মৃণালকান্তি দাস: বিজেপি একটা সময়ে দেশে বেনিয়াদের দল হিসেবেই পরিচিত ছিল। লাগাতার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিভিন্ন শরিক দলকে সঙ্গে নিয়ে এক ধরনের সামাজিক সমীকরণ করে তাদের ওই বেনিয়া ভাবমূর্তি বদলে ফেলেছে। নিজেদের গোবলয়ের এক হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে তৈরি করেছে। আর তা করতে গিয়েই বাকি ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তারা যত বেশি গোবলয়ে শক্তিশালী হয়েছে, তত বেশি বাকি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আম জনতার ভোটে তাদের কোনো আস্থা নেই। ভোটে জিততে গেরুয়া শিবিরের এখন প্রধান অস্ত্র ষড়যন্ত্র। ঠিক যেমন এবার বাংলা দখল করতে শুরু থেকেই নামিয়ে এনেছে একের পর এক প্লট। তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বাংলার কিছু মীরজাফর!
ভোট ঘোষণার বহু আগে থেকেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এক ভয়ঙ্কর অঙ্ক! ১১৫ আসন পেলেই নাকি বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপি। অনেকে আরও একটু এগিয়ে বলছেন, ১১৫-ও নয়, ১০০ পেলেই যথেষ্ট। কীভাবে? সহজ যুক্তি, বাকি ৪৮ জনকে কিনে নেওয়া হবে। আম জনতার রায়কে কীভাবে পায়ের জুতোর তলায় পিষে খতম করতে হয়, ২০১৪ সাল থেকে সেটাই দেখিয়ে আসছেন মোদি-অমিত শাহদের বিজেপি। তাঁদের কাছে, যে কোনো নির্বাচন, মানুষের ভোট, মানুষের নির্বাচিত সরকার এসব এলেবেলে ব্যাপার। দিনের পর দিন এই একই কাজ করে গিয়েছেন উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে। পরিণামে সেই সব রাজ্য আজ অগ্নিগর্ভ!
বাংলায় এবার ১১৫-১০০টা আসন জেতার জন্য বিজেপি কী কী করেছে? গত ভোটে দল ভেঙেছিল, বুঝেছে দল ভেঙে কিছুই হবে না। মমতার দলে মমতাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্প পোস্ট। ২০২৬-এ প্রস্তুতি তাঁরা নিয়েছিলেন প্রথমে তৃণমূলের প্রচার ব্যবস্থাটাকে ভেঙে দিতে। তাই নির্বাচনের আগেই আইপ্যাক দফতরে হানা, মানুষ দেখেছিল মমতার রুখে দাঁড়ানোর কাছে অসহায় বিজেপিকে। সেদিন অমিত শাহর কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেপ্তার করতে পারত মমতাকে, কিন্তু প্রবল রি-অ্যাকশনের কথা ভেবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস হয়নি তাদের। সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, বাংলা দখল করতে বিজেপি একের পর এক অস্ত্র প্রস্তুত করে রেখেছে।
ভোটের প্রাক্কালে হঠাৎ রহস্য বাড়িয়ে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ পদত্যাগ করলেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় কুড়ি মাস আগে বাংলার রাজ্যপাল পদ থেকে ইস্তফা দেন সি ভি আনন্দ বোস। বাংলার নতুন রাজ্যপালের দায়িত্ব নিয়ে এলেন আর এন রবি। সাধারণত রাজ্যপাল নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রের আলোচনার রীতি রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি, বলেই অভিযোগ তুলেছিলেন মমতা। বিজেপির আমলে রাজ্যপালদের বিরুদ্ধে বার বার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। ভোটমুখী বঙ্গে সি ভি আনন্দের আচমকা পদত্যাগে সেই ‘থিওরি’ আরও মাথাচাড়া দিয়েছে। এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে বামপন্থী বলিউডি অভিনেতা প্রকাশ রাজ লিখেছেন, ‘এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই ম্যাডাম (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়)। আমরা ওঁকে (আর এন রবি) তামিলনাড়ুতে খুব ভালো করেই চিনি। নির্বাচনের সময় মরিয়া ‘গোবি’ তার বিশ্বস্তদেরই চাইবে।’
বিজেপি সিবিআই, ইডি, নির্বাচন কমিশনসহ সম্ভাব্য সব রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ব্যবহার করেছে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জেতার জন্য নয়, ২৯৪-এ ১০০ আসন জেতার জন্য। তারপর আবার সেই টাকার খেলা! যেটা হুমায়ুন কবীরের ভিডিওতে প্রকাশ্যে এসেছে। লড়াইটা ভয়ঙ্কর অসম। একদিকে নির্বাচন কমিশন, মিডিয়া, বিজেপির টাকা, বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা, অন্যদিকে একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই লড়াইয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘রকস্টার’ বলে সম্বোধন করে তাঁকে বিজেপি বিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ। কেরালায় সিপিএমের প্রচারে গিয়েও সেকথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। কারণ, প্রকাশ রাজরা চোখের সামনে দেখছে, বিজেপি কী ভয়ঙ্কর!
সেই ভয়ঙ্কর খেলার শুরুটা হয়েছিল এসআইআর-এর ধাক্কা দিয়ে। বাঙালি মাত্রেই সম্ভাব্য বাংলাদেশি— গোটা ভারতেই এই ন্যারেটিভ তৈরি করেছে বিজেপি। বৈধ নাগরিকদের ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। বিজেপি নেতারা বুঝে গিয়েছিলেন অন্যান্য রাজ্যের নিয়মে বাংলায় এসআইআর করলে তাতে কোনো সুবিধে পাওয়া যাবে না। অতএব, আনা হল ‘নজিরবিহীন’ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা। টার্গেট করে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হল। টার্গেট মানে, সংখ্যালঘু, মহিলা ভোটার। এক লহমায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে বিচারাধীন করে দেওয়া হল। প্ল্যানটা ছিল, যাতে ওই ৬০ লক্ষই তাঁদের ভোটের অধিকার হারায়। অন্তত এই বিধানসভা ভোট পর্যন্ত। মমতা আদালতে গেলেন, বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপে ৩৩ লক্ষ আবার জুড়ে গেল। বাকি ২৭ লক্ষকে বলা হল ট্রাইবুনাল আছে, সেখানে বিচার হবে। কিন্তু কবে? কেউ জানে না। শেষ পর্যন্ত জানা গেল, তাঁদের বিচার চলবে, কিন্তু তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না। ভারতীয় বিচারব্যবস্থার গড়িমসিতে শেষ পর্যন্ত ঝুলে রইলেন ২৭ লক্ষ প্লাসের সঙ্গে আগের বাতিলের থেকে যে ৮ লক্ষ মানুষ আরও আবেদন করেছেন, মোট ৩৫ লক্ষ বাঙালির ভোটার। মহামান্য বিচারপতিরা একবারও বললেন না, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই যদি বিহারের মানুষ ভোট দিতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে নয় কেন?
এরপরও দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের ভরসা থাকবে? বিজেপি তো এটাই চেয়েছে। তা না হলে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা একাধিকবার কেন বলবেন, ‘ব্রেকফাস্টে এত লক্ষ, লাঞ্চে এত লক্ষ, ডিনারে এত লক্ষ ভোটার খাব।’ আর প্রভু-ভৃত্য নির্বাচন কমিশন অবিকল তাই করেছে। কিন্তু তারা খেয়ালই করেননি, নাম বাদ দেওয়ার ঠেলায় বাতিল হয়ে গিয়েছে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ভোটারদের নাম। বিপদ বুঝেই শিলিগুড়ির জনসভায় অমিত শাহ আশ্বাস দিয়ে এসেছেন, ভোটের পর সবার নাম ভোটার তালিকায় ফিরে আসবে। এর অর্থ, বিজেপির আড়কাঠি নির্বাচন কমিশন ইচ্ছামতো যোগ্য ভোটারদের নাম কাটতে পারে, ঢোকাতে পারে। যা আগামী দিনের অশনিসংকেত! শুধু বাংলার নয়, গোটা দেশের। ভাবুন একবার, ৩৫ লাখ ‘বিচারাধীন’ কেসের মধ্যে, মাত্র ১৬১৩টি ‘অন্তর্ভুক্তি’ করেছে ট্রাইবুনাল। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ ভোটে লক্ষ লক্ষ ভোটার যে ভোট দিতে পারলেন না তার দায় কে নেবে। নির্বাচন কমিশন নাকি সুপ্রিম কোর্ট?
এই বাংলা দেখেছে, দিল্লি থেকে বিজেপি নেতারা বাংলায় ভোট করতে এসেছিলেন টাকার ঝুলি নিয়ে। তার ছিঁটেফোটা পাওয়ার আশায় বাংলার অধিকাংশ মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। টাকা দিয়েই গোটা নির্বাচনকে অর্থহীন করে ফেলার চেষ্টা করেছে বিজেপি। কোটি কোটি টাকার খেলা আর বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে গেরুয়া রং হয়ে গিয়েছিল, তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধ্বজাধারী সংবাদপত্র, ওয়েবসাইটও। তাতে শুধু বাংলা বিদ্বেষী, বাংলা বিরোধী প্রচার নয়, এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছিল ‘রেউরি’-র টোপও। অনুপ্রবেশের মিথ্যাচার শুরু হয়েছিল প্রথম থেকেই। ‘লজ্জাহীন’ সংকল্পে বস্তাপচা অনুপ্রবেশ তত্ত্বের গল্প শুনিয়ে গিয়েছেন মোদি-অমিত শাহরা। মোদি থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি নেতা— সমানে বলে গিয়েছেন, অনুপ্রবেশকারীরা এসে কাজে ভাগ বসাচ্ছে, অপরাধ করছে, ডেমোগ্রাফি বদলে দিচ্ছে। এর পক্ষে কোনো সংখ্যাতত্ত্ব নেই, বরং চোখ খোলা রাখলেই দেখবেন, বাংলায় রেল থেকে শুরু করে পুলিশ, রিক্সাওয়ালা থেকে ট্যাক্সি পর্যন্ত, যারা কাজে ভাগ বসাচ্ছে, তারা হিন্দিভাষী। ডেমোগ্রাফি বদলাচ্ছে, হিন্দিভাষী, অবাঙালিদের জন্য। বাংলায় কাজ থাকলেও বাঙালির কাজ নেই। এতদিন এসব খোঁজার প্রয়োজন হয়নি বাঙালিদের। বাঙালির মনন সেকথা বলে না। তবে এবার থেকে নিশ্চিত বাঙালিরাও নজর রাখবেন, এ রাজ্যের একের পর এক কোম্পানিতে কাদের ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটছে, কারা কত টাকার বিনিময়ে সেইসব সংস্থায় অবাঙালিদের ঢোকাচ্ছে। এ রাজ্যে অবাধ যাতায়াত মানেই, অবাধে কাজ করার অধিকার নয়। এই দাবি তুলবে ‘অনুপ্রবেশ’-এর গল্পে বিষিয়ে যাওয়া বাঙালিরাও। এর দায় বঙ্গ-বিজেপির! বাঙালিকে ধ্বংস করার এজেন্ডা এই একটা দলেরই।
‘বেঙ্গল ফাইলস’ নামে একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন গোবলয়ের এক হিন্দুত্ববাদী প্রচারক। তাঁর এজেন্ডা ছিল, কাশ্মীরের পরই পশ্চিমবঙ্গ জিহাদি এলাকা হয়ে গিয়েছে সেটা দেখানো। যার সূত্র ধরে প্রথমে গোটা ভারতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক ঠ্যাঙানো শুরু। তারপর, সাঁজোয়া গাড়ি সহ আধাসামরিক বাহিনী এনে মুড়ে দিয়েছে গোটা রাজ্যকে। আধাসামরিক অভ্যুত্থানের কায়দায় এই সেনা সমাবেশ দেখে মনে হয়েছে, যেন হল্লা চলেছে যুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গে এই বিরাট আধাসামরিক বাহিনীর দাপাদাপি স্রেফ ভোটের জন্য। দেখলে মনে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ এক উপদ্রুত এলাকা, আর পুরো সেনাবাহিনীই নেমে পড়েছে বাংলাকে রক্ষার কাজে। শেষলগ্নে ভোট করাতে উত্তরপ্রদেশ থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে আইপিএস অফিসার অজয় পাল শর্মাকে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের মহলে তিনি নাকি ‘সিংঘম’ নামেই বেশি পরিচিত। এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। এসব তৎপরতা অন্য কোনো রাজ্যে দেখেছেন?
আসলে সব অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছেন মোদি-শাহরা। সেই অস্ত্র যাতে নিখুঁত হয়, সেই কারণে, বাংলায় নজিরবিহীনভাবেই রাত কাটিয়েছেন দেশের দুই শীর্ষ নেতা। অন্যদিকে মণিপুর জ্বলছে, তাতে তাঁদের কিছু যায় আসে না। যোগীও এসেছিলেন বাংলায়। বলেছেন, বঙ্গালমে স্রেফ বাংলা চলেগা। কেউ প্রশ্ন করেনি, আপনি তাহলে হিন্দি বলছেন কেন? কোনো প্রশ্ন নয়! ভক্তরা বলছেন, উনি যেটা বলছেন, সেটাই বাংলা। মেনে নিতে হবে। সবাইকে হিন্দিতে বলতে হবে। ওটাই এখন নয়া-বাংলা। হিন্দি আগ্রাসনই নিউ-নর্মাল। মানবে কেন বাঙালি?
বাংলাকে ক্রমশ নরককুণ্ড বানিয়ে তোলার এই পুরো দানবিক পরিকল্পনাটা সফল করতে, যাঁরা বাঙালি হয়েও মীরজাফরের ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁরা মুখ লুকাবেন কোথায়?