশি কথা বলবে না, ন্যাকামি করলে গলা টিপে দেব।’ এর নাম নাকি গেরুয়া সৌজন্য ও ভদ্রতা! বেশ বোঝা যাচ্ছে ভোট আসছে এবং জেলায় জেলায় দলের লঝ্ঝরে সংগঠন দেখে অস্তিত্ব হারানোর হতাশায় শালীনতার সীমাটুকুও অহরহ ভুলে যাচ্ছেন গেরুয়া নেতারা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে থেকে তাই মহিলাদের উপর এই ছদ্ম আস্ফালন। মানুষ কিন্তু সব দেখছে, এবং যত ভোট এগিয়ে আসবে আরও দেখবে, কট্টর হিন্দুত্বের আড়ালে কোন কদর্য সংস্কৃতি আমদানি করার চেষ্টা চলছে বাংলাজুড়ে!

Advertisement

দু’দিন আগেই বালিখালের জলে কয়েক ঘণ্টা বসেও ছোট পুঁটি ছাড়া প্রাক্তন বঙ্গ সভাপতির ছিপে ওঠেনি কিছুই। তখনই লেখা হয়ে গিয়েছে তাঁর ভবিতব্য! পুঁটি নেতা! বিগত লোকসভা ভোটে শেষ মুহূর্তে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তাঁকে মেদিনীপুর থেকে দুর্গাপুরে পাঠিয়ে একপ্রকার হার নিশ্চিত করেছিল। সম্প্রতি বিধানসভায় মিষ্টি নিয়ে গিয়ে যতই মিটমাটের বার্তা দিন না কেন, কলকাঠিটা কে নেড়েছিল তা হাড়ে হাড়ে জানেন আগমার্কা আরএসএস দিলীপ। কোটি কোটি টাকার ধনী দলবদলুদের ভিড়ে 
ইদানীং কোণঠাসা দিলীপবাবুর মনে হতাশা জমাট বাঁধাটা স্বাভাবিক। তা বলে প্রকাশ্যে এমন 
অসভ্যতা! মহিলাদের বাপবাপান্ত। কয়েক দশকের পোড়খাওয়া সঙ্ঘের শিক্ষায় ঋদ্ধ নেতা শুক্রবার খড়্গপুরে কেন্দ্রীয় বাহিনী পরিবৃত হয়ে সাধারণ মহিলাদের যে ভাষায় আক্রমণ করলেন, আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে গেলেন, ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের সঙ্গে তুলনা টানলেন, তারপর গোটা দক্ষিণবঙ্গের মহিলারা প্রাক্তন সাংসদ, বিধায়ক তথা এককালে বিজেপি’র ‘লড়াকু’ রাজ্য সভাপতিকে আর ভোট দেবেন? রাজনীতির কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, সাফল্য ব্যর্থতা এ পথের নিত্যসঙ্গী। তা বলে আসল জায়গায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাতে না পেরে মহিলাদের উপর ঝাল ঝাড়বেন!
খড়গপুরে গত শুক্রবার দিলীপবাবু গিয়েছিলেন একটি ঢালাই রাস্তার উদ্বোধনে। খুব ভালো কথা। ওই রাস্তার জন্য নাকি এমপি তহবিল থেকে ৪ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে তিনি সংসদ সদস্য থাকার সময়। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। পূর্ণিমা অমাবস্যায় কত জোয়ার-ভাটা খেলে গিয়েছে, হিসেব রাখেননি তিনি। এখন আর এমএলএ-এমপি নন, দলেও ডানা ছাঁটা গিয়েছে। স্বভাবতই ভুলেও ওই পথ মাড়াননি অনেক দিন। তা গ্রামের মহিলারা যদি বিক্ষোভ দেখিয়ে বলেন, এতদিন কোথায় ছিলেন, রাস্তা ভেঙে পড়েছিল, আসেননি কেন? এলাকার মহিলাদের এই ক্ষোভে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হল! নেতাদের কাছে এমন পরিস্থিতি কি খুব অচেনা। তা মোকাবিলার পথও জানা। দিলীপবাবুর দাবি, কারও বাপের টাকা নয়, ওই রাস্তা তৈরির অর্থ দিয়েছেন তিনি। এখানেই খটকা। রাস্তা কারও ‘বাপের টাকা’য় তৈরি হয় বলে কস্মিনকালে শুনিনি, হয় সরকারি তহবিলের অর্থে। দিলীপবাবু যখন এমপি ছিলেন তখন ওই রাস্তার টাকা মঞ্জুর করেছিলেন মাত্র। তা এখন তিনি কোনও পদে নেই, জনপ্রতিনিধিও নন। দলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পর্যন্ত ডাক পান না দীর্ঘদিন। দিল্লি যাওয়াও কমে গিয়েছে। অমিত শাহ, জগৎপ্রকাশ নাড্ডারাও আর কথায় কথায় তলব করেন না তাঁকে। রাজনীতিতে এটাই নিয়ম, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। তা বলে ওই ভাবে মেজাজ হারাবেন?
যেটুকু জানা গিয়েছে, ওই ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও তাঁর গেরুয়া দলের কেউ নন। তৃণমূলের স্থানীয় নেতা প্রদীপ সরকার। তা কাউকে না জানিয়ে, কারও সম্মতি না নিয়ে একতরফা তিনি উদ্বোধন করতে যান কোন আক্কেলে। বর্তমান বিধায়ক, এমপি’র অনুমতি নেওয়া হয়েছিল? কেন্দ্রীয় সরকারের এমপি ল্যাডের টাকা তো এলাকার উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট। তাহলে কারও ‘বাপের টাকা নয়’ বলতে তিনি কী বোঝালেন? ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে কি দিলীপবাবু ওই রাস্তা নির্মাণের টাকা দিয়েছিলেন? সুস্থ গণতন্ত্রে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ তো হতেই পারে। তাঁর গেরুয়া দলও কারণে অকারণে এমন অনেক প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেন। জনজীবন স্তব্ধ হয়, দুর্ভোগে পড়েন মানুষ। তা বলে আপনি লজ্জা ঘেন্নার মাথা খেয়ে মহিলাদের ‘বাপ’ তুলবেন! আমি তো বিক্ষোভকারী ওই অকুতোভয় ভদ্রমহিলা প্রীতি কাঁড়ারকে ফুল মার্কস দেব, যিনি একটিও অশালীন শব্দ ব্যবহার না করে কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মানুষটাকে দৃশ্যত দশ গোল দিয়েছেন। আপনার অসভ্যতার উত্তরে প্রীতিকে শুধু একটি কথাই বারবার বলতে শোনা গিয়েছে, বাপ তুলছেন কেন, কেন 
এসেছেন, এতদিন কোথায় ছিলেন? আর আপনি দিলীপ ঘোষ যাবতীয় শিক্ষা, সৌজন্য, অভিজ্ঞতা বিসর্জন দিয়ে অভব্যতার নয়া নজির সৃষ্টি করছেন। বলছেন, ‘দিলীপ ঘোষ বাপ তুলেই বলবে, যারা ঘেউ ঘেউ করবে তাদের বাপ তুলেই বলবে। 
৫০০ টাকার চাকররা কিছু করতে দেয় না, শুধু ঘেউ ঘেউ করে’। এ কোন ভাষা! দিলীপবাবু আপনি কী বলতে চেয়েছেন, তা আমরা বুঝতে পেরেছি। আবারও খুলে আম স্বীকার করে নিলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আপনাদের যাবতীয় কারিকুরি শেষ করে দিয়েছে। সেই হতাশাই রাগ হয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আপনার আচরণে, ব্যবহারে। কিন্তু দিলীপবাবু আপনাদের দিল্লি সরকারও ভোটে জিতে শপথ নিয়ে বাংলার মহিলাদের জন্য চালু করা ওই ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পটাকেই হুবহু কপি করেছে। তাহলে আপনার এত গাত্রদাহ কেন? 
তবে দিলীপ ঘোষের মুখে অকথা কুকথা, ভারসাম্যবিহীন আচরণ নতুন নয়। ‘গোরুর দুধে সোনার ভাগ থাকে, তাই রং হলুদ হয়।’ এই অমৃতবাণীও তাঁরই মুখ নিঃসৃত। এখানেই না থেমে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দিশি গোরুর কুঁজের মধ্যে স্বর্ণনাড়ি থাকে। সূর্যের আলো পড়লে তা থেকেই সোনা তৈরি হয়’। এমন কথা যিনি বলতে পারেন তাঁর মানসিক স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কি অবান্তর? এর চেয়েও গহির্ত কথা তিনি বলেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে। অশ্লীল ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘দিদি যখন গোয়ায় যান, তখন নিজেকে গোয়ার মেয়ে বলে দাবি করেন। যখন ত্রিপুরা যান, তখন বলেন, ত্রিপুরার মেয়ে। প্রথমে তাকে নিজের বাবাকে চিনতে হবে।’ বাংলার গত সাড়ে ৪ দশকের অপ্রতিরোধ্য জননেত্রী সম্পর্কে যিনি এই কথা বলতে পারেন তাঁর জন্য কোনও নিন্দাই যথেষ্ট নয়। তাঁর দল পর্যন্ত ওই মন্তব্যের পর চাপে পড়ে তাঁকে লোকদেখানো ভর্ৎসনা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দিলীপবাবুকে সংশোধন করবে কে? তার চেয়েও বড় কথা, দলকে আর কতবার এমন অস্বস্তিতে ফেলবেন তিনি? এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে পৌনে আট কোটি ভোটার। তার অর্ধেকেরও বেশি মহিলা। গ্রামের এক মহিলার দিকে মারমুখী মেজাজে তেড়ে গিয়ে বাপবাপান্ত করার মাশুল ছাব্বিশের নির্বাচনে দিতেই হবে। বাংলার নারীসমাজ দিলীপবাবুদের এই ‘জুমলা’ সংস্কৃতিকে কিছুতেই সহ্য করবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ