রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: আওয়াজটা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তৈরি হয়েছে স্লোগান। পথে নেমেছে আম জনতা। সমাজের নানা প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই বার্তা—‘এদেশ সবার’। এই অবকাশে বাংলা-বাঙালি-দুর্গাপুজো এক সুতোয় বাঁধা পড়ে ডাক দিচ্ছে তীব্র প্রতিবাদের। পুজোর উদ্যোক্তারা একবাক্যে বলছেন, ‘বাংলা ভাষা ও বাঙালিরদের উপর যে আক্রমণের ঘটনা সামনে আসছে, তাতে দুর্গাপুজোর প্রাঙ্গণ থেকেই বার্তা উঠুক, থাকব আমরা মিলেমিশে।’
বাঙালির দুর্গাপুজো আজ সমাদৃত গোটা বিশ্বে, এই উৎসব ইউনেস্কোরও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই পুজোর সঙ্গেই রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, সবার আর্থিক বিকাশ এবং কর্মসংস্থান। যে মাটির আঁতুড়ঘর থেকে এই দুর্গাপুজো বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই বাঙালি আজ আক্রান্ত! অভিযোগ এবং ঘটনা সামনে এসেছে, বাংলাভাষীদের হেনস্তা করা হচ্ছে। এমনকী, বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ পর্যন্ত করা হয়েছে কিছু আটক নিরপরাধ মানুষকে। এই অন্যায় কোনওভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয় বলে মনে করছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এই আবহে এবার বাঙালির দুর্গাপুজোর অঙ্গন থেকেও বাংলা ভাষার উপর আক্রমণের প্রতিবাদ হোক, আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে।
ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সাধারণ সম্পাদক শাশ্বত বসু বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত নিয়ে, দুর্গাপুজোর ইতিহাস সুবহৎ। বহু বছরের ঐতিহ্য, পরম্পরা বয়ে চলেছে এই মহামিলনক্ষেত্র। ইতিহাসের পাতায় দুর্গাপুজোর সঙ্গে বহু বিপ্লবীর যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়। আর আজ দুর্গাপুজো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্ড্রাস্ট্রিতেই পরিণত হয়েছে। বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত বাঙালি কোনও জায়গায় আঘাত পেলে তার প্রতিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাংলা ভাষার অস্মিতা রক্ষায় বাঙালির দুর্গাপুজোর প্রাঙ্গণ থেকে প্রতিবাদ হতেই পারে। স্পষ্ট বক্তব্য পৌঁছে যাচ্ছে দেশময়, ‘বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি কোনওরকম বিদ্বেষ বরদাস্ত নয়।’
বাংলার ভাষার টানেই আজ বাঙালি ঐক্যবদ্ধ। তারা একসুরেই আওয়াজ তুলছে সর্বত্র। বাগবাজার পুজোর সঙ্গে যুক্ত প্রবীণতম ব্যক্তি অভয় ভট্টাচার্যের কথায়, ‘বাঙালির আবেগে ভাবাবেগে আঘাত খুবই বেদনাদায়ক। যেসব ঘটনা দেখছি তাতে বলতেই হচ্ছে—বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ, সন্ত্রাস চলছে! যুগে যুগে মির জাফর অনেক থাকে, এযুগেও আছে। সব দুর্গাপুজো কমিটিরই কর্তব্য, বাংলা ভাষার উপর এই আক্রমণের প্রতিবাদ জানানো।’ টালা প্রত্যয় পুজো কমিটির প্রধান উদ্যোক্তা ধ্রুবজ্যেতি বসু বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনও প্রদেশে বাঙালি সংঘবদ্ধ হয় দুর্গাপুজোর মতো সর্ববৃহৎ উৎসব থেকে। ইদানীং বাংলা ভাষার প্রতি যে বিতৃষ্ণা দেখানো হচ্ছে, তার প্রতিবাদ দরকার সমস্বরে।’
দুর্গাপুজো নিয়ে রাজ্য প্রশাসন ৩১ জুলাই নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে প্রস্তুতি বৈঠক ডেকেছে। সেখানেও বাংলা ভাষার প্রসঙ্গটি উঠতে পারে। একডালিয়া এভার গ্রিনের অন্যতম কর্তা স্বপন মহাপাত্র বলেন, ‘বাঙালির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, গর্ব শত শত বছরের। বাংলা ভাষা তথা বাঙালির উপর পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে আক্রমণ অনুচিত।’ সমাজসেবী ক্লাবের অরিজিৎ মিত্রের কথায়, ‘বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ আমাদের মনকেও আহত করছে। এটা অবশ্যই আলোচনার বিষয়।’