সমৃদ্ধ দত্ত: এনডিএ জোট বিহারে বিপুলভাবে ক্ষমতাসীন হয়েছে! নীতীশকুমারের নেতৃত্বে আবার সরকারও হয়েছে। কিন্তু বিজেপির সমস্যা তো থেকেই যাচ্ছে। বিহারে বিজেপি কিছুতেই সর্বেসর্বা হতে পারছে না। অর্থাৎ একক ক্ষমতা দখল। ২০০৫ সাল থেকে লাগাতার নীতীশকুমারের উপর নির্ভর করেই সরকারের অংশীদার থাকতে হচ্ছে বিজেপিকে। ২০ বছর পর ২০২৫ সালে সেই অবস্থার বিন্দুমাত্র বদল হয়নি। বিজেপির আসন বেড়েছে। কিন্তু এককভাবে বিহারে সরকার গঠনের মতো শক্তি বিজেপির আজও হতে পারল না। সংক্ষেপে এটাই বিহার ও বিজেপির রসায়ন। নীতীশকুমার বিজেপির হাত ছেড়ে দিলেই বিজেপি ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। আবার নীতীশকুমার হাত ধরলে বিজেপি সরকারের অংশ হয়। কংগ্রেস ও তেজস্বী যাদবদের জোটকে দূরে রাখতে হলে বিজেপি নীতীশকুমারকে ধরে রাখতে বাধ্য। বিজেপি একা একা লড়াই করে বিহারকে শাসন করার মতো শক্তি কেন অর্জন করতে পারল না ৮০ বছর ধরেও এ এক রহস্য ও ব্যর্থতা। বিহার কোনও অহিন্দিভাষী রাজ্য নয়। হিন্দিভাষী রাজ্যগুলির অন্যতম প্রধান রাজ্য। সেখানেও বিজেপি এককভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারছে না। ক্ষমতাই অর্জন করতে পারছে না যে একা ২৪৩ আসনে লড়াই করে গরিষ্ঠতা পাবে। সেই সম্ভাবনাও নেই আপাতত। অতএব বিজেপি মনে মনে চেয়েছিল নীতীশকুমারকে হাতের পুতুল করে রাখতে। আদতে বিহারে নীতীশকুমারের হাতের পুতুল হয়েছে বারংবার বিজেপি। এবং এখন কেন্দ্রেও। নীতীশকুমার হয়েছেন ডাবল ইঞ্জিন রিমোট কন্ট্রোল।
যখনই নীতীশকুমার বিজেপির হাত ছেড়ে দেন, তখনই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব হুংকার দিয়ে বলে, এই শেষ। নীতীশকুমারকে আর জীবনে কোনওদিন এনডিএ জোটে নেওয়া হবে না। নীতীশকুমার টিভিতে এসব গরম গরম বিবৃতি দেখে হাসেন। তারপর আবার একদিন সকালে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিজেপির সেই বিপ্লবী শীর্ষ নেতৃত্ব আবার ঠিক চলে আসে নীতীশকুমারের হাত ধরতে। এই খেলাটি নীতীশকুমার সম্ভবত অত্যন্ত উপভোগ করেন।
অতএব নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক কেরিয়ারের দুই অধরা স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। বিহার এবং বাংলায় একচ্ছত্র অধিকার, দাপট, প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কায়েমই করতে পারছেন না তিনি। বিহারে অর্ধেক ক্ষমতা পেলেও রিমোট কন্ট্রোল নীতীশকুমারই। কারণ, মোদির নিজের দিল্লির কুর্সিও তো চলছে নীতীশকুমারের সমর্থনে। আর বাংলায় আরও বড়ো ম্যাজিক। প্রধান বিরোধী দলের ভোট এবং আসন সংখ্যা একের পর এক নির্বাচনে সাধারণত বৃদ্ধি পায়।
বাংলায় দেখা যাচ্ছে, বিজেপির উলটো। তাদের ভোট শতাংশ ছিল ২০১৯ সালে ৪০ শতাংশ। ২০২৪ সালে কমে গেল ২ শতাংশ। ২০১৯ সালে প্রাপ্ত লোকসভা আসন ১৮ ছিল। ২০২৪ সালে কমে হয়েছে ১২। আগামী বিধানসভা ভোটের আগে তাই বঙ্গবিজেপি এবং তাদের দিল্লির কর্তারা যথেষ্ট টেনশনে যে, আবার যদি হারতে হয়, তাহলে বাংলা মোদির কাছে পূর্ণাঙ্গভাবেই অধরা হয়ে থেকে যাবে। অর্থাৎ বিহার ও বাংলা, পূর্ব ভারতের সবথেকে প্রভাবশালী দুই রাজ্য মোদির অঙ্গুলিহেলনে চলবে, এরকম আর হচ্ছেই না।
কেন প্রয়োজন এককভাবে সরকার গঠন করা? দিল্লি থেকে রাজ্যকে কন্ট্রোল করার জন্য। ঠিক এই কারণেই সরকার হলেই হল। কোনও মুখের দরকার নেই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের। একটি আলোচনা হয় যে, বিজেপির কাছে বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে টক্কর দেওয়ার মতো মুখ নেই। অর্থাৎ ওরকম প্রবল শক্তিসম্পন্ন নেত্রীর সমমানের কেউ। কিন্তু বিজেপি দিল্লির কর্তাদের কাছে সেটা কোনও সমস্যাই নয়। তাঁরা চান যেনতেনপ্রকারে ক্ষমতা দখল করতে। আসল লক্ষ্য হল, কেন্দ্রই শাসন করবে রাজ্যকে। রাজ্যে মুখ থাক আর নাই থাক।
সাম্প্রতিককালে একের পর এক রাজ্যে বিজেপি এককভাবে সরকার গঠন করেছে। কিন্তু সেইসব রাজ্যে সকলের অলক্ষ্যে একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে চলেছে। যে রাজ্যগুলিতে বিগত বছরগুলিতে বিজেপি এককভাবে ক্ষমতাদখল করেছে, সেখানে কোনও জনপ্রিয়, ক্যারিশমাসম্পন্ন, ক্রাউডপুলার রাজ্য নেতাকে কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী করা হয়নি। বরং যেখানেই এরকম একক ক্ষমতাসম্পন্ন নেতানেত্রী ছিলেন, তাঁদের ডানা ছেঁটে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্য রাজনীতি থেকে। শিবরাজ সিং চৌহান, ইয়েদুরাপ্পা, বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া। আর তাঁদের জায়গায় ওইসব রাজ্যে বিজেপি বসিয়েছিল স্বল্পপরিচিত রাজ্য নেতাদের। কেন? কারণ, লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির সুপার চিফ মিনিস্টার হয়ে চলেছেন অমিত শাহ।
মাঝেমধ্যেই খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, অমিত শাহ মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওড়িশা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, অসম সফর করেন। এর কারণ হল, ওইসব রাজ্যের সবরকম সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক অবস্থান, প্রকল্প সবই দিল্লি থেকে গ্রহণ করা হয়। আমরা প্রতিনিয়ত যদি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করি যে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে প্রায় সারাক্ষণ কিছু না কিছু প্রকল্প উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। আপাতভাবে এসব দেখলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, বিজেপি শাসিত রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রভূত প্রকল্প উপহার দিচ্ছে। তাই প্রতি মাসে ওসব রাজ্যে মোদি যাচ্ছেন।
আসল সেটা নয়। কারণ, প্রত্যেকটি বিজেপি শাসিত রাজ্যের যে রাজ্য সরকারের প্রকল্প, সেগুলি পর্যন্ত উদ্বোধন করেন নরেন্দ্র মোদি। অর্থাৎ ওই রাজ্যে এটাই বার্তা দেওয়া হয় যে, সব উন্নয়ন করছেন মোদি। এ রাজ্য আসলে চালাচ্ছেন মোদি ও অমিত শাহ। ঠিক এটাই করতে চেয়েও বিহার ও বাংলায় করা যাচ্ছে না।
বিহারে তাই ২৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি মাত্র ১০১ আসনে লড়াই করে। ২৪৩ আসনে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগই পায় না। সেই সাহসও দেখাতে পারে না। নীতীশকুমারের বহু ব্ল্যাকমেল সহ্য করেও বিহারে জোট ভেঙে দেওয়ার কিন্তু ক্ষমতা দেখাতে পারেনি কোনওদিনই বিজেপি। যদি এরকম হত যে, নীতীশকুমারকে আর কোনওদিন জোটে নেওয়া হবে না, এই ঘোষণা করে বাস্তবেও বিজেপি একাই ২৪৩ আসনে প্রার্থী দেওয়ার সাহস করত এবং একক গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকারও গড়ে ফেলত, তাহলেই একমাত্র প্রমাণ হত বিহারে মোদির ম্যাজিক কাজ করছে কি না। কিন্তু বিজেপি সেই পথে হাঁটছে না। চেষ্টাও করছে না। কারণ, ২০১৫ সালে ওই একক চেষ্টা করেও মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিজেপি। সুতরাং আগামী দিনেও একই ফল হবে বলে জানে বিজেপি। তাই নীতীশকুমারের হাত ধরে চলার এই প্রথা বিজেপির ভবিতব্য। মোদির রাজনৈতিক কেরিয়ারে এককভাবে বিহারের কর্তা হওয়া তাঁর আর ভাগ্যে নেই।
একইভাবে বাংলাতেও বিজেপি কিছুতেই বছরের পর পর গরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। বিজেপির জন্য সবথেকে উদ্বেগজনক হল, ২০২৪ সালে লোকসভার ভোটের ফলাফল। এভাবে এতগুলি আসন কমে গেল কেন? ভোট শেয়ার কেন কমে গেল? উলটে তৃণমূলের ২ শতাংশ ভোট বেড়ে গিয়েছে।
যদি আগামী কাল ভোট হয় তৃণমূলকে পরাস্ত করতে হলে বিজেপির দরকার অন্তত ৬ শতাংশ ভোট বাড়ানো। এই অতিরিক্ত ৬ শতাংশ ভোট কোথা থেকে জোগাড় করবে বিজেপি? সুচারুভাবে সেই অঙ্কটা কি করতে দেখা যাচ্ছে বিজেপিকে? মতুয়া জনসংখ্যা তিন কোটি। দেড় কোটি ভোটার। এই এসআইআরের কারণে মতুয়া ভোটের একেবারে নগণ্য অংশও যদি বিজেপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? তাহলে ভোট শেয়ারের দিক থেকে বৃহৎ ক্ষতি হবে তাদের।
বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবথেকে বড় শক্তি হল ‘এম প্লাস এম’। ‘মহিলা এবং মুসলিম’ ভোটব্যাঙ্ক। এই ভোটব্যাঙ্ক রীতিমতো জমাট। এই ভোটব্যাঙ্কে চিড় ধরানো যাবে কী উপায়ে? আগামী চার মাসে বিজেপিকে সেই কৌশল রচনা করতে হবে। বিজেপির মধ্যে কি সেই সূক্ষ্ম রণকৌশলের কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে? যাচ্ছে না। বিজেপি সাম্প্রদায়িক তাস খেলেও কার্যত ভুল করছে। কেন? কারণ যত বেশি সাম্প্রদায়িক তাস খেলা হবে, ততই মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক সংঘবদ্ধ হয়ে যাবে তৃণমূলের পক্ষে। অর্থাৎ যে মুসলিম ভোটাররা চরম তৃণমূল বিরোধী, তারাও এই অতি সাম্প্রদায়িকতার উগ্রতা দেখে দল বেঁধে তূণমূলকে বেশি বেশি ভোট দেবে। রাজনীতি হল সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অঙ্গ। বিজেপির রাজনীতিতে স্থূলতার মহাযজ্ঞ দেখা যায় সর্বদা।
২০২৬ সালেও যদি বিজেপি আবার পরাজিত হয়, তাহলে প্রমাণিত হবে বাংলা ও বিহারকে নরেন্দ্র মোদি এককভাবে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে একবারও দখল করে যেতে পারলেন না! বিহারে নীতীশকুমার বিজেপির বন্ধু সেজে ২৫ বছর ধরে তাদের থেকে সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে রয়ে গেলেন। কিন্তু বিজেপি আজ পর্যন্ত সেখানে নিজের দলের মুখ্যমন্ত্রী পেল না। আর বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটানা পাঁচবার মোদিকে পরাজিত করেছেন। ছাব্বিশে কি ৬ বার হবে?