নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘সারারাত তাণ্ডব চালাব।’ সরাসরি এই ‘হুমকি’ ছিল যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের। তারপর সত্যিই শুরু হল তাণ্ডব। গেরুয়া তাণ্ডব। বুধবার গভীর রাতে শুরু হয়েছিল, আর রেশ চলল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত। ভরকেন্দ্র একটাই—যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। বিজেপির স্থানীয় নেতানেত্রীদের ভাষায়, ‘দিমাগি নকশালদের আখড়া’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বাধীনতা দিবসের বিখ্যাত উক্তির পর তাদেরই খুঁজে বের করা এবং ‘বিচ্ছিন্ন’ করার ‘অভিযানে’ নেমেছে গেরুয়া বাহিনী। তাই ফেটসুর জিবি বৈঠকের গোলমাল কার্যত রণক্ষেত্রে বদলে দিল যাদবপুরকে। শর্বরীদেবীও বুধবার গভীর রাতে সরাসরি দাবি করে বসলেন, ‘ওরা টুকরে টুকরে গ্যাং! ওরা দেশবিরোধী স্লোগান দেয়!’ আহতদের দেখতে গিয়েছিলেন তিনি হাসপাতালে। সেখানেই প্রশ্ন তোলেন, ‘ইউনিয়ন না থাকলে সাধারণ বৈঠক কেন?’ আর ওই গভীর রাতেই ‘ছাত্র নয়’ এমন লোকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে বাম ছাত্র সংগঠনের পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। অরবিন্দ ভবনে তালা দেয়। লাল পতাকায় আগুন ধরিয়ে তা ভবনের ভিতরে ছুড়তে থাকে। সঙ্গে অশ্রাব্য গালাগালি। ভিতরে আটকে তখন আতঙ্কিত ছাত্রছাত্রীরা। গোলমালে না থাকা সত্ত্বেও এসএফআই, ডিএসও সহ যাবতীয় ‘ভিন্ন’ আদর্শ এসে গেল বামপন্থার এক ছাতার তলায়। বাইরে তখন স্লোগান চলছে, ‘আয় এসএফআই দেখে যা, এবিভিপির ক্ষমতা।’ আর পুলিশ? তখনও দেখা নেই।
বৃহস্পতিবার কিন্তু যাদবপুরের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ক্যাম্পাসের উত্তাপ নেমে আসে রাস্তায়। গোলপার্ক থেকে এবিভিপির কিছু লোক ব্যারিকেড টপকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসেন। সেই মিছিলে ছিলেন শর্বরীদেবী। তখন ৪ নম্বর গেট আগলে পুলিশ বাহিনী। ক্যাম্পাসের ভিতরে এসএফআই, ডিএসও, আইসা সহ বাম ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের তখন বিশাল জমায়েত। ছিল কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদও। তাদের বাইরে আসতে দেয়নি পুলিশ। কিন্তু পুলিশের সামনেই রাস্তা থেকে ডিম, কাদা ভরতি জলের বোতল ক্যাম্পাসের ভিতরে ছুড়তে থাকে এবিভিপি সমর্থকরা। সঙ্গে স্লোগান নয়, অকথ্য ভাষা। একটা সময় ক্যাম্পাস থেকে ডাবের খোলা উড়ে আসে। এক অধ্যাপক রসিকতা করে বলছিলেন, এটাকে বলে ‘ডাবিং’। সেই সময় এইটবি বাসস্ট্যান্ডে সিপিএম মিছিল করে এগতে চাইলেও পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়। এসএফআই রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের মিছিল করতে দিচ্ছে না, যাতে এবিভিপির বাঁদরদের বাঁচাতে পারে। এই বাংলার মাটিতে ওদের সবক শেখাব।’ তার কিছু পরে বিজেপির নেতৃত্ব এসে ৪ নম্বর গেটের সামনে থেকে এবিভিপি সমর্থকদের সরিয়ে নিয়ে যান। ততক্ষণে বাংলা বিভাগের এক পড়ুয়া বেধড়ক মার খেয়ে গিয়েছে তাদের হাতে। নন্দলাল বসুর করা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে ভেঙে দিয়েছে গেরুয়া বাহিনী। এসএফআইয়ের এই অভিযোগ অবশ্য এবিভিপি অস্বীকার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অরুণিমা চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘এমব্লেমের চারপাশের পদ্মফুলের পাপড়ির অংশটি ভাঙা হয়েছে। এর তাত্পর্য অপরিসীম। এটা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতীক।’ সাংস্কৃতিক অবমাননায় অবশ্য ওই ‘গেরুয়া বাহিনী’র কিছু আসে যায়নি। তাণ্ডব নিয়েও নির্লিপ্তই ছিল তারা। বরং দলিত ছাত্রকে মারের ইস্যুতেই ভরসা ছিল তাদের। সঙ্গে দাবি, বুধবার রাতে যারা তাণ্ডব চালিয়েছিল, তারাও এবিভিপির কেউ নয়। অথচ শর্বরীদেবী কিন্তু রাতেই চারজনের নাম বলে এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন, ‘এরা এক ঘণ্টার মধ্যে যাদবপুর থানায় আত্মসমর্পণ না করলে টেনে বের করব।’



